এসব হলো তার ঘুমের ভেতরকার ভয় এবং ঘুমের ভেতরকার ভরসা। কিন্তু জাগরণে সে বড়ো ধন্দে পড়ে : আহসান তো আসলে বেঁচেই রয়েছে, বেঁচে থাকতে সে হুমায়ুনের সঙ্গে মিলিত হয় কীভাবে? এখন মরার পর হুমায়ুন যদি তাকে কোনো ইঙ্গিত দেয় এই আশায় হামিদা সুযোগ পেলেই বাড়ির পালানে গোরস্থানের দিকে রওয়ানা হয়। মেয়েমানুষের গোরস্থানে যাওয়া জায়েজ নয় বলে বাড়ির লোকজন তার দিকে কড়া নজর রাখে। হামিদার ধন্দের তাই আর সুরাহা হয় না। হয়তো এ জন্যেই যতোক্ষণ জেগে থাকে মাথাটা তার দপদপ করে। এই শীতের বিকালে এমন কি সন্ধ্যাবেলাতেও তাকে প্রায়ই গোসল করতে হয়। এতে তার ঠাণ্ডা লাগে না, সর্দি হয় না, এমন কি গা গরম পর্যন্ত করে না। শাশুড়ি তাই অসন্তুষ্ট, এতো পাথরের মতো শরীরের বৌ থাকলে ঘরে নক্ষী থাকে না। মণ্ডলের ছোটোবিবি অবশ্য তাকে সাব্যস্ত করে মাথাখারাপ বৌ বলে, ইগলান পাগলি হবার চিহ্ন গো। পাগলের শরীলে শীত কম, তার তাপ বেশি। সব কিছুর মতো এই ব্যাপারেও বড়োবিবি তার সঙ্গে একমত নয়, কিসের পাগলি? উগলান সব ঢং। পাগলের চোখেত বলে নিন্দ থাকে? পাগলা মানুষ এতো নিন্দ পাড়ে? তা কথাটা ঠিক। সন্ধ্যা হতে না হতে হামিদার চোখ ঢুলুঢুলু হতে থাকে, তার হাই ওঠে এবং প্রায়ই না খেয়ে সে শুয়ে পড়ে। ভাই ও বেটার হালহকিকত জানতে ঘুম ছাড়া তার আর কোনো আশ্রয় আছে?
আবদুল আজিজের হয়েছে বিপদ। ভাই আর বেটাকে স্বপ্নে দেখার ভয়ে ও আশায় হামিদার উৎকণ্ঠা ও প্রস্তুতি দেখতে দেখতে সে অতিষ্ঠ, অথচ ঐ স্বপ্নের বখরা তার জোটে না। সে একজন গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি, এর উপর মাসখানেক হলো টাউনে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে অন প্রোমোশন। টাউনের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হেড এ্যসিস্টট্যান্ট হয়েও বাড়িতে এতো জ্বালা সে আর কাহাতক সহ্য করে? বাড়ির বৌয়ের আচরণে নানাজনের কৌতূহল, কৌতুক, বিরক্তি ও হতাশার সবই তো বেঁধে আজিজেরই গায়ে।
আবার ঘন ঘন বাড়ি না এলেও কথা শোনায় কাদেরও। তার প্রমোশন দিয়ে টাউনে ট্রান্সফারটা অবশ্য কাদেরের তদবিরের ফলেই হয়েছে। টাউনে ছোটোখাটো একটা বাড়ি ভাড়া করে কাদের এখন কন্ট্রাকটরি শুরু করেছে, তাই বাড়ির সব সামলাতে হয় আজিজকে। টাউনে সে উঠেছে শ্বশুরবাড়িতে, কিন্তু একদিন পর পর বাড়ি না এলে কাদের রাগ করে। ইটখোলার দেখাশোনা সব তার ওপর। মুশকিল হলো এই যে, এটা শুরুও তো হয় তার হাতেই। হুমায়ূনের কবর বাধাবার পর অনেকটা ইটসিমেন্ট বাঁচলে প্রথমে পাকা করলো কলপাড়। পাকা কলপাড়ের পানি গড়াতে শুরু করলো পায়খানা যাবার পথে। গোরস্থানে যাবার পথও তো ঐটাই। গোরস্থান থেকে দুটো দুটো করে ইট বসিয়ে একেবারে উঠান পর্যন্ত নিয়ে আসা হলো। তখন দুই ভাইয়ের মাথায় চাপলো বাড়ি পাকা করার হাউস। নায়েবের ভয়ে শরাফত একটু দোনোমননা করছিলো, তাতে কাদেরের জেদ চড়ে গেলো দশগুণ, মোসলমানের বাড়ি পাকা হলে নায়েবের গাও কামড়ায়? কাদের অবশ্য টাউন থেকেই ইট আনতে চেয়েছিলো। তাতে ঝামেলা মেলা, খরচাও পড়ে বেশি। বিলের উত্তরে জমি পত্তন নিয়ে আজিজ ইটখোলা করলো। বাড়ি পাকা হলো, কিন্তু ইটের ভাটা আর বন্ধ হলো না। ইটের ভাটা সম্পূর্ণ ভাগ্যের ব্যাপার; হাজার চেষ্টা করেও, হাজার হুঁশিয়ার থেকেও কতো ভাঁটা থেকে থার্ড ক্লাস ইট বেরোয়, ঝামা বেরোয়। কিন্তু আজিজের ইট এ পর্যন্ত খারাপ হলো না। প্রথম প্রথম মানুষ কতো কথা বলেছে, জায়গাটা খারাপ, এটা হবে সেটা হবে। মুকুন্দ সাহার দোকানের ঐ বেয়াদব ছোঁড়াটা একদিন আজিজের সামনেই বললো, মুনসি সহ্য করবি না। মুনসির ইশারা পালে সন্ন্যাসী ঠাকুর কী করে না করে কওয়া যায় না। তা এখন মুকুন্দ সাহা তো নিজেই হঁটের ব্যবসা শুরু করলো এই বঁটখোলা থেকেই। কাদেরের কন্ট্রাকটরি করতে ইট যা লাগে সব তো টানে এখান থেকেই। চাকরিতে বলো, ব্যবসায় বলো, আল্লার রহমতে আজিজের দিন এখন ভালোই।
কিন্তু বৌ এরকম করলে তার আর কিসের সুখ? কেরামতকে দেখে প্রথমে সে তেমন আমল দেয় না, কাদের বাড়ি নাই।
কেরামত হাসে, আজ তো আসার কথা তারপর সে জানতে চায়, ভাবিসাহেবার অসুখ শুনিচ্ছিলাম! গাঁওশুদ্ধ মানুষের কৌতূহল আজিজের আর সহ্য হয় না। জবাব না দিয়ে বাড়ির ভেতরে সে যাবার জন্যে পা তোলে, কেরামত বলে, তমিজের বাপ কিন্তু বই দেখ্যা যা কছিলো, জয়পুরের পীরসাহেব শুনলাম একই কথা কছে?
আবদুল আজিজ ঘুরে দাঁড়ায়, তমিজের বাপ কী বলছিলো? ঐ যে উঠানে দাগ কেটে কেটে কী যেন বললো, না?
এলাকার সব মানুষের মতো কেরামতও জানে, তমিজের বাপ বই দেখ্যা কলো, ভাবিসাহেবার ভাই মরছে কি-না কওয়া যাচ্ছে না। অমবস্যার রাতে ফির কবার চাইছিলো, আপনেরা তো আর আসলেন না।
আজিজ এবার ভাবনায় পড়ে। তমিজের বাপকে একবার খবর দেওয়া যায় না? কিন্তু বেটার বৌয়ের এই রোগ রাষ্ট্র করতে শরাফতের ঘোর আপত্তি। কাদের আবার ফকিরালি পানিপড়া সহ্য করতে পারে না। কেরামতের সঙ্গে আজিজ একটু হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে নিচু গলায় বলে, মুশকিল, তমিজের বাপেক বাপজান একদম দেখবার পারে না। তমিজটা খালি খালি জেলের ভাত খাচ্ছে। সে যা বলতে পারে না তা হলো এই যে, এসব জুলুম করলে বাড়িতে রোগবালাই লেগেই থাকবে। তবে এটা বলতে পারে তমিজের বাপ হয়তো অসুখটার কারণ–।
