তাদের নামাজ শেষ হওয়ার আগেই মণ্ডলবাড়িতে চাউর হয়ে যায়, কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আবদুল আজিজ কৈফিয়ৎ দেওয়ার মতো করে বলে, কিন্তু পাকুড়গাছ তো একটাও কাটা পড়ে নাই। ইটখোলার প্রত্যেকটা গাছ কাটার সময় আমি নিজে খাড়া হয়া থাকিছি।
আবদুল কাদের টাউন থেকে এসে গোসল করে ভাত চেয়েছে কয়েকবার। আজকাল নামাজ তার প্রায়ই কামাই হয়। তবে নামাজ নিয়ে শরাফত তার সরকারি চাকুরে বড়ো ছেলেকে যেভাবে বলতে পারে, ছোটো ছেলেকে সেভাবে তাগাদা দেওয়াটা দিন দিন তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। কাদের হঠাৎ চিৎকার করে, আরে ভাত দেও না! তারপর ভুরু কুঁচকে বলে, আরে পাকুড়গাছ থাকলেই কি আর না থাকলেই কী? মুনসির কি আবার জায়গার অভাব আছে নাকি? ইটের ভাটা আছে না? এতো বড় ভাঁটা, মুনসি বসবার পারবি, শোবার পারবি।
মুনসিকে নিয়ে এভাবে ঠাট্টা করায় আবদুল আজিজ চমকে ওঠে। তবে রাগের চেয়ে তার ভয়টা বেশি হওয়ায় এভং কাদেরের সামাজিক ও পারিবারিক দাপট দিন দিন বাড়ছে বলে কাদেরের কথাকে স্রেফ রসিকতা বলে গণ্য করার প্রাণপণ চেষ্টায় একটুখনি হাসি তৈরী করার জন্যে সে ঠোঁটের ব্যায়াম করে।
তবে এই হাসির ব্যায়াম তার ক্ষান্ত হয় শরাফত মণ্ডলের কথায়, বিলের উত্তর দিকে পাকুড়গাছ কেউ কোনোদিন দেখিছে? পাকুড়গাছ ওটি আছিলো কবে?
এমন কি আবদুল কাদের পর্যন্ত বাপের কথায় থ হয়ে যায়। এরকম কথা বুড়া বলে কীভাবে?
শরাফত মণ্ডলের বড়োবৌ তখন পুবদুয়ারি পুরনো টিনের ঘরে বসে তার ক্লান্ত বেটারা এখন পর্যন্ত অভুক্ত থাকায় আক্ষেপ প্রকাশে ব্যস্ত। মণ্ডলের ছোটোবিবি রান্নাঘরে মাদুরের ওপর ভাত তরকারি বাড়ে আর স্বামীর কথা শুনে তার প্রতিবাদ করার জন্যে জিভে শক্ত শক্ত শক্ত কথা শানায়। তার পাশে চুপচাপ বসেছিলো হামিদা। স্বামী, দেওর কী শ্বশুরের সব কথা না বুঝলেও কোনো অমঙ্গলের আঁচ পেয়ে সে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে চায়। খাওয়া হলেই সে একটু ঘুমিয়ে নেবে। হুমায়ুন আর আহসানের কী হলো তা জানতে ঘুমের ওমে না ঢুকে তার আর উপায় কী?
সবার এরকম বিপন্ন উদ্বেগ দেখে শরাফত মণ্ডল কাষ্ঠহাসি ছাড়ে, তার গলার স্বর এখন বড়ো খরখরে, বিলের পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ-কোনো জায়গার এক ইঞ্চি জায়গাও হামি বাদ দেই নাই। লায়েববাবুর সাথে ঘুরা ঘুরা দেখিছি। লিজে একলা একলাও দেখিছি। ওটি পাকুড়গাছ আছিলো কোনোদিন দেখি নাই তো। হবার পারে, আগিলা জামানার মানুষ দেখিছে! হামার লজরেত পড়ে নাই।
৩৬. এটা আমার জায়গা
কাদের, এটা আমার জায়গা, মানো তো? আমি এখান থেকে ইলেকটেড। ঠিক কি না? কাদের মাথা নেড়ে সায় দিলে ইসমাইল জিগ্যেস করে, আমার কনস্টিটুয়েনসিতে রায়ট হলে এ্যাসেম্বলিতে জবাব দিতে হবে আমাকেই তো? না কী? কামারপাড়ায় তোমরা আগুন ধরাতে যাও কোন আক্কেলে? মানুষ রাত্রে কাছারি হামলা করতে ছোটে, তোমরা বাধা দাও না কেন?
কিন্তু কলকাতায় মোসলমান তো কিছু রাখলো না। মুসলিম লীগের সরকার, মোসলমান যদি এভাবে মরে তো। আমাদের আত্মীয়স্বজন যখন হিন্দুর হাতে খুন হয়।
কাদেরের এরকম প্রতিক্রিয়ায় ইসমাইল অভ্যস্ত নয়। তবে অবাক হলেও সে জবাব দেয় সঙ্গে সঙ্গে, তোমার ভায়ের সম্বন্ধীকে কি মেরেছে কামারপাড়ার মানুষ? ঐ বুড়ো দশরথের ঠ্যাং পুড়িয়ে আর ওর দুটো গোরু মেরে কি তোমার আত্মীয়কে ফিরিয়ে আনতে পারবে?
কাদেরের দোকানে জমায়েত সবার সঙ্গে সে পরিচয় করিয়ে দেয় তার সঙ্গীদের, আমার বন্ধু, ছোট ভায়ের মতো, অজয় দত্ত। কম্যুনিস্ট পার্টির ডেডিকেটেড লোক। আমরা এক পাড়ার ছেলে, মানুষ হয়েছি এক সঙ্গে। এ হলো অজয়ের বোন মিনু, মিনতি দত্ত, দুই ভাইবোনই কম্যুনিস্ট পার্টির কাজ করে। এঁরা আজ আমাদের সঙ্গে কামারপাড়ায় যাবেন। তারপর কালাম মাঝিকে ডেকে ইসমাইল বলে, কালাম মিয়া, আপনি তো যাবেনই, আপনার মাঝিপাড়ার লোকজনও সঙ্গে থাকবে। কাদের, তুমি কয়েকটা লণ্ঠনের ব্যবস্থা করো, ফিরতে রাত হবে, ফেরার সময় তোমার বাড়িতে। আমাদের দাওয়াত।
কাদেরের বুক চিনচিন করে, টাউনে নিজের পাড়ায় ইসমাইলের খায়খাতির সব হিন্দুদের সঙ্গে, মনে হয় হিন্দুরাই তাদের বাড়ির সবার আত্মীয়স্বজন। অথচ দেখো ভোটের আগে ইসলামের মহিমা আর মোসলমানের দুর্দশা ছাড়া আর কিছু বলতো না। আর কালাম মাঝি এখন কামারপাড়ায় যাবার ব্যাপারটা একেবারেই অনুমোদন করে না, ওদিকে আজ খুব গরম হয়া আছে। গেলে আবার একটা মুসিবত না হয়।
অজয় দত্ত তাকে থামিয়ে দেয়, গরম বলেই তো যাওয়া দরকার।
মিনতি থাকায় একটু ভাবনা হলেও ইসমাইল হোসেন জোর দিয়েই বলে, চলেন তো যাই। দেখি না কে কী করে।
এখন বাধা দেওয়া কাদেরের জন্যে মুশকিল। সে একটি অতিরিক্ত কর্মসূচির প্রস্তাব করে, ঠিক আছে। তো আপনারা আসলেন, মানুষ জমা হছে, কিছু কয়া যান।
কথাবার্তা চলছিলো দরজা ভেজিয়ে দিয়ে, কপাট ফাঁক করলে দেখা গেলো দোকানের সামনে মেলা মানুষ। হারে দিনে টাউনের শিক্ষিত তরুণীকে টমটম থেকে নামতে দেখে হাটুরেদের কেনাবেচা লাটে উঠেছে, সবাই এসেছে তাকে দেখতে।
সময় নাই। কোনো ভূমিকা ছাড়াই ইসমাইল হোসেন শুরু করে, ভাইসব, পাকিস্তান হাঁসেল হলে জমিদার মহাজনের জুলুম থাকবে না। তখন হিন্দু মুসলমানের ভেদ লোপ পাবে। আমরা বাঙলার হিন্দু, বাঙলার মুসলমান স্বাধীনচেতা জাতি। বাঙলার রাজা নবাব সুলতানরা দিল্লীর কাছে কখনো মাথা নত করে নি। আজ এই বাঙলাকে ভাগ করার চক্রান্ত চলছে। বাঙলা ভাগ হলে হিন্দু, মুসলমান-সমস্ত বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। বাঙলাকে লুটেপুটে খাবে পশ্চিমা বেনিয়ারা। আপনারা ভায়ে ভায়ে মারামারি করে, দাঙা করে বাঙলাকে টুকরো করে ফেলতে দেবেন না।
