কাদের পর্যন্ত সমর্থন করে সাদেক আলিকে, শুনলা তো। তোমার গানে ইসলাম কৈ? ইসলামের মহিমা লিয়া গান লেখো, তেজি গান লেখো মিয়া।
এই গান জুতের না হওয়ায় কেরামতের তেজ নিভু নিভু। আজকাল কোনো গানই সে আর বাঁধতে পারে না। আলিম মাস্টার ঠিকই বুঝেছে, তোমার ভালো গান ঐ তেভাগার কথা লিয়া যিগলা লেখিছিলা উগলানই। তা জয়পুর পাঁচবিবিতে সে ঘটনা। দেখতো, মানুষের তেজ দেখতো আর কলমের আগায় গান ঝরে পড়তে ঝরঝর করে, এমনই তোড় আসতো যে, দোয়াতে কলম চোবাবার তরটাও সইতো না।
আজ তার এই হাল হলো কেন? অথচ কেরামত তো নিজে দেখেছে, চেরাগ আলি মানুষের যে কোনো খোয়াবের তাবির করতে চট করে একটা করে গান ধরতো আর খোয়াবের সঙ্গে তার শোলোক কেমন ফিট করে গেছে চমৎকার। চেরাগ আলি ভঁওতা মারতো, এসব হলো তার পাওনা-গান। তার সেই বইতেও কিন্তু ঐসব শোলোকের কিছুই পাওয়া যায় না। তবে?-তা হলে হয়তো বইতে আঁকা চৌকো চৌকো ঘরের ভেতরে আরবি অক্ষর কিংবা সংখ্যা যেগুলো আছে সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে ফকিরের শোলাকের ইশারা। তমিজের বাপের মতো একটা হদ্দ মাঝি, মুখর মুখ, হাবাগোবা মানুষ,-সেও মানুষের কাছে এতো খাতির পায় ঐ বইয়ের বরকতেই। তার ঐ যে ঝিম ধরে বসে থাকা, রাত হলে বিলের উত্তর সিথান না কী বলে শালারা, সেখানে পাকুড়তলা না কী যেন আছে, সেখানে ঘুমের ধ্যে ঘুরে বেড়াবার মধ্যে কী এমন মাজেজা থাকতে পারে? এসব তো আসলে শালার ব্যারাম! ব্যারাম ছাড়া আর কী? খালি ব্যারামের জোরে কেউ কি আর মানুষের কাছে ইজ্জত পেতে পারে? —আসলে তার বল হলো ঐ ফকিরের বই। বইয়ের জোরে সে ঝিম মেরে বসে থাকে, বইয়ের জোরে সে মানুষকে এভাবে টানতে পারে আর ধরে রাখতে পারে! ঐ বই যদি কেরামতের হাতে পড়ে তো প্রত্যেক দিনই সে মেলা শোলোক বেঁধে ফেলে। সব তার নিজের বাঁধা শোলোক, সেসব গান চেরাগ আলির পাওনা-গানের সুনাম ছাড়িয়ে উঠে যাবে কোথায়! মানুষে খালি শুনবে। আর বৈকুণ্ঠ পর্যন্ত মাথা নাড়বে, বলবে, ই বাপু, গান বান্দিছো একখান। হামাগোরে ফকিরও এংকা শোলোক কোনোদিন পায় নাই। আহা! কেরামতের গা শিরশির করে ওঠে, বইটা যদি নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়!—অবশ্য শীতেও তার গা শিরশির করতে পারে। নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
সে রাতে শীতও পড়েছিলো! গোলাবাড়ি হাটে সব কয়টা দোকানঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছিলো ভেতরের মানুষেরা। বটতলার বাঁধানো চাতালে বসে কেরামত দুই হাত তফাতের কিছু দেখতে পায় না। ঘোলাটে সাদা কাদার মতো থকথকে কুয়াশায় গাঁথা হতে থাকে তমিজের বাপের ঘরের চৌকাঠ। চৌকাঠের ওপারে মাটির মেঝেতে হাঁটু ভেঙে লম্বাটে পায়ের পাতায় চাপ দিয়ে বসে থাকে কুলসুম। বসে-থাকা অবস্থাতেও মেয়েটাকে কী লম্বা দেখাচ্ছে গো! আর কী সোন্দর তার গলার রেখা! গলায় ঘাগের আভাসমাত্র না থাকায় বুক তার ফুটে উঠেছে মস্ত দুটো ফুলের মতো। না, না ফুল নয়, জমজ গম্বুজের মতো। জোড়া গম্বুজের মাঝখানে এবং প্রত্যেকটি গম্বুজের চূড়ায় সেজদা দেওয়ার জন্যে কেরামতের মাথা নুয়ে নুয়ে পড়ে। জোড়া গম্বুজে, না, জমজ গম্বুজে সেজদা দেওয়ার জন্যে কেবল মাথা নয় তার গোটা শরীর এতোটাই কাঁপে যে, ভয় হয়, বটতলার ঘোলা কুয়াশার ঝাঁপিয়ে পড়ে খোদাই-করা পাথরের গম্বুজ দুটোকে সে তছনছ করে ফেলবে। হুঁশিয়ার হয়ে সে একটু সরে বসে। তখন তার জিভে সুড়সুড়ি লাগে, জিভে ফুসকুড়ির মতো শোলোক ফুটে উঠছে। কেরামতের খুশি খুশি। লাগে। এইবার যদি এসে পড়ে পাকিস্তানের তেজি গান! গান তেমন তেজি হলে কাদেরই টাউন থেকে খরচপাতি করে ছাপাবার ব্যবস্থা করবে। গান একবার চালু হলে কতো মানুষ কিনবে, পাইকারদের দিয়ে সে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। পাকিস্তানের তেজি গান ভেবে বিড়বিড় করলে ওঁয়া ওঁয়া করে বেরিয়ে আসে নতুন শোলোকের একটি চরণ,
সিনাতে খোদাই করা জমজ গম্বুজ।
কিন্তু এর পরের চরণ আর আসে না। এটা কী ধরনের শোলোক তার মাথায় পয়দা হয়? এটা তার নিজের বাঁধা শোলোকের লাইন তো? কী জানি, সেদিন কুলসুমের ঘরের দরজার চৌকাঠে যে দুটো চরণ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো বমির মতো, সেটাও কি তার বাঁধা? কৈ, তার কোনো শোলোকের সঙ্গে তো এর কোনো মিল নাই। তা হলে, এটা কি বেরিয়ে এসেছে ফকিরের ঐ বইয়ে পাওয়া কোনো ইশারা থেকে? কুলসুম কি বই তাকে কিছুতেই দেবে না?
মণ্ডলবাড়িতে একদিন গিয়ে ফকিরের বই হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখে কেরামত। কাদের ছিলো না, তবে দেখা হলো আবদুল আজিজের সঙ্গে। আজিজের মন খারাপ, বেশ মুসিবতে আছে। ফসল কাটার সময় নিয়ম মাফিক বৌকে নিয়ে এসেছে, কিন্তু ধানের মাপজোকের দিকে হামিদার এবার মন নাই। তার ভাই আহসান আলি যে কলকাতায় দাঙায় মরে যায় নি, এই ধারণা এখন তার বিশ্বাসে দাঁড়িয়েছে। জয়পুরের কাছেই খঞ্জনদিঘির পীরসাহেবের কাছে তাকে নিয়ে গিয়েছিলো আজিজ। হুজুর জানিয়েছে যে, আহসান আলি মরে নি। দক্ষিণের কোনো বড়ো শহরে ছোটো গলির একটি ঘরে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। শহরটি যে কলকাতা এ তো বোঝাই যায়, কিন্তু গলির ঠিকানা পীরসাহেবে দেয় নি।
এরপর হামিদা প্রথমদিকে সপ্তাহে দুই দিন, পরে চার দিন এবং দিন পনেরো হলো রোজ রোজ স্বপ্ন দেখছে : মোটাসোটা কয়েকটা টিকিওয়ালা লোক খালি গায়ে খাটো ধুতি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে আহসানকে ঘিরে, তাদের সর্দারের কপালে লাল চন্দন লাগানো, হাতে সিঁদুর লাগানো খাড়া খাড়াটা ঝুলছে আহসানের মাথার ওপরে, তার কোপ নিচে পড়তে শুরু করতেই, আহসানের গলায় কি মাথায় ঘা পড়ার আগেই হামিদার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙে তার নিজেরই বিকট চিল্কারে, জেগে উঠে সে প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আর এবারে শ্বশুরবাড়ি এসে প্রথম রাত্রেই স্বপ্নে সিঁদুরমাখা খাড়ার নিচে আহসানের মুখে একটি কচি চেহারার লক্ষণ দেখে মানোযোগ দিয়ে লক্ষ করে!-আরে, এ তো তার হুমায়ুনের মুখ। নরণাং মাতুলক্রমঃ প্রবাদটি অনুসারে হামিদার এই স্বপ্নসিরিজের অনেক আগে থেকেই ছেলেবেলার আহসানের সঙ্গে হুমায়ুনের স্বভাব, আচরণ ও চেহারায় অনেক মিল ছিলো; আর স্বপ্নে দুজনকে অভিন্ন শরীরে দেখে হামিদা ভয় পায়, আবার একটু খুশিও হয় বৈ কি?-মামা ভাগ্নে এক সঙ্গে, এমন কি একই শরীরে থাকলে সিঁদুরমাখা খাড়াটা হয়তো ঠেকাতে পারবে।
