শরাফত বলে, কেরামত, চলো, মাঝিগোরে আটকান লাগবি। কাছারির কিছু হলে সর্বনাশ হয়া যাবি গো। কিন্তু ততোক্ষণে আশেপাশের গ্রামের মানুষ সব ভিড়ে গেছে। মাঝিদের সঙ্গে, কাদেরের দোকানের ভেতর থেকেও বোঝা যায়, সবাই চিৎকার করতে। করতে ছুটছে লাঠিডাঙা কাছারির দিকে। শরাফত একবার বাইরে বেরিয়ে ও কাছারির দিক থেকে বন্দুক ছোঁড়ার আওয়াজে ঘরে ঢুকে কাঁপতে থাকে।
ওদিকে কাছারি থেকে কয়েকবার বন্দুকের আওয়াজ হতে থাকলে কালাম মাঝির ভাইপো আফসার দলবল নিয়ে পিছু হটে। কিন্তু অনুসারীদের সামলানো তখন তার সাধ্যের বাইরে, সমলাবার ইচ্ছাও তার ছিলো কিনা সন্দেহ। লোকজন উল্টোদিকে দৌড় দেয় বটে, তবে রাস্তা থেকে কয়েক গজ ভেতরে মুচিপাড়ার সবেধন নীলমণি। আটটা ঝুপড়ি তছনছ করে দেয় এবং গোটা বারো শুওরকে মেরে ফেলে মাছ মারার বড়ো বড়ো কোঁচ দিয়ে। কেউ কেউ গোলাবাড়ির হাট পর্যন্ত আসে এবং কাদেরের অফিস-কাম-দোকানের ভেতর থেকে শরাফত ও কেরামত শুনতে পায় শালা মুকুন্দ। সাহার দোকানটা ধরা হোক। কিন্তু কালাম মাঝির উচ্চকণ্ঠ ধমকে তারা থামে, আরে এটাক ধরা কী হবি? বাদ দাও। খাড়াও, কালই শালা একটা বন্দুক জোগাড় করি, শালার লায়েবেক জখম করবার না পারলে হামার জিউ ঠাণ্ডা হবি না।
পরদিন গোলাবাড়িতে হাটবার। কিন্তু দোকানপাট সব বন্ধ, লোকজন যা আছে। সবাই চাপা উত্তেজনায় চুপচাপ হাঁটে। আগের রাতে নায়েবের নাকি কাছারিতেই থাকার কথা, বোধহয় খবর পেয়েই বিকালবেলা কেটে পড়েছে। গুজব শোনা যাচ্ছে, নায়েববাবুর কাছ থেকে খবর পেয়ে জমিদারবাবুর বড়ো ছেলে আলি আহমদ সাহেবের কাছে রিপোর্ট করেছে। হাটে হয়তো পুলিস এসে পড়বে, পুলিস এলে কী হতে পারে, কার কার ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি,—এই নিয়ে জল্পনা চলে। আবদুল কাদের কাছারি হামলার ব্যাপারটা জানতো না, গফুর কলুকে সে একটু বকেও দিয়েছে। তবে এই নিয়ে নায়েবের থানা পুলিস করার কথায় সে বেশ রেগে যায়। তার দোকান-কাম-অফিসে বসে প্রথম রাগটা সে ঝাড়ে অনুপস্থিত বাপের ওপর, বাপজানের এটা বাড়াবাড়ি। কাছারিত হামলার খবর শুনলে তার এতো মাথা গরম হয় কিসক? বাপজানের সম্পত্তিত হাত দেওয়ার ক্ষমতা কি নায়েবের আছে? নায়েব আছে কয়দিন? এ্যাসেম্বলিতে জমিদার উচ্ছেদের বিল তো ওঠানোই হছে, কয়দিন পরে জমিদারই পাছার কাপড় তুল্যা দৌড় মারবি, আর নায়েব তো তার চাকর।
আলিম মাস্টার এই বিলের ব্যাপারে তার আপত্তি জানায়, কিন্তু জমিদারগোরে। আবার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কিসক? তা হলে তো জমিদারগোরে কাছ থ্যাকা জমিদারি একরকম কিন্যাই লেওয়া হচ্ছে। এটা কি জমিদারি উচ্ছেদ হচ্ছে, কও?
সেদিন টাউনে লীগ অফিসে এই নিয়ে কথা উঠেছিলো, মিল্লাত পত্রিকায় এই নিয়ে সরকারকে নাকি খুব একচোট নেওয়া হয়েছে শুনে শামসুদ্দিন খোন্দকার বলছিলো, আরে মানুষকে সর্বস্বান্ত করার রাইট তো সরুকারকে দেওয়া হয় নাই। ইসমাইল হোসেনের কথা শুনে শুনে কাদেরও জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বলে আসছে। কিন্তু এই আলিম মাস্টার মুসলিম লীগের কোনো কাজেই ভালো কিছু দেখতে পায় না বলে কাদের এখন সাদেক উকিলের কথার প্রতিধ্বনি করে, ইসলামে কারো সম্পত্তি জোর দখল করার আইন নাই, বুঝলেন? সরকার একজনের সম্পত্তি লিবি দাম না দিয়া, তা কি ইনসাফের কাম হয়, কন?
দেড়শো বছর ধরা জমিদাররা সম্পত্তি ভোগ করিচ্ছে, প্রজার ধনপ্রাণ সব তারাই ভোগ করলো, এতো করার পরেও জমিদারির দাম উশুল হয় নাই? কয়েকটা মানুষ কাছারির সামনে হৈ চৈ করলো, এখন শুনি পুলিস অ্যাসা সবগুলাক বান্দিবার ব্যবস্থা করিচ্ছে।
আলিম মাস্টারের প্রথম কথাটির জবাব দেওয়া কঠিন বলে কাদের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যায়। তা ছাড়া কয়েকদিন আগে ইসমাইল হোসেনও অবিকল এই কথাগুলোই বললো।
তবে মাস্টারের দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি নিয়ে সে বেশ উৎসাহিত, আরে রাখেন আপনার পুলিস। গোলাবাড়িত পুলিস ঢোকানো অতো সোজা নয়।
কেরামতের সমর্থনের আশায় সে জিগ্যেস করে তাকেই, কী হে কবি, আধিয়াররা পুলিসকে আচ্ছা কোবান দেয় নাই? জয়পুরে পুলিস তো ভালোই মার খাইছিলো, নয়?
কাদেরের কথায় কেরামত চাঙা হয়ে ওঠে এবং একদিন পরেই গান বেঁধে ফেলে। তা ভালো সুযোগও পাওয়া গেলো একটা। গোলাবাড়িতে সেদিন সাদেক উকিল আর শামসুদ্দিন ডাক্তার উপস্থিত। কাছারির হামলার ব্যাপারটা বোধহয় তারা সরেজমিন দেখতে এসেছিলো আলি আহমদের হুকুমেই। কাদেরের অনুমোদনে কেরামত আলি শুরু করলো,
বিসমিল্লা বলিয়া আজি বাঁধিনু শোলোক।
খোশখবর দিব আজি শুন ব্রলোক। আজি দীন গরিবের
আজি দীন গরিবের আঁধার দিনের হইল অবসান।
এই ভারতে কায়েম হবে আজাদ পাকিস্তান। সেথায় সবাই সমান
সেথায় সবাই সমান দীনী ফরমান হইবে সেথায় জারি।
প্রজার মঙ্গল তরে উচ্ছেদ হইবে জমিদারি জমিদারে প্রজায়
জমিদারে প্রায় জোতদার চাষায় একই আসন পান
চাষীমজুর দীনদরিদ্রের মুশকিল আসান।।
গানের তখনো মেলা বাকি, সাদেক উকিল হাত তুলে থামায়, রাখো। তোমরা একটা পয়েন্ট বোঝা না, মোসলমান গরিব ধনীর ভেদাভেদ করলে এখন লাভ হচ্ছে কার? সলভ্যান্ট মুসলমান থাকলে বেনিফিটেড হবে এন্টায়ার মুসলিম নেশন। সলভ্যান্ট লোক না থাকলে ডেভেলপমেন্ট হবে কী করে? এখন গভর্নমেন্ট বিলংস টু আস। দেয়ার শুড বি নো এজিটেশন এগেনস্ট আওয়ার ওন গভর্নমেন্ট। নাজিমুদ্দিন সাহেব সেদিন কারেকটলি পয়েন্ট আউট করলেন, এখন আমাদের ফাইট হলো এগেনস্ট দি হিন্দুস।
