মহাজন জাতের মানুষ না হলে কি শরাফত হাঁমার জাতের মানুষ হলো?
না। জোতদারও আপনার নিজের জাতের মানুষ নয়। অজয় দত্ত সোজা করে বোঝাবার জন্যে আস্তে আস্তে বলে, জোতদার মহাজন কেউই আপনার জাতের মানুষ হতে পারে না। জোতদার মহাজনদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করছি। আমাদের লড়াই।
এখনো চলছে।
কেরামত অনেকক্ষণ ঘুরঘুর করছিলো অজয় দত্তের কাছাকাছি। এখন সুযোগ বুঝে সামনে আসে, বলে, জয়পুর, পাঁচবিবি এলাকায় তেভাগার সময় আমি ছিলাম। তেভাগা লিয়া আমার অনেক গান ওদিকে চলিচ্ছিলো। শুনিছেন লিচ্চয়?
এখানে গান করেন না?
না কেরামতের কথাকে নালিশও ধরা যায়, আবার কৈফিয়ৎও বলা যায়, এদিককার মানুষের মধ্যে তো তেভাগার জোস নাই। ধরেন একটা জোস না থাকলে কি গান বান্দা যায়?
এদিকে মানুষ তেভাগা নিয়ে মাথা ঘামায় না? অজয় দত্ত ইসমাইলকে বলে, কী ইসমাইলদা এখানে কি তেভাগা ইমপ্লিমেন্ট করে ফেলেছো নাকি?
এদিকে বড়ো জোতদার নাই বললেই চলে। তাই আধিয়ারের নাম্বার কম। ইসমাইল বলে, এ্যাসেম্বলিতে টেনেনসি বিল তো মুভ করাই হলো। জমিদারি এ্যাবোলিশ আর তেভাগা একই সঙ্গে করা হবে।
বুধা, শমশের পরামাণিক, এমন কি যুধিষ্ঠির পর্যন্ত ইসমাইল আর অজয়ের কথা শুনতে তাদের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। ইসমাইল তো এখন গভর্নমেন্টের মানুষ, তেভাগা হচ্ছে কি-না সে ঠিক বলতে পারবে। কিন্তু সে তোলে অন্য প্রসঙ্গ। দশরথের এই হত্যার শোধ নেওয়ার জন্যে কামাররা এখন যদি মাঝিদের ধরে ধরে মারে, তো একদিন মাঝিরা ফের হামলা করবে। ওদিকে পালপাড়ার লোকদের কথাও ভাবতে হবে। এরকম মারামারি কাটাকাটি চললে মানুষের রুজিরোজগার বন্ধ, মনের মধ্যে সবসময় হিংসা পুষে রাখলে কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না।
অজয় দত্ত বলে, এই হানাহানিতে লাভ হচ্ছে কার? গরিব মানুষেরা নিজেদের মারে, বড়োলোকেরা বসে বসে মজা লোটে।
সবাই চুপচাপ শোনে, নিজেরা কোনো কথাই বলে না। যুধিষ্ঠিরের ভগ্নীপতির চোখের আগুন নেভে না, সে বসে থাকে একটু দূরে।
রাত্রে লণ্ঠনের আলোয় সবাই কাদেরের বাড়িতে আসে। ইসমাইল, অজয় দত্ত ও মিনতি এই গরমে খাওয়ার এতো এতো আয়োজন দেখে কাদেরকে মিষ্টি করে বকে, কিন্তু পেট পুরে পোলাও কোর্মা খায়। বড়ো জাতের শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাকে এভাবে খাওয়াতে পেরে শরাফত গদগদচিত্ত। কামারপাড়ার ঘটনায় সে সত্যি অসন্তুষ্ট, মাঝিরা কোনোদিন খাসলত বদলাবার পারে না। টাকাপয়সা যতোই করুক,ছোটোজাত শালারা ছোটোজাতই থাকে। মানুষ আর হবার পারে না। কামারপাড়াত যা করলো!
মণ্ডলবাড়ির বাইরের উঠানে তখনো জটলা, টমটম দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানেই। অজয় ও মিনতির পর ইসমাইল টমটমে উঠতে যাচ্ছে তো সামনে এসে দাঁড়ায় তমিজের বাপ, হামার বেটাটা এখনো জেল খাটিচ্ছে বাবা। ভিটাবাড়ি বন্ধক থুয়া ট্যাকা খরচ করলাম, তাও তাক খালাস করবার পারলাম না।
ইসমাইল কিছু বলার আগেই কাদের তাকে ধমকায়, আরে রাত হছে কতো। তুমি এখন ইগলান কি দরবার নিয়া আসিছো? ইসমাইল টমটমে ওঠার পর কাদের নিজেও উঠতে যাচ্ছে তখন সামনে আসে বৈকুণ্ঠ, তমিজের বাপকে সে মনে করিয়ে দেয় পাকুড়গাছের কথা, ক্যা গো, পাকুড়গাছের কথা কলা না? পাকুড়গাছ পাওয়া যাচ্ছে না–
তোর কি মাথা খারাপ হছে বৈকুণ্ঠ? ভায়ে ভায়ে খুনাখুনি ঠেকাবার জন্যে ইনারা বলে ছুটাছুটি করিচ্ছে, আর এখন তুলিস ইগলান ফালতু কথা?
৩৭. কামারপাড়ার হত্যাকাণ্ডে
কামারপাড়ার হত্যাকাণ্ডে নায়েব পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী খুবই মর্মাহত। দশরথের মৃত্যুর দুইদিন পর মুকুন্দ সাহাকে খবর দিয়ে কাছারিতে সে ডেকে এনেছে কামারপাড়ার লোকদের, কেষ্ট পালকে খরব দেওয়া হয়েছিলো, সেও এসেছে কয়েকজনকে নিয়ে। টাউনের সতীশ মুক্তার আর সেরপুরের অনিল সান্যাল ছাড়াও আরো দুজন বাবু বসে সিগ্রেট টানছিলো, এদের একজনের চিকন ফ্রেমের চশমা, আরেকজনের হাতে ইংরেজি খবরের কাগজ।
আগে খবর দিলে ভালো চিকিৎসা করা যেতো। বাপটাকে হয়তো বাঁচাতেও। পারতিস। তা তোদের খাতির তো সব বেজাতের মানুষের সাথে, তাদের হাতে জান গেলেও নিজেদের মানুষের কাছে আসিস না। নায়েববাবু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর দশ টাকার কড়কড়ে দুটো নোট তুলে ধরে যুধিষ্ঠিরের দিকে। তার পরিত্যক্ত দীর্ঘশ্বাসে নোট দুটো উড়ে পড়ে মেঝেতে, যুধিষ্ঠির উপুড় হয়ে টাকা তুলতে তুলতে শোনে, বাপটা তোর বড়ো ভালো মানুষ ছিলো রে। এই সাদাসিধা লোকটাকেও ওরা ছাড়লো না।
কেন, এখন তো বেটাদের মুখে আবার ইউনিটির বুলি। সতীশ মুক্তার ক্ষোভ ও রাগ চেপে রাখতে কথা বলে একটু ধীরে ধীরে, সুরাবর্দি নিজের হাতে পিস্তল দিয়ে হিন্দু মারলো, মীনা পেশোয়ারিকে দিয়ে কতো কতো হিন্দুর প্রাণ নিলো। পাঞ্জাব থেকে পুলিস আনিয়ে হিন্দু মারলো কতো। আবার ধুয়া তুলেছে ইউনাইটেড সভেরিন বেঙ্গলের। নেড়েগুলো কতোরকম ফন্দিই যে জানে!
নেতাজির ভাইও তো ইউনাইটেড়, বেঙ্গলের পক্ষে। অনিল সান্যাল একটু ভয়ে ভয়েই বলে, শরৎ বোস, কিরণশঙ্কর রায়, সত্য বকসি, তারপর ধরুন আমাদের সুরেনবাবু,-।
আরে রাখেন। নেতাজির ভাই হলেই নেতাজি হওয়া যায় না। সতীশ মুক্তার এবার আর রাগ চেপে রাখতে পারে না, সাত ঘাটের মাছ খেয়ে বিড়াল সেজেছে সাধু তপস্বী! সুরাবর্দি হিন্দু মারে নি? তার সঙ্গে এরা জোটে কী করে? আমাদের শ্যামাপ্রসাদ ইজ রাইট, উই ডিমান্ড এ ডিভাইডেড বেঙ্গল ইভন ইন এ্যান আনডিভাইডেড ইনডিয়া। নো মোর উইথ দি বারবেরিয়ান মহামেডানস।
