কেষ্ট পাল কথাটা তুলে নেয় নিজের মুখে, সন্ন্যাসীক দেখবার পায় বৈকুণ্ঠ, অরা তো তার সাথেই এটি আসিছিলো। তা দুই বচ্ছর বৈকুণ্ঠ তার আর দেখা পায় না। আবার। তার স্থানে যদি অন্য কোনো পূজা হয় তো হামাগোরে সব্বোনাশ হয়া যাবি বাবু!
এসব শুনে তো নায়েববাবুর ক্ষান্ত দিলে চলে না, তার দায়িত্ব অনেক বেশি। সে বলে, আর জমিদারি উঠ্যা গেলে? ওটা তো জমিদারের খাস ল্যান্ড, জমিদারি উঠ্যা গেলে। তোদের ঐ পূজা হবে?
হবি না কিসক বাবু? কেষ্ট পাল জোর দিয়ে বলে, দলিল দেখেন। দলিলে ল্যাখা আছে, সন্ন্যাসীর থানের সাত শতাংশ জমি সাধারণ্যের ব্যবহারের নিমিত্ত নির্দিষ্ট রহিল।
এ কথা পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর ভালো করে জানা আছে। বলে, তা সন্ন্যাসী ঠাকুরের এতো ক্ষমতা, সে কি তোদের রক্তও শীতল করে দিয়েছে নাকি?
না বাবু। যুধিষ্ঠিরের স্বল্পবাক বোনাইয়ের রক্ত উত্তপ্ত হয়, অক্ত হামাগোরে গরমই আছে। আপনারা চরণে ঠাঁই দিলেই হামরা ভরসা পাই।
চোখা চোখে নায়েববাবু এই কর্মকার তরুণটিকে দেখে, চোখ না নামিয়েই সে মা বলে, মাথা গরম করে কোনো কাজ করো না বুঝলে? তুমি আমার সঙ্গে একটু কথা বলে যেও তো। সাপও মারতে হবে, লাঠিও ভাঙা চলবে না।
৩৮. কামারপাড়ায় আগুন লাগিয়ে
কামারপাড়ায় আগুন লাগিয়ে আসার পর থেকে আফসার মাঝির বালামুসিবত আসতে লাগলো একটার পর একটা। কয়েকদিন আগে চোর, এসেছিলো তার ঘরে সিঁধ কেটে। ঘরে ঢুকে চোর কিছু না নিয়েই চলে যায়, সিঁধ কাটার গর্ত ছাড়া আর কোনো চিহ্ন রেখে যায় নি, কিছু নিয়েও যায় নি। কিন্তু দশরথ মরার পরদিন আফসারের বৌ টের পায়, চোর সিঁধ কাটতে গিয়েই তার লুকানো টাকার কৌটা পেয়ে গিয়েছে এবং কৌটায় টাকা ছিলো দুই কুড়ির বেশি। ঐ সময় বৌ তার ভরা পোয়াতি; তিন দিন পর টাকার শোকে কিংবা কামারপাড়ার অভিশাপে তার একটা মরা ছেলে জন্মালো। দুই মেয়ের পর এক ছেলে, ছেলেটা বাঁচলো না। বৌটা আবার সুতিকার রোগী, প্রসবের পর একেবারে নেতিয়ে পড়েছে। বারবার তাকে পায়খানায় যেতে হয় বাঁশঝাড়ে, একদিন পাছার কাপড় তোলা অবস্থায় বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলো সেখানেই, ঐ অবস্থায় তাকে দেখে ফেলে আফসারের এক জোয়ান ভাগ্নে। ঘরে মাচায় শুয়ে বৌটা দিনরাত কোঁকায় আর আফসারকে বকে, কামারপাড়ায় হামলা করে আফসার তার সর্বনাশ ডেকে এনেছে।
আফসার কাউকে কিছু বলতে পারে না, বৌকে যতোটা পারে এড়িয়ে চলে। নামাজ পড়ার দিকে হঠাৎ তার খুব মন গিয়েছে, বাড়িতে থাকলে জুম্মাঘরে তো যায়ই, কালাম। মাঝির দোকানেও নামাজের ওকতে দোকানদারি বন্ধ রেখে নামাজ পড়ে। এর মধ্যে জুম্মার নামাজের পর কুদ্স মৌলবি মোনাজাতে কলকাতা আর বিহারের মুসলমানদের দুর্দশা নিয়ে আল্লার দরবারে কান্নাকাটি করে, যে দেশ একদিন মুসলমানের অধীনে ছিলো সেখানে আজ মুসলমানদের মেরে মেরে শেষ করা হচ্ছে দেখে আল্লা পরওয়ারদিগারের কাছে সে রীতিমতো নালিশ করে। এতে আফসার একটু হালকা হয়, যেখানে দেশ জুড়ে এতো এতো মুসলমান নিধন চলছে, সেখানে কামারপাড়ার একটা হিন্দু মারা এমন কিছু গুনার কাজ নয়। কিন্তু ঐ কুদুস মৌলবি আবার একদিন পরই। ফকিরের ঘাটে আফসারকে একা পেয়ে চাপা গলায় বলে, আফসার, ইগলান তোমরা কী কাম করো গো? কামারপাড়ার বুড়া মানুষটা তোমাগোরে কী করিছিলো যে তাক এংকা করা পুড়ায়া মারো? কাফের হবার পারে, তার বিচার করবি আল্লাতালা। তোমার সাথে তো ঐ বুড়া কোনো মোনাফেকি করে নাই, জুলুম করে নাই। তার ঘরত তোমরা আগুন দাও কোন আক্কেলে? আখেরাতের দিন তোমাক জবাব দেওয়া লাগবি না?
আখেরাত তো অনেক দূরে, তার সংসার তো ছারখার হয়ে যাচ্ছে এখনি। আফসার এখন করে কী? এর মধ্যে দুপুরবেলা বৈকুণ্ঠ একদিন কালাম মাঝির দোকানে ঢোকে। হাটবার নয়, লোকজন নাই, কালাম মাঝিও গেছে বাড়িতে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বৈকুণ্ঠ বলে, আফসার, মাঝিপাড়াত তোরা একটু হুঁশিয়ার হয়া থাকিস। কামারপাড়ার নারদ আর ওদিক থ্যাকা আসিছে যুধিষ্ঠিরের বোনাই,—এই দুইটাক লিত্যি কাছারিত যাবার দেখি। লায়েব এই দুইটাক হাত করা ফালাছে, সন্ন্যাসীর থানেত এবার অরা দুর্গাদেবীর পূজা করবিই। বৈকুণ্ঠকে আফসার কখনো এমন মন খারাপ করতে দেখে নি। নায়েববাবু মুকুন্দ সাহাকে বলেছে, মেলা টেলা যেমন চলছে চলুক। মেলার দিন পূজাও যদি এরা করতে চায় তো করবে। কিন্তু বটতলার থানটা পাকা করা হবে, বছরে একবার করে মাকে নিয়ে আসা হবে সেখানে। নায়েবাবু বামুন মানুষ, শিক্ষিত লোক, কেন যে এসব তাল তুলেছে কে জানে? আবার কামারদেরও একদিন সুযোগ করে দেবে, তারা মাঝিপাড়ায় হামলা করে দশরথ কর্মকারের হত্যার প্রতিশোধ নেবে।
শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে আফসার। তার আসরের ওকত যায়, সেদিকেও খেয়াল নাই। হঠাৎ সে জড়িয়ে ধরে বৈকুণ্ঠের হাত, ভারী গলায় বলে, বৈকুণ্ঠদা, হামার তো সব্বোনাশ হয়া গেলো। আমার আখেরাত গেছে, সংসারও যায়। দশরথ বুড়ার গোয়ালেত আগুনটা তো হামিই লাগাছিলাম গো। খুব এলোমেলোভাবে আফসার কামারপাড়ার ঘটনার পর তার পারিবারিক দুর্যোগের কথা বলে; তার ধারণা, দশরথ এবং জন্মের-আগেই-মরা তার নিজের ছেলে দুজনকেই খুন করেছে সে নিজে। তার এখন উপায় কী? এতো নামাজ বন্দেগি করে, মনে হয় না আল্লা তাকে মাফ করবে। কুদুস মৌলবি পর্যন্ত তার নিজের ও আল্লার অসন্তোষের কথা তাকে জানিয়ে দিয়েছে।
