কেরামত অভিভূত হয়ে যায়। চেরাগ আলির ভেঁড়াখোড়া বই হাতে পেয়ে এতোটাই অভিভূত হয় যে অভিভূত হওয়ার ক্ষমতাও তার লোপ পায়। কী বলবে কীভাবে বলবে ভাবতে ভাবতে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে কুলসুম নাই, দরজাটাও তার বন্ধ।
আলিম মাস্টারের ঘরে ঢুকেই কেরামত এক গাল হাসে। তার মাথায় এখন পদ্য আর পদ্য। চেরাগ আলির বই হাতে এলো, আর ভাবনা নাই। গান্ধি জিন্নার মিলন নিয়ে পদ্যের কথা ভাবতে ভাবতে বলে, মাস্টারসাহেব, ঐদিন ইসমাইল সাহেব তেভাগার নেতাক লিয়া আসিছিলো, অজয়বাবু, কী সোন্দর কথা কয়া গেলো, শুনিছিলেন? গান্ধি, জিন্নার মিলন চাই, হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই। এখন এইরকম কথার খুব দরকার।
আরে দূর মিয়া! অজয় দত্তের কথায় আলিম মাস্টারের কোনো উৎসাহ নাই, এ্যাদ্দিন। পরে ওরা কয় গান্ধি জিন্নাক একত্তর হবার। দুইজনে আলাদা থ্যাকা যে জুলুমটা চালাচ্ছে, একত্তর হলে দ্যাশের মানুষ একটাকও বাঁচবার দিবি না। তেভাগার মানুষ হয়া অজয় দত্ত হিন্দু মুসলমান মিল করাবার আর মানুষ পায় না? মাথা পাতে গান্ধি আর জিন্নার কাছে?
এসব কথা কেরামতের কানে যায় না। কাগজ পেনসিল নিয়ে সে সামনে রাখে চেরাগ আলির বই। মাঝিপাড়ায় উত্তেজনার খবর পেয়ে পরদিন ইসমাইল হোসেন ফের আসে। এবার তার সঙ্গে অজয় ও তার বোন নাই, সে এসেছে কংগ্রেসের সুরেন সেনগুপ্তকে নিয়ে। হঠাৎ করে দুইজন এম এল এ গ্রামে আসায় আমতলি থানার দারোগাও হাজির হয়, টাউন থেকে এসেছে একজন সার্কেল অফিসার। মাঝিপাড়া বা কামারপাড়া কোথাও যাবার দরকার হয় না তাদের। সুরেনবাবুকে নিয়ে ইসমাইল সোজা ঢোকে কালাম মাঝির দোকানে। সুরেনবাবু কালাম মাঝিকে জড়িয়ে ধরলে লোকটা কান্নায় ভেঙে পড়ে, বাবু, আফসার হামার ভাইসতা লয়, হামার বেটা, হামার বেটাই কবার পারেন তাক। বৈকুণ্ঠকেও ডাকা হয়, তবে সে তার পূর্বপুরুষের ইতিহাস বলার সুযোগ পায় না। সুরেনবাবু মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনে তাকেও জড়িয়ে ধরে, তারও চোখ ছলছল করে। কালাম মাঝির শোক একটু থিতিয়ে এলে সে তোলে বিলের ইজারা। দেওয়ার কথা। সুরেন সেনগুপ্ত বলে, মাঝিদের হক মেরে অন্য পেশার মানুষকে বিল ইজারা দেওয়া ঠিক হয় নি। তবে জমিদারের কাছ থেকেও শোনা দরকার। কিন্তু ইসমাইল ওয়াদা করে, জমিদারকে অনুরোধ করে, দরকার হলে সরকারি চাপ প্রয়োগ করে এ বছর থেকেই বিল মাঝিদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
কালাম মাঝি এর মধ্যেই গোলাবাড়ি হাটে মাঝিদের মস্ত সমাবেশের আয়োজন। করে ফেলেছে। মুকুন্দ সাহার দোকানের বারান্দা উঁচু বলে সেখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করে সুরেন সেনগুপ্ত আর ইসমাইল হোসেন। পালপাড়াও ভেঙে পড়েছে সুরেনবাবুকে দেখতে। ছোটোখাটো দেখতে খাটো ধুতি ও খালি গায়ে পাতলা একটা চাদর জড়ানো সুরেনবাবু হিন্দু মুসলমান মিলন নিয়ে এমন মিষ্টি করে, এতো সহজ করে বলে যে, লোকজন মুগ্ধ হয়ে শোনে। ইসমাইলের বক্তৃতার পর দুজনে টাউনে ফিরে গেলে গান ধরলো কেরামত আলি। চেরাগ আলির বইটা পাওয়ার পরই তার গানের স্রোত এসে গেছে। সবাইকে ঝুঁকে সালাম করে সে শুরু করে :
বিসমিল্লা বলিয়া শুরু করে কেরামত। ভারতবর্ষে কায়েম হবে ইনসাফি হুকমত।।
প্রথম বলি নিরঞ্জন সংসারের সার। দ্বিতীয় বলি যম রাজা করিবে সংসার।।
শিঙা হাতে ইসরাফিলে যখন দিবে ফুক। থাকবে না দালান কোঠা থাকবে না তালুক।।
দরবেশ সাধুর মন্ত্র নিতে কেহ ভুইলো না। লীগ কংগ্রেসের হিংসা কেন গেলো না।।
লোকজন খুশিতে হৈ হৈ করে ওঠে। বিপুল করতালিতে কেরামতের কণ্ঠ চাপা পড়ে। আলিম মাস্টার হঠাৎ দাঁড়িয়ে ধমক দেয়, আরে চুপ করেন না। কেরামত ফের শুরু করে,
নমরুদে রাখিত হিংসা ইব্রাহিমের পর। বেহেস্ত করিল তোয়ের নমরুদ বব্বর।।
কোথায় গেলো নমরুদ কোথায় তাহার আমিরানা। লীগ কংগ্রেসের হিংসা কেন গেলো না।।
মুসলিম লীগে ভারতবর্ষে যাহা দাবি করে। পাকিস্তান করিবে তারা লেয্য অধিকারে।।
কংগ্রেসিরা বলে তাহা নাহি দিব ছাড়ি। এই বলিয়া দুইটি পাট্টি করে মারামারি।।
কাঁচা ফলে কিল মারিয়া নষ্ট করলো বেদানা। লীগ কংগ্রেসের হিংসা কেন গেল না।।
লীগ কংগ্রেসের চারি নেতা পাইলো নিমন্তন। আনন্দিত হইয়া করে লন্ডনে গমনা।।
মহামান্য লীগের নেতা কায়েদে আজম। লিকচারে লন্ডন সভা করিল গরম।।
লিয়াকত আলী খান সঙ্গে গেলো তার। লর্ড ওয়াভেল বটে ভারত সরকার।।
বলদেও সিং বটে কংগ্রেসের একজন। জহরলাল পণ্ডিত সহ এই পাঁচজন।।
লন্ডন শহরে গিয়া লাভমুনাফা হইলো না। লীগ কংগ্রেসের মিলন কেন হইলো না। চিরযুগের দুফি মোরা হিন্দু মোসলমান। স্বাধীন পাবো আশা করি হতেছি বিরান।।
এই দেশ আমার এই দেশ তোমার গণ্ডগোল আর কইরো না।।
লীগ কংগ্রেসের হিংসা কেন গেলো না।।
কেরামত আলীতে বলে স্বজাতির কাছে। ভালো মনে বোঝো ভাগ্যে কিবা তোমার আছে।।
দুধ বেচিয়া তামুক কিনি শরীল কৈলা ক্ষয়। বুঝিয়া দেখহ মানুষ কেরামত কী কয়
স্বাধীন পাবো আশা করি সকল জাতে দেওয়ানা। লীগ কংগ্রেসের হিংসা কেন গেলো না।।
গান শুনে মানুষের হর্ষধ্বনি উপচে পড়ে তাদের গলার ওপর দিয়ে। অনেকে মুখে তার গানের ধুয়াটা গাইতে থাকে। অভিভূত কেরামত আলি তার ঝোলা থেকে চেরাগ আলির বইটা নিয়ে মাথায় ঠেকায়। আবদুল কাদের তাকে ডেকে নেয় দোকানের ভেতর, কালই তুই চল টাউনেতা ইসমাইল ভাই এই গান দেখ্যা খুব খুশি হবি। পাকিস্তানের কথা আছে। আবার অজয়বাবুরাও দেখবি, লীগ কংগ্রেসের মিলনের কথা আছে। তারাও খুশি হবি। চল, কালই চল।।
