শুনে বৈকুণ্ঠ নতুন করে ভাবনায় পড়ে। ফকির চেরাগ আলি থাকলে তো কথাই ছিলো না, পথ সে একটা বাতলে দিতোই। ভবানী সন্ন্যাসী দুই বছর এদিকে মাড়ায় না, আসলে তার অসন্তোষের জন্যেই এই এলাকায় এতো বিপদ। পাকুড়গাছও নাই যে তমিজের বাপকে সেখানে নিয়ে মুনসির একটা পরামর্শ শোনা যায়। তবু তমিজের বাপের কাছে না হয় বৈকুণ্ঠ একবার গিয়ে সব বলুক। আফসার ভয় পায়, না, না। মাঝিপাড়াত কোনো কথা হলেই চাচা শুনবি।
বৈকুণ্ঠ নতুন একটি পথ বাতলায়, তুই না হয় হামার সাথে কামারপাড়াত চল। শুনে আফসার আঁতকে উঠলে বৈকুণ্ঠ বলে, যুধিষ্ঠিরের মাও মানুষ খুব ভালো, যুধিষ্ঠিরও চ্যাংড়াটা সাদাসিধা। তুই যুধিষ্ঠিরের মায়ের পাও ধরা মাফ চালে ঠিকই মাফ করা দিবি। মাঝিপাড়ার উপরে কামারগোরে রাগটাও আর থাকবি না। চল।।
আফসার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, হামাক লিয়া গেলে হামাক তো ধরবিই, তোমাকও খাম করবার পারে।
হামাক? হামাক ইস্পর্শ করবি ঐ শালা কামারের গুষ্টি? বৈকুণ্ঠের তেজ জ্বলে ওঠে, আরে হামি হলাম গিরি বংশের সন্তান। এই গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ি-ইগলান আগে কার আছিলো, ক তো? কবার পারিস? আরে আমার ঠাকুরদা, তার ঠাকুরদার বাপ, না-কি ঠাকুরদা। তার পূর্বপুরুষের সিংহতেজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে সে তার সিদ্ধান্তের সামান্য পরিবর্তন ঘটায়, ঠিক আছে। আমি একদিন যামু, একলাই যামু। যুধিষ্ঠিরের মায়ের সাথে, যুধিষ্ঠিরের সাথে, নারদ, গৌরাঙ্গ, তারপর ঐ শালা জামাইটার সাথে কথা সাব্যস্ত করা আসি, তারপরে তোক লিয়া যামু।
কিন্তু এরপর তিনদিন বৈকুণ্ঠের আর কোনো সাড়াশব্দ নাই। এদিকে আফসারের বৌ এখন একেবারে বিছানায় পড়ে গিয়েছে, দুই মেয়েকেই এক সাথে ধরেছে কামলা রোগে, গায়ের বন্ন হয়েছে হলুদ, গায়ে জ্বর, যখন তখন বমি করে। বাড়িতে অসুখবিসুখ, চাচার কাছ থেকে সন্ধ্যাসন্ধি ছুটি নিয়ে আফসার হাঁটা দিয়েছে বাড়ির দিকে, দেখে আগে আগে চলেছে বৈকুণ্ঠ। তাকে দেখে বৈকুণ্ঠ থামে, বলে, তুই বাড়িত যা। হামি কামারপাড়াত যাচ্ছি। কাল পাছাবেলা হামার সাথে কথা কোস হাটের মধ্যে, বটতলাত আসিস।
আফসারের গা ছমছম করে, তোমার যদি কিছু হয়? বৈকুণ্ঠ তার পূর্বপুরুষের সৌর্যবীর্য ও নিজের বীরত্ব নিয়ে কথা বলার সুযোগটির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে, আফসার ভরসা পায়। ফকিরের হাটে নৌকা নাই, বৈকুণ্ঠ বিলের পশ্চিম তীর ধরে হাঁটে। আফসারকে বলে, তুই বাড়িত যা। বাড়িত না তোর অসুখবিসুখ। কিন্তু আফসার হাঁটে তার পাশাপাশি।
আকাশে খুব রোগা একটা চাঁদ উঠে কিছুক্ষণের মধ্যে নিভে গেছে। মেঘ নাই, তারার আলোয় বিলটাকে চরের মতো দেখায়। মণ্ডলবাড়ির কাছাকাছি শিমুলগাছে কয়েকটা বক উড়তে উড়তে মাঝে মাঝে ডানা ঝাপটিয়ে নিজেদের শরীরে হাওয়া করে, তাদের শরীর হয়তো জুড়ায়, কিন্তু ঐসব শরীরের তাপ ঝরে পড়ায় নিচে গরম পড়ে আরো বেশি। হাঁটতে হাঁটতে আফসার হাঁপায়। তার ভয় করে, বারবার ভাবে, বৈকুণ্ঠদাকে বরং না করে দিই, ওখানে গিয়ে কাজ নাই। বৈকুণ্ঠ অবিরাম কথা বলে চলেছে বলে ভয়টা তার ভালো করে দানা বাঁধার সুযোগ পায় না। আবার এতো কথা শুনতে তার ভালোও লাগছে না। বৈকুণ্ঠের ওপর রাগ হয়। একেকবার বুকের ভেতর খচখচ করে : ময়লা ধুতিপরা লোকটা তাকে ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না তো? মণ্ডলবাড়ির পর কয়েক বিঘা জমি পেরিয়ে বলুপাড়া, কলুপাড়ার পর বিলের দক্ষিণ ধার ধরে মণ্ডলের বিঘার পর বিঘা জমি পার হলে খাল। রোগা খাল, এখন পানি একেবারেই নাই। খালের ওপারে বিলের পুবদিকেই কামারপাড়া। খালের এপারে এসে বৈকুণ্ঠ হঠাৎ চুপ করে। তখন এতোক্ষণের ভয়টা একশো গুণ ভারি হয়ে চেপে বসে আফসারের ওপর। সে আস্তে করে বলে, আজ না হয় থাক। আরেকদিন আসো।
বৈকুণ্ঠ জবাব দেয় না। শুকনা খালের এপারে দাঁড়িয়ে দুজনেই দেখে কামারপাড়ার দক্ষিণ সীমানা থেকে খালের দিকে এগিয়ে আসছে কয়েকটি ছায়া। একটা চিৎকার শোনা যায়, শালারা আসিচ্ছে রে, আজ আবার আগুন ধরাবার আসিছে। গলাটা দশরথের জামাইয়ের বলে সনাক্ত করে বৈকুণ্ঠ বলে, না রে আফসার, চল যাই। কামারগোরে হাতত মনে হয় হাতিয়ার আছে।
খালের ওপার থেকে টর্চের আলো এসে পড়ে বৈকুণ্ঠ ও আফসারের মুখের ওপরে। দশরথের জামাই চিৎকার করে বলে, আরে শালার মাঝিপাড়ার ডাকাতগুলান আসিছে গো। ও যুধিষ্ঠির, ও নারদ কাকা, ও গৌরাঙ্গ খুড়া সোগলি আসো। আজ শালারা আবার আগুন দিবার আসিছে। শালা ডাইঙ্গা মাঝির জাত, আজ একটাকো জান লিয়া যাবার দিমু না। দেখতে দেখতে দা সড়কি হাতে কামাররা ছুটে আসতে থাকে। বৈকুণ্ঠ প্রথমেই তাকেও মাঝিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদ জানায়, আরে মাঝি কুটি? হামি বৈকুণ্ঠ, বৈকুণ্ঠ গিরি, হামাক চিনিস? কিন্তু গলা তার বেশি উঁচুতে চড়তে পারে না, আফসারকে বরং একটু জোরে বলে, আফসার, তুই পালা, দৌড় মার, দৌড় মার।
আফসারের পা তখন গেঁথে গেছে খালের এপারের শুকনা মাটিতে, সে দাঁড়ায় বৈকুণ্ঠের পিঠ ঘেঁষে, তার ঘাড়ে হাত রেখে। পলকের মধ্যে অন্তত আট দশজন কামার ছুটে আসতে থাকে, দশরথের জামাই গলা ফাটিয়ে চেঁচায়, বন্দে মাতরম।স্লোগানে। সাড়া দেয় না সবাই, কিন্তু তিন চারজনের বন্দে মাতরম কাঁপিয়ে তোলে বিলের এপার-ওপার জুড়ে। কামারদের মধ্যে থেকে কেউ বলে, হামি না আগেই কছিলাম, শালারা আবার আসবি। দেখলা তো? ওরা ছুটে আসতে আসতে লোহার একটা বল্লম ছুটে আসে আরো আগে, কিন্তু প্রায় ঐ মুহূর্তে বৈকুণ্ঠ আর আফসার দৌড়াতে শুরু করায় বল্লমটা ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যায় আরো সামনে। কলুপাড়ার কাছাকাছি যেতেই কামারদের একজন অন্তত ওদের নাগাল পেয়েছে, দায়ের একটা কোপ এসে পড়ে আফসারের ঘাড়ে। বৈকুণ্ঠ ততোক্ষণে দৌড়ে চলে গেছে আরেকটু সামনে। আফসারের আর্তনাদে সে থমকে দাঁড়ায় এবং ফিরে এসে তখনো দৌড়াতে-থাকা আফসারকে জড়িয়ে ধরে এবং ফের একটা হুঙ্কার ছাড়ে, খবরদার! হামি গিরির বংশের মানুষ। হামি অভিশাপ দেই, শালা কামাররা তোরা নিব্বংশ হবু। কিন্তু নির্বংশ হবার ভয় না করে কিংবা বংশরক্ষার পরোয়া না করে দশরথের জামাই কিংবা নারদ কর্মকার,-বৈকুণ্ঠ ঠাহর করতে পারলো না, মস্ত একটা ছুরি চেপে ধরে আফসারের পেটে এবং বেশ দক্ষতার সঙ্গে একটা পোচ দিতেই আফসারের পেটের নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসে। আফসার মাটিতে পড়ে গেলে তার সঙ্গে পড়ে যায় বৈকুণ্ঠও এবং তখন আফসারের মৃত্যু নিশ্চিত করতে অন্য আরেকজন কামার আরেকটি দায়ের কোপ মারে তার বুকে। এই কোপটা ঠেকাতে বাঁ হাতটা উঠিয়েছিলো বৈকুণ্ঠ, তার বুড়ো আঙুলটা সম্পূর্ণ ফেলে দিতে কোপটার জোর একটু ক্ষয় হয়ে গিয়েছিলো বলে আফসারের বুকের ডান দিকে এটা পড়ে দুর্বল হয়ে। ওদিকে অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে বন্দেমাতরম ধ্বনি এবং এর জবাবেই বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ আসে মণ্ডলবাড়ি থেকে। কলুপাড়ায় পুরুষমানুষ কম, তবু অল্প কয়েকজন ছেলে, গফুরের ভাই ভাইপোই হবে, নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর বলে বেরিয়ে পড়ায় কামারের দল পিছু হটে।
