না তো।–রাত্রিবেলা কামারপাড়ায় কারা যেন আগুন লাগিয়ে এসেছে। তারা সব চিৎকার করতে করতে যায় এবং আগুন লাগিয়ে ঐভাবে নারায়ে তকবির, আল্লাহ আকবর বলতে বলতে ফেরে। তবে কামাররা একজোট হয়ে আবার বন্দে মাতরম চিৎকার করতে করতে তাদের তাড়া করে। কামারের ঘরে তো আর অস্ত্রের অভাব নাই, তাই হামলাটা তাদের ওপর বেশিক্ষণ চালানো যায় নি। এই পর্যন্ত বলতে কুলসুম বেশি সময় নেয় না। বৈকুণ্ঠ কেবল জিগ্যেস করে, আগুন ধরাছিলো কী দিয়া?
কুলসুম তা জানবে কোত্থেকে? গলা একেবারে খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে সে কেবল জানায়, মানুষ গেছিলো এই পাড়া থ্যাকা। কালাম মাঝির ঘরত কাল মেলা মানুষ জড়ো হছিলো। তামান রাত কথাবার্তা শোনা গেছে। তমিজের বাপোক ডাকে নাই। তাই ঘুম পাড়িচ্ছিলো, একবার বুধা বুঝি ডাক দিলো, হামি শুনলাম কালাম মাঝি কচ্ছে, দূর ঐ বোগদাটাক লিয়া কী হবি? তোমরা যাও।
ডোবা থেকে ফিরে উপুড় হয়ে লুঙির কোঁচড়ে মুখ মুছতে মুছতে তমিজের বাপ বলে, উগলান থো। তুই ক বৈকুণ্ঠ, কী দেখলু ক।
কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দেখা স্বপ্ন বলতে বৈকুণ্ঠের এলোমেলো হয়ে যায়। একবার বলে, টিনের চাল থেকে ইঁদুর পড়ছিলো টপটপ করে, ধানের বস্তায় ঢুকে তারা ধান সব খেয়ে ফেলেছে। তারপর অনেক মশাল জ্বলতে দেখে সে চেরাগ আলিকে জিগ্যেস করে, এতো আলো কিসের? চেরাগ আলি বললো, এসব হলো বৈকুণ্ঠের বিয়ের আতসবাজি। তারপর কী একটা শোলোক বললো, এখন সেটা আর মনে পড়ছে না। নিজের বিয়ের স্বপ্নের কথা কুলসুমের সামনে বলতে তার কেন যেন বাধো বাধো ঠেকে। মানুষের স্বপ্নের বৃত্তান্ত শোনার খাই এই ছুঁড়িটার কখনো গেলো না। দাদার আমলে ছিলো যেমন, এখনো তেমনি আছে। দাদার ধাতই পেয়েছে, স্বপ্নের কথা শুনতে হলে পয়সা চাই তার। এখন কেমন বেহায়ার মতো বলে ফেললো, শোনো, ইগলান কাম পয়সা ছাড়া হয় না। দাদা কম করা হলেও একটা কানা পয়সা না লিয়া খাবের তাবির কয় নাই। তমিজের বাপ তাকে হাত তুলে চুপ করতে বললে ভেতরের উঠানে যেতে যেতে সে গজর গজর করে, মানুষটাক গাঁও পার করা দিয়া আসো গো, অক তো মারবিই, তোমার ঘরতও আগুন দিবি।
কুলসুমের এসব কথায় বৈকুণ্ঠের স্বপ্নের বিবরণ ফের উল্টাপাল্টা হতে থাকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ইন্দুরে ধানের বস্তাত ঢুকা খালি খুটখাট করিচ্ছিলো। তারপরে–।
কুলসুমের বিড়বিড় বকা হঠাৎ ছন্দ পায়,
ইন্দুরে খাইলো ধান বড়ো কুফা বাত।
জানিয়া রাখিও বান্দার কমিলো হায়াৎ।।
কুলসুমের একটিমাত্র শোলোকে বৈকুণ্ঠের সারা রাতের স্বপ্নই মনে পড়ে। প্রথম থেকে সে সব বলে আর চেরাগ আলির বই সামনে রেখে তমিজের বাপ একটা কাঠি দিয়ে মাটিতে চৌকা চৌকা দাগ কাটে। এর মধ্যে কালাম মাঝির বাড়ি থেকে শোর শোনা যায়, আজ শালা হাতিয়ার লিয়া যামু। মালাউন এটি একটাও রাখা হবি না। অন্য একটি ভারী গলায় কে বলে, আজ শালা লায়েবেক ধরা হবি। শালা হামাগোরে মানুষ জ্ঞান করে না। শুনতে শুনতে তমিজের বাপের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি-না বোঝা মুশকিল। মাটিতে আঁকিবুকি কাটা তার অব্যাহত থাকে।
ক্যা গো তমিজের বাপ, ও চাচা ও তমিজের বাপ চাচা। শমশেরের গলা শুনে। একটু চমকে উঠলেও তমিজের বাপ তাকে ভেতরে ডাকে।
শমশের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, মণ্ডলের, বড়ো বেটা তোমাক খবর দিছে, এখনি যাওয়া লাগবি।
কিসক? কুলসুম প্রায় তেড়ে আসে, ঐ বাড়িত যাওয়া লাগবি কিসক? যার বেটাক জেলের ভাত খিলাবার পাঠাছে, তাক আবার ডাকে কিসক?
মণ্ডলের বেটার সম্বন্ধি না শালা না শ্বশুরেক কলকাতাত হিন্দুরা জববা করিছে। খবর পাও নাই? তো আজিজ মিয়ার বৌ বিশ্বাস পায় না। স্বামীক কয়, তুমি হামার ভায়েক ছ্যাড়া পলায়া আসিছো। হামার ভাই মরে নাই। এটা ঠিক ঠিক কবার পারবি তমিজের বাপ। টাউনের মেয়ামানুষ, কাল থ্যাকা খবর শুন্যা খালি বেহুঁশ হয়া যাচ্ছে। তুমি না হয় একবার চলো। তমিজের বাপকে রাজি করাতে সে টোপ দেয়, এই সুযোগে তমিজের কথাটাও না হয় তুলবা। বৈকুণ্ঠের দিকে নজর পড়লে শমশের একটু কাঁচুমাচু হয়, ক্যা গো, তুমি? কলকাতাত বলে হিন্দুরা মোসলমান ধরা ধরা মারিচ্ছে। তুমি বাপু এটি থাকো না, হাটোত যাও, না হয় সাহার বাড়িত যায়া কয়টা দিন থ্যাকা আসো।
তমিজের বাপ বৈকুণ্ঠকে ছাড়ে না, তুই আমার সাথে চল। তোর খাবের তাবির করা সোজা লয়। এখন চল। ঘুরা আসি।
মণ্ডলবাড়ি ঢোকার আগেই হামিদার হাউমাউ কান্না তমিজের বাপের বুকে জোরে ধাক্কা মারে। এই মেয়েটার বুক থেকে তার বেটাটা ছিড়ে গেলো এই তো কয়েক মাস আগে। এখন আবার হিন্দুরা কেড়ে নিলো তার ভাইকে। কালাহারের মুনসি এসব দেখে না? কলকাতা অনেক দূরের জায়গা, অতোটা দূরে তার নজর বোধহয় আর যায় না।
তমিজের বাপকে দেখে শরাফত মণ্ডলের মেজাজ চড়ে যায়, বুড়াটা আবার এই বাড়িত ঢোকে কোন সাহসে? বিল ডাকাতি করিছে, এখন বাড়িত হামলা করবার চাস? শালা নিমকহারাম বুড়া।
আবদুল আজিজ বিব্রত হয়, ভয় পায় আরো বেশি। তবে বাপের চেয়েও বেশি ভয় তার তমিজের বাপের অভিশাপকে। সে কিছু বলার আগেই আবদুল কাদের বলে, তমিজের বাপকে খবর দিয়া আনা হছে। ভাবি খালি বেহুঁশ হয়া যাচ্ছে। আহসান ভাইয়ের আসল অবস্থাটা যদি তমিজের বাপ কবার পাবে, ভাইজান তাই তাক খবর দিছে।
বেটার বৌয়ের এসব আদিখ্যেতা শরাফতের অসহ্য ঠেকে। হায়াৎ মওতের মালিক আল্লা। আল্লা মওত দিয়েছে, ছেলেটা মারা গেছে। মুর্দাকে জিন্দা ভাবা, কিংবা মুদাকে জিন্দা করার চেষ্টা করা গুনা। রসুলুল্লী স্বয়ং কারো হায়াৎ মওত নিয়ে আল্লার কাছে তদবির করেন নি। আর কোথাকার কোন শালা তমিজের বাপ, এই বাড়ির নিমক খেয়ে বড়ো হয়ে আবার তারই বিল ডাকাতি করতে যায়, সেই ডাকাতটা আসে মরা মানুষের। তত্ত্বতালাশ করতে। আবার এসব শেরেকি কাম হয় কি-না তারই বাড়িতে। বড়োবেটার বৌ এসে তার জামাতের ইজ্জত নষ্ট করে দিলো। টাউনের মেয়ে, গায়ের রঙ ফর্সা, আবার বৌ হয়ে আসার পর বাড়ির আয় উন্নতিও বেড়েছে, ছেলেমেয়েদের মানুষও করছে ভালো করে। বৌটাকে কিছু কওয়াও যায় না, আবার সওয়াও মুশকিল।
