ইসমাইল হোসেন কেন, কারো মুখেই লোকে এ ধরনের কথা আগে শোনে নি। তারা আরো শুনতে চায়। কিন্তু ইসমাইল শেষ করে ফেলে তাড়াতাড়ি করে, আমার বন্ধু, আমার ছোটোভাই অজয় দত্ত এবারে আপনাদের সামনে বলবেন। কয়েক বছর আগে রেড ক্রসের রিলিফ বিতরণ করার সময় অজয় আমাকে খুব সাহায্য করেছিলো। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে।
অজয় দত্তকে এগিয়ে দিতেই সে শুরু করে, হিন্দু মুসলমান চাষীরা একসাথে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে জমিদার জোতদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে। আমরা কম্যুনিস্ট পার্টি হিন্দু মুসলমান চাষীদের নিয়ে জোতদারদের সঙ্গে তেভাগা আদায়ের জন্যে আজো লড়াই করে চলেছি। এখন আমরা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ আর তাদের তল্পিবাহক জমিদার ও জোতদারদের সঙ্গে লড়াই না করে লেগে পড়েছি নিজেদের ভাইদের সঙ্গে দাঙা হাঙ্গামায়। নিজেদের এই সর্বনাশ করার উন্মাদনা থেকে আমাদের বিরত থাকতেই হবে। ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙা বন্ধ করতে আমরা যে কোনো দলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তৃত। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও আমরা আজ এসেছি ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে। ইসমাইলদা আমাদের ভাই, ভাইয়ের সঙ্গে মিলে আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘাত বন্ধ করতে চাই।
অজয়ের গম্ভীর গলার বক্তৃতা চলে, কাদের ফিসফিস করে কথা বলে ইসমাইলের কানে কানে। কামারপাড়ায় আজ খুব উত্তেজনা। আজ দুপুরে দশরথ কর্মকার মারা গেছে। সেদিন আগুন ধরালে গোরু দুটোকে বাঁচাতে গিয়ে আগুন লাগে দশরথের পায়ে। তেমন কিছু নয়, পায়ে ফোস্কা পড়েছিলো বড়ো বড়ো। কিন্তু গোয়ালের জ্বলন্ত চালার ছোটো একটি টুকরা পড়ে তার বুকে। হরেন ডাক্তার চিকিৎসা করে তার পায়ের বুকের ব্যাপারটাকে সে গুরুত্ব দেয় নি। কাল থেকে তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো, ফুসফুস নাকি একটু পুড়ে গিয়েছিলো। দশরথ আজ মারা গেলে কামারপাড়ার মানুষ খুব গরম হয়ে আছে। এমন কি বছর তিনেক আগে আকালের সময় কামারদের যারা জমিজমা বেচে পুবে চলে গিয়েছিলো তাদেরও কেউ কেউ আজ নাকি এসে পড়েছে দা সড়কি নিয়ে। কাদের একটু ভয় পাচ্ছে। তার একটু আশা, অজয় দত্ত বক্তৃতাটা আরো লম্বা করলে সন্ধ্যা হবে, তখন কামারপাড়া যাবার পোগ্রামটা বাদ পড়তে পারে। কিন্তু ইসমাইল আস্তে করে অজয়ের কানে কানে বলে, সংক্ষেপে সারো। একটু তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার। সিচুয়েশন খুব খারাপ।
অজয় দত্ত তখন অবশ্য উপসংহারে এসে পড়েছে, ভারতবর্ষের দুই প্রধান নেতা মহাত্মা গান্ধি ও কায়েদে আজম জিন্নার কাছে আমরা আকুল আবেদন জানাই, আপনারা সাম্প্রদায়িক হানাহানি বন্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ হোন। হিন্দু মুসলিম হানাহানি বন্ধ হোক। তারপর সে স্লোগান ধরে, গান্ধি জিন্নার মিলন চাই, হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই।
আজ সারাদিন খুব গরম। কামারপাড়া যেতে যেতে গ্রীষ্মের লম্বা বিকাল হালকা গোলাপি হতে থাকে। ইসমাইল, অজয় ও মিনতি খুব ঘামে। ঘামতে ঘামতে অজয় স্লোগান ধরে গান্ধি জিন্নার মিলন চাই; কেবল কেরামত আর বৈকুণ্ঠই জোরেসোরে সাড়া দেয়, হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই। আর সবাই কথাগুলো ভালো করে ধরতেই পারে না।
মুকুন্দ সাহা আর কেষ্ট পালকে জোর করেই ধরে এনেছে কাদের। কেষ্ট। পালের উৎসাহ কম নাই, কিন্তু মুকুন্দ কাছছাড়া করতে চায় না বৈকুণ্ঠকে। বৈকুণ্ঠ একটু পিছিয়ে পড়লে সে দাঁড়ায়, সে এগিয়ে গেলে মুকুন্দ পা চালায় জোরে। কালাম মাঝি একটু পেছনে পেছনে ছিলো। কিন্তু হঠাৎ আমাশার বেগ হয়েছে বলে কেবল বুধাকে বলে সরে পড়েছে।
কামারপাড়ার লোকজন তখন দুই পা ও ফুসফুস পুড়ে-মরা দশরথ কর্মকারের পুরো শরীরটার দাহ সেরে স্নান করে এসে বসেছে দশরথের পোড়া গোয়ালের সামনে অর্জুনগাছের তলায়। স্নান করার পরেও ওদের কেউ কেউ ঘামছে। এদের যাবার খবর ওরা পেয়েছে একটু আগেই, কিন্তু এতোগুলো ভদ্দরলোক দেখে উসখুস করলেও কেউ সামনে এগিয়ে আসে না। কিছুক্ষণ পর মাতব্বর গোছের এক কামার হাঁক দেয়, বাড়ির মধ্যে থাকা একটা টুল লিয়া আসো তো।
মিনতি সোজা চলে যায় বাড়ির ভেতরে। কাদেরকে দেখে হামলে কাদতে শুরু করে যুধিষ্ঠির, বৈকুণ্ঠ এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলে সে হাউমাউ করে কাঁদে। এর বিপুল প্রতিধ্বনি ওঠে বাড়ির ভেতরে। মেয়েদের কান্নায়, বিশেষ করে যুধিষ্ঠিরের বোনের আর্তনাদে কামারপাড়ায় সন্ধ্যা নামে একটু তাড়াতাড়িই। আকাশে চাঁদ নাই, তারার আলোয় মেয়েলি কান্না জমতে থাকে পাতলা মেঘের মতো, ফলে বিলাপের শব্দ ওপরে উঠতে না পেরে ঘুরপাক খায় অর্জুন গাছের নিচেই। গুমোট বাড়ে।
পুরুষদের অনেকে চোখ মোছে। কাঁদে না কিন্তু দশরথের জামাই। তার শ্বশুরের নিভে-যাওয়া হাঁপরের আগুন জ্বলছে তার চোখেমুখে। তার কথায় তাই পোড়া পোড়া। গন্ধ, আপনারা এখন আসিচ্ছেন সোয়াগের কথা কবার। মণ্ডলে তো জলের দামে জমি লিয়া আদ্দেক কামারকে ভিটাছাড়া করিছে, এখন যি কয়টা মানুষ আছে সিগলানেক পুড়্যা মারার ফন্দি করিছে মাঝিপাড়ার মোসলমান। আপনারা এখন আসিছেন কিসক?
গফুর কলু এর মধ্যেও তেতে ওঠে, মণ্ডলে তখন জমি না কিনলে জগদীশ সাহা তোমাগোরে ব্যামাক জমি ক্রোক কর্যা লিচ্ছিলো।
কথা তো একই হলো। দশরথের জামাই বলে, জমি তো আর রাখা গেলো না। সাহা জমি লিলে লিজের জাতের কাছেই জমি থাকলোহিনি।
অজয় দত্ত বলে, আজ ঐসব কথা থাক না ভাই। আর জাত জাত করেন, মহাজন কি আপনার জাতের মানুষ?
