দশরথ আস্তে আস্তে বলে, বাবু, একটা কথা কই। তমিজের বাপের গাওত হাত না তোলাই ভালো।
কেন? নায়েববাবুর গলায় ঝঝ মেশে, শরাফত মণ্ডল যে খড়ম দিয়ে তাকে পেটালো, তাতে মণ্ডলের হাত কি খসে পড়েছে নাকি?
না বাবু। বৈকুণ্ঠ নায়েববাবুর ভুল ধরে, তমিজের বাপের গাওত হাত তুলিছিলো পাকুড়গাছের মুনসি। সন্ন্যাসীর ভোগের মাছ লেওয়ার শাস্তি দিছে মুনসি।
ইস! এই টুয়েনটিয়েথ সেনচুরিতেও এমন সুপারস্টিশন থাকলে স্বরাজ দিয়েই বা কী হবে, স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলনের ফলই বা কী হবে? অনিল সান্যাল মূখদের কুসংস্কারে বড়োই হতাশ। তবে দশরথ জানায়, মণ্ডল তার সাথে খারাপ ব্যবহার করিছে, কাদের মিয়া লিজে যায়া মাফ চায়া আসিছে।
দূর। এ জাতের বিশ্বাস নেই। সতীশ মুক্তার সোজা হয়ে বসে, মাঝির ঘরে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসে কোন আক্কেলে? আরে বাবা, লেখাপড়া যতোই শিখুক আর টাকাপয়সা যতোই করুক, জাতের স্বভাব যাবে কোথায়?
তবে প্রকৃত তথ্য জানা আছে নায়েববাবুর, আরে নাঃ। কিসের মাফ চাওয়া? ভোটের ক্যানভাস করতে গিয়েছিলো মাঝিপাড়ায়। তমিজের বাপের সঙ্গেও দেখা করেছে। তমিজকে খালাস করে আনার কথা বলে এসেছে ইসমাইল। অতো সোজা? ৩৮৭ ধারায় মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। নন-বেলেবল কেস। জামিনই পাবে না। নায়েববাবু মোটেই হতাশ নয়। আজ বৈকুণ্ঠ আর কর্মকারদের ডেকে আনা হয়েছে মণ্ডলের পরামর্শেই। তবে মরা মানাসের দ থেকে সন্ন্যাসীর উৎখাতের বুদ্ধিটা নায়েববাবুর নিজের। মণ্ডলের তাতে বরং সায়ই আছে। পোড়াদহ মেলায় মুসলমানরা যেসব কীর্তি করে মণ্ডল সেসব সহ্যই করতে পারে না। ওখানে মা দুর্গাকে বরং প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে মাঝিপাড়ার মানুষদের ওখান থেকে হটানো যায়। নায়েববাবুর স্বপ্ন : টাউনের ভদ্দরলোকরা তখন কেবল মেলা দেখতে আসবে না, পূজার উৎসবেও হৈ চৈ। করতে পারবে। ভূতের পূজা বাদ দিয়ে মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে যদি মা ভবানীর পূজার প্রচলন করা যায় তো আশেপাশের তো বটেই, টাউনের ভদ্দরলোকদেরও এখানে টানা যাবে। তাদের ছাড়া আনন্দবাজার পত্রিকায় এই খবর ফলাও করে ছাপাবার মুবোদ কি আর নায়েববাবুর হবে? এখন বোঝা যাচ্ছে, এখানে বড়ো ঝামেলা তৈরি করে বৈকুণ্ঠ গিরি। নায়েববাবু তাকেই কড়া করে ধমক দেয়, শোন বৈকুণ্ঠ, মাঝিপাড়ায় তোর এতো দহরম মহরম কিসের রে? ওখানে যাওয়াটা ছাড়। তোদের এইসব ভূতের পূজা বন্ধ করে দিলে দেখি শালার ম্লেচ্ছ মাঝিরা পোড়াদহ মেলায় ভেড়ে কী করে।
কাছারি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যুধিষ্ঠিরের পা আর চলতে চায় না। মাঝিপাড়ার মানুষের সঙ্গে মাখামাখি করলে নায়েব তো চটেই, মণ্ডলও সহ্য করবে না। মণ্ডল ফসল তাকে যতো কমই দিক, বর্গার জন্যে এবারেও তার কাছে ধন্না না দিয়ে তার আর উপায় কী? ভোটের ডামাডোলে মাঝিপাড়ার সঙ্গে কাদেরের একটা বুঝসুঝ হতেও পারে, তমিজ বেরুতে পারলে কাদেরকে ধরে তার একটা গতি হয়তো হয়ে যাবে। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের দশাটা হবে কী? জমি বর্গা না পেলে জগদীশ সাহার সুদ সামলাতে জমি বেচতে হবে মণ্ডলের কাছে। জেদ ধরে জমি ধরে রাখো তো সুদ সামলাতে ভিটেমাটি, থালবাসন, বাপের হপর, কামারশালা সব দিতে হবে সাহাকে। একবার জগদীশ সাহা, একবার শরাফত মণ্ডল।—যুধিষ্ঠির দিশা পায় না, তবে ভগবানের কৃপায় এর মধ্যেই একটা বুদ্ধি তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ইসমাইল সাহেবের ভোটের ক্যানভাসে যদি কাদেরের পিছে পিছে সে ঘোরে তো তার মনটা পাওয়া যায়। বিল ডাকাতির মামলা দেওয়ার পর মণ্ডল কি আর মাঝিদের বর্গা দেবে? যুধিষ্ঠির কি কামারপাড়ার কেউ তো আর মণ্ডলের সম্পত্তিতে হাত দিতে যায় নি, সুতরাং এই সুযোগে মাঝিদের বর্গা করা জমিগুলো সে তো দিব্যি হাতিয়ে নিতে পারে। এখন কাদেরের পেছনে ছোটাছুটি করলেই হয়।
কাদেরের দোকানের সামনে, কালাম আর মুকুন্দ সাহার গদিতে মানুষ গিজগিজ করে। মুকুন্দ সাহার টিনের বেড়ায় কংগ্রেসের তেরঙা পতাকার ছড়াছড়ি। কংগ্রেসের লোকজন এসেছে টাউন থেকে। এমন কি লাঠিডাঙা কাছারি থেকে পরে রওয়ানা দিয়েও টমটমে করে এসে পড়েছে অনিলবাবু। ওখানে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের কাম কী? কাদেরের কর্মীদের সঙ্গে সে ভিড়ে গেলে একজন বলে, তুমি এখানে কী করো? কংগ্রেসের এক ছাত্র কর্মী তাকে টেনে আনে সাহার দোকানের দিকে, ছেলেটি বলে, তুমি ওখানে কী। করছো? আরেকজন হাসে, আরে ইসমাইল সাহেবের তো মোহামেডান কনস্টিটুয়েনসি। তোমরা ভোট দেবে সুরেনবাবুকে, সুরেন সেনগুপ্ত, আমাদের কংগ্রেসের ক্যানডিডেট।
যুধিষ্ঠির একটু দমে যায়, কাদেরের সঙ্গে ভিড়তে পারলে মণ্ডলের জমিটা পাওয়া যায়। আবার ইসমাইল সাহেব এমনিতে মানুষটা ভালো, আবার ভোটে জিতলে নাকি আধিয়ারদের ফসলের হিস্যা বাড়াবার আইনও বানাবে। সুরেনবাবুও হয়তো ভালো মানুষ, কিন্তু যুধিষ্ঠির তো তাকে চেনে না। যুধিষ্ঠিরের মাথার এসব জট সাফ করতে এগিয়ে আসে অনিল সান্যাল, মুসলিম ভোটারদের জন্যে একজন এম এল এ, আমাদের এম এল এ আরেক জন। যুধিষ্ঠির এবার বোঝে, দুই জাতের জন্যে দুইজন মেম্বর।
বিকালে মুকুন্দ সাহা বৈকুণ্ঠকে আড়ালে ডেকে বলে, নায়েববাবু তোক সকালে কী কলো রে? শরাফত মিয়া তো কালই হামাক কয়া গেলো, নায়েববাবুর খুব রাগ তোর উপরে। তা তোর বাপু মাঝিপাড়ার সাথে এতো মাখামাখি কিসের রে? তমিজের বাপ বুড়া মানুষ, তার জোয়ান বৌটার সাথে তোর এতো কথাবার্তা কিসের রে? তোরা বলে সন্ন্যাসীর বংশ, তালে ঐ মোসলমান মাঝিগোরে ঘরে এতো আসা যাওয়া কিসক রে?
