হাটের ভেতরে কোলাহল, হাটের পুবে ও উত্তরে রোদের শেষ তাপে খুলে-যাওয়া শিমুল বৈকুণ্ঠ গিরির চোখের মণি ঢেকে ফেলে তুলার অশ্রু উড়িয়ে। বন্ধ চোখের মণিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে অন্য এক জোড়া চোখ, সেই চোখ দুটো একটু ছোটো করে ঠোট বাঁকা করে বলা কথাটা বৈকুণ্ঠের কানে বাজে চেরাগ আলির দোতারার সঙ্গতের সাথে, হামার পানি লিলে তোমার জাত যায়, তালে আম খাও তুমি ক্যাংকা করা? হামার আম। হামাক দাও, তুমি তোমার জাতখান লিয়া বাড়িত যাও। কিন্তু মুকুন্দ সাহা আজ তাকে কীসব বলে সব ওলটপালট করে দিলো। কুলসুমের বিয়ের দিন মহা হৈ চৈ করে বাতাসা আর খাগড়াই আর হাতিবান্ধার দৈ খেয়ে বৈকুণ্ঠ চলে গিয়েছিলো পোড়াদহ মাঠে সন্ন্যাসীর থানে। গাঁজায় ভালো করে দম দিয়ে বসে সে গান ধরেছিলো বিকট রবে। আজ এতোকাল পর কান ভরে সে শোনে সেই গানের কলি। গানটাই ভালোভাবে শোনার তেষ্টায় না-কি অন্য কোনো তাগিদে হাটের কোলাহল থেকে বেরিয়ে বৈকুণ্ঠ চলতে থাকে পোড়াদহ মাঠের দিকে। সন্ন্যাসীর খানের নিচে বসতেই, গাঁজায় দম না দিয়েও সে শুনতে পায় একই গান :
সন্ন্যাসী শোণিতে রাঙা মানাসের জল।
বিবাহের চেলি পরি করে ঝলমল।।
ধনে জামায়ের অনাসক্তি যৌতুক লইয়াছে ভক্তি
মৃত্তিকা বিগ্রহ তাহার সকল সম্বল।।
গান শুনতে শুনতে এবং তার সঙ্গে নিজের বেসুরো গলা মেলাতে মেলাতে ভবানী পাঠকের মহাপ্রয়াণ ও সংসারে তার বৈরাগ্য বৈকুণ্ঠের চোখে জলের জোয়ার নামালে তার নুনের ধকে তার চোখমুখজিভ খরখর করে। ভবানী তো ঢুকে পড়েছিলো মাটির বিগ্রহের মধ্যে, মাঘের শেষ বুধবারে পূজার পর বিসর্জন দিলেও তার মাটি বাঙালি নদীর রোগা স্রোত ধরে চলে যায় মরা মানাসের দয়ে। এখন নায়েববাবু ম্লেচ্ছ মাঝির ওপর রাগ করে এখানে যদি সন্ন্যাসীকে উৎখাত করে, তা হলে সন্ন্যাসী যাবে কোথায়? নায়েব এখানে প্রতিষ্ঠা করবে মা দুর্গাকে। সন্ন্যাসী কি আর অতো জাগ্রত দেবীর সঙ্গে পেরে উঠবে? কোথায় মা দুর্গা?–মহিষমর্দিনী, জগত্তারিণী মা, তুমি অম্বিকা, তুমি অন্নদা, তুমি মা চণ্ডী! তোমার বাহুতে শক্তি, সর্বাঙ্গে তোমার মানুষের ভক্তি মাখা! তুমি মা তারা, তুমি মা। কালী!—সেই জগজ্জননী মা কেবল নামের জোরে ভবানী পাঠকের স্থান দখল করার লোভে চড়ে বসেছে নায়েববাবুর ঘাড়ে। বেজাতের মানুষের পাপের দণ্ড দিতে নায়েব সন্ন্যাসীকে উৎখাত করে সেখানে বসাবে দুর্গা মা ঠাকুরণকে? তা হলে পোড়াদহের পূজার খোয়াবনামা স্থানে বেজাতের মানুষের আসাটা বন্ধ করা যাবে, টাউন থেকে এমন কি ভদ্দরলোক, বামুন কায়েতরাও সেখানে পূজা দিতে আসবে। বাঙালি নদীর কোলে বৌডোবা দয়ে মানাসের চোখের জলটুকু পর্যন্ত ঠাকুরের বেদখল হয়ে যাবে, সেটাও থাকবে মা দুর্গার দশ হাতের মুঠের মধ্যে!-তা হলে? তখন বৈকুণ্ঠের এখানে আর থাকার অধিকার থাকবে। কোথায়? সাহার কর্মচারী ছাড়া সে তখন আর কিছুই থাকবে না? সেরপুরে ঠাকুর্দার সৎ। ভায়ের ছেলেদের হাতে তার সম্পত্তি বেদখল হবার কথা কি কেবল গল্প হয়ে যাবে?—উত্তেজনায় ও দুশ্চিন্তায় এবং নিজের সম্বন্ধে অনিশ্চয়তার ফলেও বটে, বৈকুণ্ঠ ছটফট করে। তমিজের বাপের ওপর রাগ করার প্রবল চেষ্টা করেও লাভ হয় না। সে ফের। রওয়ানা হয় গোলাবাড়ি হাটের দিকে। সেখানে তমিজের বাপকে যদি পাওয়া যায়।
ভোটের দিনেও তমিজের বাপের দেখা নাই। মাঝিপাড়া ভেঙে মানুষ এসেছে। কালাম মাঝি হাজির করেছে সবাইকে। নাই খালি তমিজের বাপ। তা তার অবশ্য ভোটও নাই। তবু যারা এসেছে তাদের বেশিরভাগই ফালতু মানুষ, বছরে ছয় আনা ট্যাকসো দেওয়ার মানুষ এদিকে আর কয়জন?
তমিজের বাপের দেখা পেতে বৈকুণ্ঠের কেটে যায় আরো দেড় দেড়টি মাস। সেদিন মুকুন্দ সাহার খবর নিয়ে বৈকুণ্ঠকে যেতে হয়েছিলো গিরিরডাঙা। মণ্ডলের বড়ো ছেলে আবদুল আজিজ বিলের উত্তর সিথানেরও উত্তরে হঁটখোলা করেছে। সেখান থেকে কয়েক হাজার হঁটের বায়না দেওয়ার কথা মুকুন্দ সাহার। তা সাহা নিজেরই আসার কথা, কিন্তু গত রাতে সাহার ভাইপো মরে যাওয়ায় বেচারা আসতে পারে নি। চোখে জল নিয়েই সে বলে, তাড়াতাড়ি যা বৈকুণ্ঠ, টাইম মতো না গেলে আজিজ মিয়া আবার কোদ্দ করবি। কোস, পরশুদিন বায়নার ট্যাকা সব হামি লিজে দিয়া আসমু। কিন্তু বৈকুণ্ঠের আবার কখনো তাড়া থাকে নাকি? একটু ঘুরে ফিরে যাওয়াই তার চিরকালের খাসলত। মোষের দিঘির দক্ষিণ ঢালের ঠিক নিচে দুই বিঘা জমি এবার পত্তন নিয়েছে শরাফত মণ্ডল। হুরমতুল্লা সেখানে নিয়োজিত আউশ বোনার আয়োজনে। নতুন চষা জমিতে মই দিচ্ছিলো হুরমতুল্লা। সাত সকালে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে ফুলজান বাপের। মইয়ের পেছনে পেছনে ঘুরছে। বৈকুণ্ঠ একটু দাঁড়ায়, ক্যা গো, লতুন জমিত তো চাষ ভালোই দিলা। তারপর গলা নামিয়ে বলে, তোমার জামাই আছে না? হাটের মধ্যে গান তো ভালোই বান্দিচ্ছে। আছে নাকি? ঘরত আছে?
হুরমতুল্লা জবাব দেয় না। সেটা কি কথা বলতে গেলেই কাশির দমক ওঠে বলে?–কি শ্বশুরবাড়িতে জামাই একেবারেই আসে না বলে সে শরম পায়? কেরামত আলির নতুন গান মোসলমানের রাতের আঁধার হইলো অবসান গানটা গুনগুন করতে করতে বৈকুণ্ঠ বিলের ধার দিয়ে হাঁটতে থাকে।
তমিজের বাপকে সে দেখতে পায় মণ্ডলবাড়ি থেকে ফেরার সময়। কালাম মাঝির বাড়ির সামনের উঠানে সে বসেছিলো। কালাম তাকে বোঝাচ্ছে, আরে, ইসমাইল সাহেব জবান যখন দিছে, তমিজকে খালাস করার বন্দোবস্ত তো একটা হবিই। তা। উকিলের পয়পাতি তো কিছু লাগে। আমি দুই হোত পয়সা ঢালিচ্ছি, তোমার কাছে কিছু চাইছি, কও?।
