সুতরাং শাসাতে হয় তমিজের বাপকেই, শরাফত মণ্ডল তার আরেক দোষ ধরে, কাল তোমরা মাঝিপাড়ার মানুষরা আগুন ধরায়া আসিছে কামারপাড়াত। আর বেনবেলা সাথে লিয়া ঘোরো বৈকুণ্ঠক, তোমার মতলবটা কী কও তো? এই চ্যাংড়াটাক
মারবার ফন্দি করিছো? এ বাপের কথায় কাদের একটু অসন্তুষ্ট, কামারপাড়াত আগুন ধরলো কীভাবে কেউ কবার পারে? কামারের ঘরে তো দিনরাত হাঁপরের আগুন জ্বলেই। হাঁপর থ্যাকাও তো দশরথের চালে আগুন ধরবার পারে। না-কি?
কাদেরের তেজে একটুখানি জ্বলে ওঠে গফুর কল, কলকাতা মোসলমান মরিচ্ছে কুত্তাবিলায়ের লাকান। আর এটি দশরথ কর্মকারের মরিছে দুইটা গোরু। তা গোরু তো হিন্দুর দেবতা, গোয়ালেত যায়া দেবতাক ছাড়া দিবার পারলো না কিসক, লিজের জানের ভয়ই বেশি হয়া গেলো?
গোরু ছাড়া থাকলে তুই ধর্যা লিয়া আসবার পারিলিহিনি, না? আরে, তুই হলু কলুর বেটা, গোরু তো তোর জান রে! গোরু ছাড়া গাছ থ্যাকা ত্যাল করবার পারবু? মাঝিগোরে সাথে তুইও গেছিলু? মাঝিপাড়ার ঘাটা না তোর জন্যে বন্ধ করা হছে?
বাপজান। সংযম রাখা কাদেরের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে, আজ হিন্দুর হাতে মার খাচ্ছে সব জাতের মোসলমান। মোসলমানের আবার জাত কী? কিন্তু হিন্দুরা কলকাতায় কি কোনো মোসলমানকে বাদ দিচ্ছে, কন? আহসান আলির হত্যাকাণ্ডটি সে বর্ণনা করে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায়। মরার আগে সে এক ফোঁটা পানি খেতে চাইলে হিন্দু গুণ্ডা তার মুখে পেচ্ছাব করে দিয়েছিলো। হিন্দু মেয়েরা পর্যন্ত বাড়ির ছাদ থেকে লাঠিসোটা এগিয়ে দিচ্ছিলো। তার উত্তেজনায় শরাফত মণ্ডল নরম হয়, কিন্তু বাপু আজিজের জানটাও তো বাঁচলো হিন্দু দোকানদারের হাতেই। এটাও তো দেখবা।
সে রকম তো আমরাও করি। করি না? এই যে বৈকুণ্ঠ গিরি, কাল সন্ধ্যা থ্যাকা কচ্চি, বাপু, একটু হুঁশিয়ার হয়া থাকো। চেনাজানা মানুষ, একে আমরা চিনি, এর জন্যে কি আমাদের মায়ামমতা নাই?
আর ঐ হিন্দু দোকানদার? শরাফত মরিয়া হয়ে তর্ক করে, আজিজের সাথে ঐ মানুষটার কি চেনাজানা আছিলো?
আপনে একটা একটা মানুষ ধরা যদি কথা কন তো আর কিছু কওয়া যায় না। কিন্তু এখন উঠিছে জাতের সওয়াল। হিন্দু মোসলমান কাটাকাটি করে দুই জাত হয়।
একটা একটা মানুষ নিয়েই তো জাত, এই কথাটা বলা শরাফতের বুদ্ধিতে কুলায়। আবার এই সময় আজিজ তমিজের বাপকে ডেকে নেয় বাড়ির ভেতরে, এতেও সে বিরক্ত। বরং এতেই বেশি অসন্তুষ্ট হয়ে সে বড়ো বেটাকে বলে, দেখো, বাপু, বাড়ির ভেতরে পর্দার দিকে খেয়াল রাখো।।
কিন্তু ততোক্ষণে তমিজের বাপ ভেতরের উঠানে গিয়ে বসে পড়েছে তার দাদাশ্বশুরের ভেঁড়াখোড়া বই আর একটা কঞ্চি নিয়ে। এই বাড়ি পাকা হবার পর সে ভেতরে ঢুকলো এই প্রথম। উঁচু পাকা বারান্দায় জলচৌকিতে বসে রয়েছে হামিদা, পাশে শরাফতের দুই নম্বর বিবি। হামিদার মাথার ঘোমটা তার কপালের ওপরেই ওঠানো। কাঁদতে কাঁদতে সে যা বলে তা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয় তার সৎশাশুড়ি। হামিদার মতো তারও বিশ্বাস, আহসান আলি মরে নি। হিন্দুরা তাকে হয়তো কোথাও লুকিয়ে রেখেছে, কিংবা সে পালাতে গিয়ে আটকা পড়েছে কোথাও।
তমিজের বাপ উঠানে বসে নানারকম দাগ কাটে, বিড়বিড় করে কী বলে, বইটা দেখে, তারপর রায় দেয়, কুটি আছে এখন কওয়া যাচ্ছে না। মরলে তো–।
কই নাই? হামি কই নাই? হামিদা এমনভাবে চেঁচিয়ে ওঠে যে, তমিজের বাপ তার ভাইয়ের জীবিত থাকার কথা ঘোষণা করলো। ফেঁপাতে ফোঁপাতে সে বলে, গত–কয়েকদিন ধরে বাড়ির পশ্চিমদিকে খালি কাক ডাকে, খালি কাক ডাকে। তখনই তার মনে হয়েছে, কোথাও কী সর্বনাশ হচ্ছে। কিন্তু মিয়াভায়ের কথাটা তার একবারো মনে হয় নি। তবে তার মিয়াভাই নামাজরোজা করা মানুষ, সে অপঘাতে কখনোই মরতে পারে না। হাজার হলেও সে হলো টাউনের লোক, কলকাতায় চলাফেরায় সে কি আবদুল আজিজের চেয়ে অনেক বেশি পারঙ্গম নয়? তমিজের বাপ তো দুনিয়ার আর আখেরাতের অনেক কথা জানে। সে কি একটু গোনাগাথা করে মিয়াভাইয়ের এখনকার অবস্থাটা বলে দিতে পারে না?
তমিজের বাপ উঠতে উঠতে বলে, অমাবস্যার আগে আর কিছু কওয়া যাবি না।
অমাবস্যার রাতে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়তলায় মুনসির দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাটা বাড়ে। এ তো সবাই জানে। আজিজের কেমন ভুলোলা লাগে, সম্বন্ধীকে সে কি সত্যি একেবারে মরে যেতে দেখেছে? তাকে মেরে কি নালার ভেতর ফেলে দিতে দেখলো? তা অমাবস্যার সময় না হয় তমিজের বাপকে আরেকবার ধরা যাবে। তার তো এখনো দিন বিশেক বাকি।
সন্ধার আগেই আজিজ তার বৌকে টমটমে উঠিয়ে নিয়ে গেলো টাউনে। সেখানে তার শ্বশুরবাড়িতে বৌকে রেখে সে চলে যাবে জয়পুর। বাবরটা একা পড়ে আছে সেখানে। ছেলেকে নিয়ে সপ্তাহখানেক পর সে ফের শ্বশুরবাড়ি আসবে। ঐ সময় বাড়িতেও এক পাক ঘুরে যাবে। এইসব ঝামেলায় ইটখোলায় লোকসান হচ্ছে। মুকুন্দ সাহাকে কয়েক হাজার ইট দেওয়ার কথা। তাকেও কিছু বলার সময় পাওয়া গেলো না।
বেটা বেটার বৌ চলে গেলে খড়ম পাল্টে পাম্পসু পায়ে শরাফত মণ্ডল রওয়ানা হয় কামারপাড়ার দিকে। যুধিষ্ঠির এবার তার জমিতে বর্গা করে আউশ ফলালো, কামারের হাতে খন্দ মন্দ হয় নি। কিন্তু কাল তো আগুনে তার দুটো গোরুই পুড়ে মরেছে। এবার তাকে বর্গা করতে দেয় কী করে সেই ভাবনায় মণ্ডল বেশ কাতর।
৩৪. নারায়ে তকবির—আল্লাহু আকবর
নারায়ে তকবির—আল্লাহু আকবর স্লোগানে গোলাবাড়ি থেকে ওদিকে লাঠিডাঙা এবং এ দিকে গিরিরডাঙা পর্যন্ত কেঁপে উঠলে শীতরাত্রির হিম কেটে লাফিয়ে ওঠে চারপাশের গ্রামগুলো। শরাফত মণ্ডল নিজেই প্রায় দৌড় দিয়ে হাজির হয় গোলাবাড়ির হাটে, কাদেরকে ধরে এই মানুষগুলিকে যে করে হোক ঠেকাতে হবে। কিন্তু কাদের দোকানেও নাই। চেয়ার ও বেঞ্চ জোড়া দিয়ে নবিতনের বোনা কাঁথার ওপর রেড ক্রসের কম্বল গায়ে মাথায় জড়িয়ে অঘোরে ঘুমায় কেরামত আলি। তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে তাকে ওঠাতে হয়। কাদের ভাই তো সন্ধ্যার অনেক আগেই টাউনে গেলো, কাল দুপুরবেলা আসবি। তো দরজা আটকানো নাই কেন? ভালো করে চোখ মুছে কেরামত দেখে, পাশে গফুর নাই। দরজা খুলে বাইরে থেকে ভালো করে ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেছে কেরামত টেরই পায় নি। শরাফত হায় হায় করে। দরজা ভেতর থেকে ভালো করে না আটকে এরকম কুম্ভকর্ণ মার্কা একটা লোককে রেখে যায় সে কোন আক্কেলে? কলুর বেটাকে একশোবার বেচলেও দোকানের মালপত্রের দাম উঠবে না। তবে শরাফতের হায় হায় করার দ্বিতীয় কারণটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। গফুরও তা হলে কাছারি হামলা করতে গেছে, এর মানে এতে কাদেরেরও সায় আছে। কাছারির একটা প্রাণীর গায়ে আঁচড় লাগলে নায়েববাবু আশেপাশের গ্রামে একটা মানুষকে রেহাই দেবে না। টাউনের নেতাদের সঙ্গে কাদের দিনরাত ঘোরে, অথচ বোঝে না, জমিদারবাবুর বড়ো ছেলে হলো খান বাহাদুর আলি আহমদের গেলাসের ইয়ার। বন্ধুকে খুশি করতে খান বাহাদুর মন্ত্রীর সমস্ত ক্ষমতা খাটাবে।।
