কলুপাড়ার লোকজন ও মণ্ডলবাড়ির কামলাপাট এসে আফসারকে পাজাকোলা করে তোলে। শরাফত মণ্ডল খানকা ঘরের বারান্দা থেকে হাঁক দিয়ে বলে, মাঝিপাড়ার কেটা রে? জবাব শুনে সে এগিয়ে আসে এবং নিজের লোকদের হুকুম দেয়, বাঁচে কি-না সন্দেহ। বাড়িত লিয়া যা।
ছাইহাটা থেকে করিম ডাক্তারের আসতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো। এতো কাছে তাদের হরেন ডাক্তার, কিন্তু তার কথা কেউ মুখেই আনতে পারলো না। বৈকুণ্ঠের অবিরাম প্যাচাল পাড়া শুনে কালাম মাঝি কটমট করে তার দিকে তাকায়, বলে, তুই শালা হামার ভাইসতাক ভুলায়া লিয়া গেছিলু তোকই ধরা লাগে। কিন্তু আফসার কোনোমতে বলতে পারে, বৈকুণ্ঠদাক লিয়া গেছিলাম আমি। দাদা-। কলুপাড়ার মানুষ ও মণ্ডলবাড়ির কামলারাও আফসারকে রক্ষা করতে বৈকুণ্ঠের চেষ্টার কথা বারবার বললে কালাম মাঝি চুপ করে এবং ডাক্তারের হাত ধরে কেঁদে ফেলে, হামার ভাইস্তা, হামার বেটার চায়াও বেশি। যত টাকা লাগে খরচ করমু। কন তো টাউনের ডাক্তার লিয়া আসি।
তমিজের বাপ এসে হাত ধরে বৈকুণ্ঠের, তুই আমার ঘরত চল। ১ ডাক্তার আসার ঘণ্টাখানেক পর আফসার মারা গেলো। কাদের এসে পরামর্শ দেয়, পুলিস খবর পাওয়ার আগে লাশ দাফন করা ভালো, নইলে লাশ একবার থানায় গেলে, থানা হয়ে ফের টাউনে কাটাছেঁড়া হয়ে ফিরতে ফিরতে অন্তত এক সপ্তাহ। নাড়িভুড়ি বেরিয়ে-যাওয়া লাশ পচে গলে যাবে। ফজরের নামাজের পরপরই আফসারকে কবর দেওয়া হলো মাঝিদের পুরনো গোরস্তানে। এতে শরাফত মণ্ডলের ঘোরতর আপত্তি ছিলো। কিন্তু অবস্থা, এমন আর কালাম মাঝির জেদের কাছে কাদের যেভাবে নত হয়ে গেলো, তার আর করার কী আছে?
কুলসুম দূর্বাঘাস ঘেঁচে দিলে তমিজের বাপ সেটা লাগিয়ে দেয় বৈকুণ্ঠের পড়ে-যাওয়া বুড়ো আঙুলের গোড়ায়। নিজের পুরনো শাড়ি ছিড়ে দেয় কুলসুম, তমিজের বাপ ঠিকমতো জড়াতে না পারলে কুলসুম বলে, লেও হছে। হামাক দাও। কুলসুম বেশ পুরু করে কাপড় জড়ালেও তার রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। তমিজের পুরনো লুঙি বৈকুণ্ঠের হাতে দিয়ে তমিজের বাপ বলে, তবনটা তোক পরায়া দেই। সারা গাওত তোর অক্ত। কুলসুম হঠাৎ জিগ্যেস করে, দেখো তোমার জাত যাবি না তো? তারপর ফের বলে, তোমার আক্কেলটা ক্যাংকা কও তো বাপু? আফসারকে তুমি লিয়া গেছে কামারপাড়ার দিকে। আরে সেদিন তো কামারপাড়াত আগুন লাগালো, আফসারই আছিলো সোগলির আগে।।
বৈকুণ্ঠ এই কথার জবাব না দিয়ে জানায়, কামাররা বৈকুণ্ঠ গিরির গায়ে হাত তুলেছে, শালারা কোন বংশের মানুষকে জখম করলো টের পাবে! শালারা নির্বংশ হবে। তারপর সে কৈফিয়ৎ দেয়, আফসারকে সে যেতে মানাই করেছিলো। আফসার তাকে বলেছিলো, যুধিষ্ঠিরের মায়ের কাছে সে মাফ চাইবে। বেচারার একটার পর একটা বিপদ আসছিলো, খুব দমে গিয়েছিলো। তা পরিবার মাফ করলে স্বর্গ থেকে দশরথ কি আর রাগ পুষতে পারে?
তমিজের বাপ বলে, বৈকুণ্ঠ তুই চুপ কর। সে একটু ভয় পেয়েছে। বৈকুণ্ঠকে মাঝিপাড়া থেকে তাড়াতাড়ি সরানো দরকার। বুধা একবার চিৎকার করে উঠেছে, শালা মালাউন একটাকো রাখা হবি না।
জাত খোয়াবার ভয়ে কিংবা হাতের যন্ত্রণায় বৈকুণ্ঠ কিছুই খায় না। তমিজের বাপের মাচায় শুয়ে সে কোঁকায়, আবার কথাও বলে। মেঝেতে চেরাগ আলির বই নিয়ে কুপির আলোয় তমিজের বাপ কী কী দেখে। বৈকুণ্ঠ বলে, ফকিরের বই?
কুলসুম বসে থাকে তমিজের ঘরে, কিন্তু একটু পরপরই উঁকি দিয়ে যায়। ভোরে মাঝিপাড়ার কাক ডাক শুনে তমিজের বাপ বাইরে গেলে কুলসুম বলে, দাদার বই তুমি লিয়া যাও।
তমিজের বাপ অনেকক্ষণ পর ঘরে ফেরে। তার মুখ থমথমে। বলে, বৈকুণ্ঠ, তোক পার করা দিয়া আসি রে।
বৈকুণ্ঠ উঠে দাঁড়ালে কুলসুম ফের বই এগিয়ে দেয়। লিয়া যাও।
তমিজের বাপ কিছুই বলে না। কিছুক্ষণ পর বিড়বিড় করে, বই কি আর থাকবি? পাকুড়গাছই বলে উটকা পাই না। বই তুই লিয়াই যা। এই বই হামরা রাখবার পারমু না রে বৈকুণ্ঠ।
তমিজের বাপ বৈকুণ্ঠকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির পেছন দিয়ে বেরুতে যাচ্ছে, কুলসুম খোয়াবনামা এনে ধরলো তার সামনে, বই লিলা না? লেও।
না। ঐ বই লেওয়া যাবি না।
কুলসুমের হঠাৎ রাগ হয়। এই বই থেকে বৈকুণ্ঠ তার নিজের কতো বানোয়াট ও আসল স্বপ্নের মানে জেনে নিয়েছে তার দাদার কাছে বসে। এমন কি ভবানী পাঠকের মতিগতি ও গতিবিধির খবরও তো জানতে এসেছে এই বই থেকেই। এখন সে এই বই নেবে না কেন? কুলসুম কি বোঝে না? এতো ঝামেলা যাচ্ছে, লোকটার জাতের ব্যারাম গেলো না। কুলসুম ভারী গলায় বলে, হামার দাদাক তুমি হেলা করলা?
বৈকুণ্ঠ একটু দাঁড়ায়, ভরা চোখে কুলসুমকে দেখে, কোনো জবাব দেয় না।
একদিন পর কালাম মাঝি গোরু জবাই করে মেলা মানুষকে ভাত খাওয়ায়। কুন্দুস মৌলবি এসে কোরান খতম করে। কালাম মাঝির পৃষ্ঠপোষকতায় জুম্মাঘরের সঙ্গে চালু-হওয়া মক্তবের ছোটো ছোটো তালেবেলেমদের চিকন গলার করুণ সুরে আল্লার কালাম বাজতে থাকে মাঝিপাড়া জুড়ে। কালাম মাঝির ওখানে গোরুর গোশত দিয়ে পেট পুরে ভাত খেয়ে কোরান শরিফের সুরে বিভোর কেরামত আলি হেঁটে যাচ্ছিলো তমিজের বাপের বাড়ির সামনে দিয়ে। কুলসুমকে দেখা যায় কি-না ভেবে সে এদিক ওদিক চোখ ফেরায়। এমন সময় ডাক শোনে, শোনেন।
আরে, দরজা খুলে তার সামনে দাঁড়ায় কুলসুম। হাত থেকে ফকির চেরাগ আলির বই কেরামতের দিকে এগিয়ে দেয়, দাদার বই না চাইছিলেন। লেন।
