তমিজের বাপ মাথা নেড়ে না বললে কালাম মাঝি ফের বলে, তুমি কিছু না দিলে হামি আর কতো টানি, কও?
হামার আছে কী? বাড়ির পালানে ভিটাও তো মণ্ডলকে দিলাম আকালের বছর।
মণ্ডলকে তোমরা মনিব মানছো? ঘরটাও কি তাকই বেচবা?
ঘরের কথা তমিজের বাপ কখনো ভাবে না। ঘর বেচলে সে থাকবে কোথায়? কালাম মাঝি বোঝায়, ঘর তোমারই থাকবি। তোমার ঘর গেলে তোমার বৌবেটার। থাকার ব্যবস্থা তো করা লাগবি হামাকই, লয়? এ সম্বন্ধে তমিজের বাপ তার সঙ্গে একমত হলে সে বলে, আর তো কিছু লয়। হামি ট্যাকা দিয়াই যাচ্ছি, বেটা তো তোমার, তোমার দায়িত আছে না? হামার বেটা লায়েক, চাকরিবাকরি করে, হামাক লেখে, মাঝিপাড়ার ব্যামাক মানুষের জিম্মাদারি কি তুমি একলা লিছো? তাই তোমাক যা কলাম, চিন্তা ভাবনা করা দেখো।
কালাম মাঝি বাইরে বেরিয়ে গেলে বৈকুণ্ঠ হাঁটে তমিজের বাপের পাশে পাশে। কয়েক পা হেঁটেই বলে, তমিজের বাপ, কামটা তুমি ভালো করো নাই গো! তমিজের বাপ তার দিকে তাকালে সে গলা নামিয়ে বলে, ভবানীর দয়ের মাছ ধরা যে পাপ
করিছো তার দণ্ড দেওয়া লাগিচ্ছে হামাগোরে সোগলির।
তমিজের বাপের ঘোলা চোখ আরেকটু ঘোলাটে হয়, পাপ? গুনার কথা কচ্ছিস? মাছ ধরলে গুনা হবি কিসক?।
ঠাকুরের ভোগের মাছ লিয়া আসিছে পূজার দিন। লয়? ঠাকুরেক তাই এটি বুঝি আর রাখা যাচ্ছে না। লায়েববাবু কছে, সন্ন্যাসীর থানেত উগলান সাত জাতের পূজা বাদ দিবি। ইগলান কী, কও? গুনার ফল লয়?
পানির মাছ, পানিতই দিয়া আসিছি। দোষ ধরে ক্যাংকা করা?
এবার ভাবনায় পড়ে বৈকুণ্ঠ। তাই তো সকালবেলা বাঘাড়টা তো তমিজের বাপ ফেলে এসেছে কালাহার বিলে। উত্তরদিকে যাত্রা করে বাঙালির রোগা স্রোত ধরে বাঘাড় নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে ঠাকুরের দয়ে। তা হলে আর দোষ হলো কী?
উত্তরে তাকিয়ে তমিজের বাপ যেন কী দেখতে দেখতে বলে, মুনসি পাকুড়গাছ থ্যাকা ন্যামা আসিছিলো, তার সাটাসাটি শূন্যা হামি মাছ তো পানিত দিয়া দিলাম। হামার দোষ হলো কোটে?
৩৩. মুকুন্দ সাহার দোকানে
মুকুন্দ সাহার দোকানে কয়েক দিনের বাসি আনন্দবাজার পত্রিকায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকজন। কলকাতায় মুসলমানরা হিন্দুদের মেরে সাফ করে ফেললো। সুরাবর্দি নিজে পিস্তল নিয়ে বেরিয়েছে হিন্দু মারতে। সতীশ মুক্তারের গলাটা ঘ্যারঘারে হলেও আনন্দবাজার পত্রিকা জোরে জোরে পড়ে মন্তব্য করার দায়িত্বটা পালন করতে হয় তাকেই। তবে তার সাটাসাটি শুনে বৈকুণ্ঠের তেমন উত্তেজনা হয় না, এইসব মানুষের রাগ করার ক্ষমতাও তার জানা আছে। এই সময় দরকার ভবানী পাঠকের মতো তেজি সন্ন্যাসীর, পাঠান সেনাপতিকে নিয়ে সুরাবর্দি একশোটাকেও সে ঠিক সাফ করে ফেলতে। পারে। আজ সন্ধ্যার পর পোড়াদহে তার থানে বৈকুণ্ঠ গিয়ে একবার বসবে।
বেশ এক পশলা বৃষ্টিতে ভাদ্রের গুমোটটা ধুয়ে গিয়ে বিকালবেলা ঝকঝক করে উঠলে গাল ভরা জর্দা দেওয়া পান নিয়ে বৈকুণ্ঠ কাদেরের ঘরে গেলো কেরামতের গান শুনতে।
কিন্তু কাদেরের দোকানে আজ সুরের লেশমাত্র নাই। কাদেরের চেয়ারে বসে রয়েছে। আবদুল আজিজ। চোখজোড়া তার লাল, দাড়ি-না-কামানো গালে দাড়ির ছোটো ছোটো কাঁটার গোড়ায় গোড়ায় কাঁপুনিতে তাকে অচেনা ঠেকে। বৈকুণ্ঠকে দেখে কেউ কেউ তার দিকে তাকায় চোখ পাকিয়ে এবং কয়েকটা ছেলে হঠাৎ করে চেঁচিয়ে ওঠে, লড়কে লেঙে পাকিস্তান।
আবদুল কাদের বলে, বৈকুণ্ঠ, তুই যা, এখন যা। পরে আসিস।
বৈকুণ্ঠ একটু সরলেও দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং শোনে, কলকাতায় হিন্দুদের হাতে খুন হয়েছে আবদুল আজিজের সম্বন্ধী আহসান আলি। আহসানের সঙ্গে ছিলো আজিজ নিজে। সে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। কলকাতার ময়দানে সেদিন মুসলিম লীগের মস্ত মিটিং; মিটিং থেকে ফেরার সময় হিন্দুরা তাদের হামলা করলে সম্বন্ধীর হাত ধরে আজিজ দৌড় দেয়। মিটিঙেই ওরা শুনেছিলো, শহরে অনেক জায়গায় দাঙা লেগে গেছে। সভা শেষ হওয়ার আগেই তারা বেরিয়ে পড়েছিলো। ধর্মতলা পর্যন্ত আসতেই দেখা গেলো, দোকানপাট সব লুট হচ্ছে। একটা হিন্দু দোকানের সামনে দাঁড়াতে চাইছিলো আজিজ, কিন্তু আহসানই তাকে টেনে নিয়ে যায় সামনে। তালতলার কাছাকাছি এলে এক মুসলমান দোকানে তারা উঠতে যাচ্ছে, এমন সময় কয়েকটা হিন্দু আহসানের পেটে বসিয়ে দিলো ছুরির ফলা। আহসান সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেলো। আজিজকে নিজের দোকানে টেনে নেয় এক হিন্দু দোকানদার। সেখান থেকেই সে দেখলো, আহসানের বুকে ছুরির আরো কয়েকটা ঘা বসিয়ে দিয়ে গুণ্ডারা পাকড়াও করলো ১৪/১৫ বছরের এক পানবিড়ির দোকানদারকে। আজিজ সেখানে কী করতে পারে? তাকে নিজের দোকানে আলমারির পেছনে পুরো দুটো দিন দাঁড় করিয়ে রেখে ঐ হিন্দু দোকানদার রাস্তায় ছেড়ে দেয়। আজিজ এইসব বলে আর হাঁপায়। কলকাতায়। দাঙা হবে কে জানতো? আজিজ গিয়েছিলো আহসানের দোকানের জন্যে মাল কিনতে। ১৬ তারিখে কলকাতায় সব বন্ধ, কেনাকাটা তো কিছুই হলো না। ভেবেছিলো পরদিন বাজার থেকে মাল কিনে রাত্রে দার্জিলিং মেলে ফিরবে। আহসান শান্তাহারে নেমে ধরবে মিটার গেজের ট্রেন আর আজিজ চলে যাবে জয়পুর। তা আল্লা তার কপালে যে এই রেখেছে তা জানতো কে? শেষে কলুটোলায় এক দর্জির দোকানে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আজিজ আজ টাউনে পৌঁছেছে দুপুরবেলা। শ্বশুরবাড়িতে কোনোমতে খবরটা দিয়ে। টমটম নিয়ে বাড়ি এসেছে। তার বৌ এখন বাড়িতে, বৌকে খবরটা দিতে সাহস হচ্ছে না বলেই আজিজ হাটে এসে বসে রয়েছে। সে তেমন কথাও বলতে পাচ্ছে না, তার সম্বন্ধীর খুন হওয়ার বিবরণ গফুর কলু এমনভাবে ছাড়ে যে, মনে হয় সে নিজে ঐ হাঙ্গামায় রীতিমতো অংশ নিয়েছে। তার বর্ণনা শুনতে শুনতে আবদুল আজিজ হঠাৎ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে, এই কান্না কতোটা সম্বন্ধীর শোকে আর কতোটা সম্বন্ধীর বোনের ভয়ে তা জরিপ করা মুশকিল হলেও তা সাড়া তোলে কাদেরের তরুণ কর্মীদের শরীরে। একজন বলে, কাঁদেন কেন? শোধ নেওয়া হবে। আবদুল কাদের বৈকুণ্ঠকে ধমক দেয়, বৈকুণ্ঠ, তুই গেলু না? ঘরত যা।
