কেরামত আলি সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে একমত পোষণ করে এবং আবার ভিন্নমতও জানায়, জে। তমিজের বাপ এই বাড়িত আসলে আবার বড়োমিয়া কোদ্দ করবি। আর তমিজের বাপ তো জাহেল মানুষ। তার জারিজুরি সব পাওয়া যায় ঐ ফকিরের বইয়ের মদ্যে। বইটা যদি নেওয়া যায় তো–।
ঐ ছেঁড়াখোঁড়া বইটা? তমিজের বাপ তো লেখাপড়াই জানে না। ঐটা দেখে মাটিতে কীসব দাগ কাটে।
বইয়ের মধ্যে ইশারা দেওয়া আছে। ঐ বই আমার হাতে পড়ে তো আমিও বুঝমু। আপনেও বুঝবেন।
তা ঐ বইটা চায়া আনলেই তো হয়। ও কি বই দিবি?
আপনে হুকুম করলে বাপ বাপ করা দিয়া যাবি।
না না, জুলুম করার দরকার নাই। তমিজের বাপের শক্তিতে আজিজের একটু ভয় আছে, এমনি যদি দেয়। নিয়া আসো না। তাড়াতাড়ি করো। বাবরের মাকে বোধহয় এখানে রাখা যাবে না বেশিদিন।
না। দেরি হবি না। বই আমি নিয়া আসমু।
ক্যা গো, মণ্ডলবাড়িত শুনলাম, তমিজ বলে বারায়া আসিচ্ছে। তদবির চলিচ্ছে, না?
কেটা কলো? তমিজের বাপের হিম গলায় কোনো আশা বা সন্দেহ বোঝ মুশকিল। কালাম মাঝি তো দৌড়াদৌড়ি খুব করছে, একদিন পর পর টাউনে যায়, ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে দেখা করে, ভোটের আগে দেওয়া তার ওয়াদার কথা নাকি মনেও করিয়ে দেয়। উকিলের পেছনেও কালাম মাঝি খরচ করেছে মেলা। তার ছেলের জন্যে কালাম এতো ঢালছে, তমিজের বাপ সে টাকা শোধ করবে কী করে? কালাম মাঝি কাগজে তার একটা টিপসই নিয়ে তমিজের বাপের ভিটাসুদ্ধ ঘরগুলো নিজের নামে করে নিয়েছে। কুলসুম একটু গাঁইগুঁই করছিলো, তার ভাবনা, বুড়া মরলে তার ঠাঁই হবে কোথায়? কালাম মাঝি তো হেসেই অস্থির, আরে এই বাড়ি হামি লিয়া করমু কী? বাড়িঘরভিটা তোমারই থাকলো, তোমরাই ভোগ করবা। ট্যাকা দিলে একটা কাগজ রাখা লাগে না? না হলে ঐ শালা মণ্ডলই একদিন কবি, তোর ভিটার পালান তো হামাক বেচিছুই, ঐ সাথে বাড়িঘরও বেচা হয়া গেছে। আরে জাল দলিল একটা বানাতে ঐ বুড়ার আর কতোক্ষণ?
তা ভিটাবাড়ি লিখে দেওয়ার পর তমিজের বাপের আশা হয়েছে, তমিজ এবার ছাড়া পেতে পারে। চেরাগ আলি বলতে, মানুষের একদিকে লোকসান মানেই অন্য দিকে কোথাও লাভের ইশারা। বলতো,
বানেতে ভাসিল ধান না ভাঙিও মন।
পেঁয়াজরসুনে হইবে দ্বিগুণ ফলন।।
তমিজের বাপ ও কুলসুমের দিক থেকে তেমন সাড়া না পেয়ে কেরামত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আজিজ ভাই তমিজের জন্যে আফসোস করে খুব। তার বৌটা ক্যাংকা। হয়া গেছে, হামাক কয়, তমিজের বাপ ছাড়া তার ব্যারাম আর কেটা ধরবার পারবি না।
তার আর দেখার কী আছে? ভাইয়েক লিত্যি খোয়াবের মধ্যে দেখে। ভাই তো, তার মর্যাই গেছে। কুলসুমের এরকম ঠাণ্ডা কথায় কেরামত চুপসে যায়। হামিদার ভাইয়ের মৃত্যু সম্বন্ধে কুলসুমের এরকম নিশ্চিত ধারণা তার পছন্দ হয় না, একটা ভুল গণনা যদি বোনের কলজেটাকে জুড়াতে পারে তো কার কী লোকসান?
ঐ খোয়াবের কথাই তো হামি কলাম, আজিজ ভায়েক কলাম। আরে, ফকিরের বই তো যি সি বই লয়। খোয়াবের যিগলান তাবির ল্যাখা আছে, তোমরা তো বুঝবার পারো না। তমিজের বাপ গেলে ভালো হয়। না হলে হামাক বইটা দাও, তমিজের বাপের কাছ থ্যাকা হামি না হয় শিখ্যা পড়া লিয়া মণ্ডলবাড়িত যাই। কেরামতের এতো কথাতেও কুলসুম কিছু না বললে কেরামত জানায়, আজিজ হাজার হলেও একটা অফিসার মানুষ। তমিজের মুক্তির জন্যে সেও তো চেষ্টা করতে পারে। এরকম সুযোগ সহজে আসে না। তমিজ জেলের ভাত খাবে আর কতোদিন?
বছর ঘুরতে আর এক মাস বাইশ দিন। কুলসুমের সংক্ষিপ্ত দীর্ঘশ্বাসে কেরামত ভরসা পায়। ব্যাকুল হয়ে সে জানায়, বইটা একবার মণ্ডলবাড়িতে নিয়ে গেলে আজিজ হয়তো তার বাপের হাতে পায়ে ধরে মামলাটা উঠিয়েও নিতে পারে। কুলসুম কিছুই বলে না। তমিজের বাপ একটু উসখুস করলেও কুলসুমের চেহারায় পাথরের মূর্তি অবিচল থাকে। কেরামত বিরক্ত হয় না, বরং তার বুকের গম্বুজে পাথরের শক্তি তাকে বইটা হাত করার জন্যে তাকে আরো তাগাদা দিতে থাকে। কেরামতের সরব ও নীরব অনুনয়ে কাজ হয় না। কুলসুম চুপচাপ উঠানে গিয়ে বিপরীত দিকে মুখ করে, বুক বিপরীত দিকে রেখে বসে থাকে।
তমিজের বাপ জানে, আর বেশি চাপাচাপি করলে কুলসুম রান্নাবান্না না করে উঠানেই শুয়ে থাকবে। তখন তার খাওয়া দাওয়াও বন্ধ। তমিজের বাপ আস্তে করে বলে, আজ থাক। দেখি।
৩৫. অমাবস্যার রাত
অমাবস্যার রাত, কিন্তু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাঁটলেও তমিজের বাপের তো কিছু ঠাহর করতে কখনো ভুল হয় না। কিন্তু পাকুড়গাছটা আজ সে কোথাও খুঁজে পায় না কেন? পাকুড়গাছ না পেলে তার চলবে না। পাকুড়গাছের তলায় দাঁড়িয়ে মুনসির সঙ্গে তার চোখাচুখি হতে হবে। তমিজ আটকা পড়ে আছে, সে প্রায় এক বছর হতে চললো। বেটাটা তার ছাড়া পায় না কেন? কোথাও কোনো দোষ হলো কিনা কে জানে? গতবার মেলার দিন ভোরে, না ভোররাতে এমন ক্যাচালে পড়ে গেলো যে, পোড়াদহের মেলায় একটিবারের জন্যে উঁকিও দিতে পারলো না। সন্ন্যাসীর থানে জোড়া পায়রা দেওয়ার কথা, তমিজ দিলো কি-না তাও তো জিগ্যেস করতে পারলো না। আবার ভবানী সন্ন্যাসীর ভোগের বাঘাড়টা ধরলো। তা সেটা তো বাপু কালাহারের পানিতেই ছেড়ে দিলো। সন্ন্যাসী কি মেলার অছিলা করে মুনসিকে একটা মাছ দিতে পারে না? কী জানি বাপু, কোথায় কী দোষ হলো, পাকুড়গাছ থেকে অন্তত ইশারা করে একবার জানিয়ে দিতে পারে। আবার দেখো, দশরথ, কতো পুরানা আমলের মানুষ, তার ঠাকুরদার ঠাকুরদা, না-কি তারও বাপ না ঠাকুরদা এখানে এসেছিলো গিরিদের সঙ্গে, একই সময়ে বিলের এপার ওপারে বন কেটে বসত করলো তমিজের বাপের দাদা, না তারও দাদার দাদা, না-কি তারও বাপ না দাদা,—এসব হিসাব তমিজের বাপ করতে পারে না–তো সেই দশরথ কর্মকারের বাড়িতেও কি-না মাঝিরা আগুন ধরিয়ে দেয়। মুনসি কি এতেই গোস্বা করলো কি-না কে জানে? পাকুড়তলায় তমিজের বাপ একবার পৌঁছুতে পারলেই গাছের মগডালের দিকে তাকাবে, তা হলে মুনসি ইশারা করে ঠিকই বলে দেবে, কোনটা তার দোষ, কী তার গুনা।
