বৈকুণ্ঠ নড়বে কি, তার সামনে ত বন ঝুলছে সন্ন্যাসীর হাতের খাঁড়া। আবদুল আজিজের সম্বন্ধীকে সে কয়েকবার দেখেছে, টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ আর টিকালো। নাক দেখে কে বলবে, এ বামুনের ঘরের ছেলে নয়? আর ব্যবহার কতো ভালো, তাকে বলতো বৈকুণ্ঠবাবু; সাহার দোকানের কর্মচারী বলে কখনো হেলা করে নি। খুব পান খেতো, জর্দাও খেতো একই মার্কার। একবার খুশি হয়ে নিজের জর্দার কৌটা জোর করেই দিয়ে দিলো বৈকুণ্ঠের হাতে, বললো, আরে টাউনে এই জর্দা তো যখন তখন পাই। আপনে রাখেন।—তো সেই মানুষকে খুন করলো কারা গো? ঐ খুনীদের ঘাড়ের ওপর ভবানী সন্ন্যাসীর খাড়া যদি নেমে না আসে তো সেটা সন্ন্যাসীর হাতে রেখে কী লাভ? সে কি কেবল মাগীমানুষের গয়না হয়ে হাতে ঝুলবে? মুকুন্দ সাহার দোকানে কয়েকদিন থেকেই সে শুনে আসছে, কলকাতায় খুব দাঙা চলছে। মোসলমানরা হিন্দু। মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে নিজেদের ঘরে, আর হিন্দু পুরুষমানুষগুলোকে কচুকাটা করছে। তা মোসলমান জাত শালারা বড়ো মাথাগরম, শালাদের খাওয়াদাওয়ায় বাছবিচার নাই, এর এটো সে খায়, পুরুষগুলো আছে খালি বিয়ের তালে। কিন্তু আবদুল আজিজের সম্বন্ধী, আহা কী সুন্দর ছেলেটা, এভাবে খুন হবে কেন? বৈকুণ্ঠের মাথাটা এলোমেলো হয়ে যায়। তার খুনীদের ওপর সন্ন্যাসীর খাড়াটিকে ঝুলতে দেখার জন্যে সে ওখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। সন্ন্যাসী এই এলো বলে। পাছে সে চোখের আড়াল হয় এই ভয়ে বৈকুণ্ঠ এক পা নড়ে না।
তার পিঠে হাত রেখে আবদুল কাদের তাকে একরকম ঠেলে বাইরে নিয়ে যায়। মুকুন্দ সাহার দোকানে তাকে ঢুকিয়ে বারান্দা থেকে চিৎকার করে, মুকুন্দবাবু, আজ রাতটা আপনারা ঘরের ভেতর থাকবেন। চিন্তার কারণ নাই। তবু বাইরে না বারানোই ভালো। কলকাতায় মোসলমান মারার খবর পায়া চ্যাংড়াপ্যাংড়া একটু চেত্যা আছে। তা আমাদের ওয়ার্কাররা হাটের মধ্যেই থাকবি, ভয় নাই।
মুসলিম লীগের কর্মীরা হাটে থাকবে শুনে মুকুন্দ সাহার ভয় বাড়ে। কলকাতার খবর সে কম রাখে না। কাদের তো পড়ে দৈনিক আজাদ, সতীশ মুক্তার সবসময় বলে অজাত। মুক্তার লেখাপড়া জানা বামুন, ঠিকই বলে, শালা মোসলমানরা ভাষা পর্যন্ত লিখতে জানে না ঠিকমতো, আবার কাগজ হাঁকায়। মুখের হাতে ভুলভাল ভাষায় মিছে। কথা ছাড়া আর কী বেরুবে?–আবদুল কাদের চলে গেলে মুকুন্দ সাহা ফিসফিস করে, বৈকুণ্ঠ, দরজার খিল লাগাবু, ছিটকিনি দিবু, বাঁশের ঊশাটাও লাগায়া দিস। তারপর ধানের বস্তা দরজার সামনে এনে বলে, এই দুইটা দরজার সাথে ঠেস দিয়া রাখিস। যে শালাই আসুক, দরজা খুলবু না। শাবল থাকলো, ভয় করিস না। আজ হামার বাড়িত যাওয়াই লাগবি। বাড়ি খালি। হরিপদ থাকলে কয়েকদিন আগে মৃত ভাইপোর কথা মনে পড়ায় তার গলা ভারী হয়ে আসে। তবে ঘর থেকে নামতেই তার পা হয়ে আসে খুব হালকা, তাড়াতাড়ি চলে যায় বাড়ির দিকে।
লণ্ঠনের আলোয় বৈকুণ্ঠ বিছানা পাতে ঘরের কোণে তক্তপোষের ওপর। ঘুমের ঘোরে খাড়া হাতে সন্ন্যাসীকে তৎপর দেখার লোভেই হোক আর হঠাৎ-নামা টিপটিপ বৃষ্টির সঙ্গে চেরাগ আলির গান শোনার সখেই হোক, কিংবা চোখ জুড়ে ঘুম নেমেছিলো বলেই হয়তো বিছানায় শোবার সঙ্গেসঙ্গে বৈকুণ্ঠ ঘুমিয়ে পড়ে। তার ঘুমোবার সুযোেগ নিয়ে দরজায় ঠেস দিয়ে রাখা বস্তা দুটোয় ঢুকে পড়ে ইঁদুর! তাদের ব্যস্ত চলাচলের শব্দে জেগে উঠে বৈকুণ্ঠ সারা ঘরে ভালো করে ঘুরে ঘুরে দেখে। না, কোথায় ইঁদুর! বৃষ্টি বোধহয় থেমে গেছে, টিনের চালে এখন আর টুপটাপ আওয়াজ নাই। বিছানায় ঘুমোলে বৈকুণ্ঠ ফের শোনে, এই শুরু হলো ইদুরের উৎপাত। এদিকে কারা যেন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে, এতেও শালা ইদুরের আসাযাওয়া এতোটুকু কমে না। ধানের বস্তা সব সাফ করে ফেললো। তারপর আলো বাড়তে থাকলে ইঁদুর আর থাকে না। কিন্তু এতো হ্যাজাক জ্বলে কেন? এসব কিসের আলো? এতো মানুষ মশাল নিয়ে এসেছে কেন? এতো আলো, এতো লোকজন দেখেও, তার মাথায় টোপর দেখেও চেরাগ আলি গম্ভীর হয়ে থাকে। কী হলো? ও ফকির, কথা কও না কিসক? তার ব্যাকুলতায় ফকির একটু হাসে, বলে, তোর বিয়া, তুই বুঝিস না? তা তার বিয়েতে ফকিরের এমন মন খারাপ করার কী হলো? বিয়া হলে কি আর হামাগোরে সাথে তুই থাকবু, না তোক থাকবার দিবি? বলতে না বলতে তার হাতের দোতরার টুংটাং আওয়াজে বেজে ওঠে :
নওশা সাজে আপনারে দেখি মুসা হাসে।
শুনিয়া মজনুর মুখে বেদনা পরকাশে।।
শাদিতে মিলন শাদি পরম মিলন।
পরম মিলনে ছিন্ন হয় নিজ জন।।
ফকিরের খটখটে কথায় বৈকুণ্ঠের ঘুম ভেঙে যায়, তার গা ছমছম করে। বিয়ের স্বপন দেখা ভালো কথা নয়। ফকির তো সেই কথাই জানিয়ে গেলো। এখন প্রথম জানালো, না-কি আগেও এই শোলোক সে কখনো বলেছে? একবার তমিজের বাপের কাছে গেলে হতো, অনেক করে ধরলে সে নিজে কিংবা কুলসুম এই স্বপ্নের একটা বৃত্তান্ত ঠিক বলে দেবে।
ক্যা রে, বৈকুণ্ঠ, আয় ঘরত আয়। বৈকুণ্ঠের গলা শুনে তাকে আদর করে ঘরে ডেকে তমিজের বাপ বিছানা ছেড়ে ওঠে। ঢুকতে ঢুকতে বৈকুণ্ঠ বলে, স্বপনের মধ্যে ফকির আসিছিলো, শোলোক কয়া গেলো। মনে হলো, তোমার কাছে বিত্তান্তটা শূন্যা লেই।
তমিজের বাপ ধীরেসুস্থে উঠে ডোবার দিকে যায়, তার কোনো তাড়া নাই। তাড়া দেয় বরং কুলসুম, তুমি এটি আসো কোন আক্কেলে? কামারপাড়ার সোম্বাদ শোনো নাই?
