দশরথ, যুধিষ্ঠির ও পালপাড়ার কেষ্ট পাল তার এই ভাষ্য শুনে থ। টাউনের সতীশ মুক্তার ও সেরপুরের অনিল সান্যাল চুপচাপ সায় দেয়। কিন্তু ছটফট করে বৈকুণ্ঠ। বাবুরা এসব বলছে কী? এই এলাকার ব্যামাক মানুষ জানে, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, সাহা, পাল, নমঃশূদ্র, মোসলমান সবাই জানে, এই দয়েই কোম্পানির সেপাইয়ের গুলিতে দেহরক্ষা করেন ভবানী পাঠক। সঙ্গে ছিলো তার পাঠান সেনাপতি। তো সেটা কী আর আজকের কথাঃ বৈকুণ্ঠের ঠাকুরদার ঠাকুরদা, তারও বাবা, না-কি তার ঠাকুরদা, সে তো সন্ন্যাসীর সঙ্গেই ছিলো। তা হলে?—আজ আবার মা ভবানীর কথা ওঠে কেন? বৈকুণ্ঠ আস্তে আস্তে। বলে, না বাবু, পোড়াদহ মেলার নাম তো সন্ন্যাসী ঠাকুরের নামেই। মেলার আগের দিন। মঙ্গলবার মেলার বটতলায় তাঁর বিগ্রহ রাখা হয়, সন্ন্যাসী ঠাকুর লিজে আবির্ভূত হন। মেলার দিন ভোররাতে।
মেলার কথা রাখ। পোড়াদহ মেলা আমোদ-প্রমোদের জায়গা, সাত জাতের মানুষ আসে। সেখানে তোরা যে কিসের পূজা করিস তোরাও তো ভালো করে জানিস না। তা পূজা কর, ভালোই। কিন্তু মানাসের দয়ের এতো নিকটে মায়ের পূজা হয় না, এটা কি সহ্য করা যায়? মা আমার বিশ্বমাতা, জগজ্জননী। তার অপমান আর কতো সহ্য করা যায়? মায়ের অপমানে আহত পূর্ণচন্দ্র হামলায়, মা, মা। মা গো, মা গো?
এই ব্যাকুল ডাকে মা তো মা, মায়ের বাপের পক্ষেও তিষ্ঠানো দায়। দাদামশায় বা মায়ের কিংবা দুজনেরই আবির্ভাবের আশায় ও আবির্ভাবের ভয়ে সবাই এদিক ওদিক দেখে। তাদের ভয় ও ভক্তিকে পোক্ত হবার সুযোগ দিতে নায়েবমশাই একটু থামে। তারপর নিশ্চিত হয়ে ফের মুখ খোলে, মায়ের ভোগ চুরি করলো এক মোসলা মাঝি, স্নেচ্ছের স্পর্শে দুয়ের জল অপবিত্র হলো। মায়ের আমার দয়ার শরীর, তিনি কিছু করলেন না। কিন্তু আমরা? আমরা তাঁর অধম সন্তান। আমরা কী করলাম?-না, হাত গুটিয়ে বসে রইলাম। ম্লেচ্ছ বেটা আস্কারা পেয়ে গেলো। ওর ছেলে নামলো বিল : ডাকাতিতে। আরে বিল হলো জমিদারের, যাকে খুশি পত্তন দেবেন, তাতে কার কী?
কাৎলাহার বিলের মাছ তো গিরিরডাঙার মাঝিরাই ভোগ করিচ্ছিলো বাবু। দশরথ কর্মকারের এই মন্তব্যে নায়েববাবু অসন্তুষ্ট হয়, আরে আগে অনাচার হচ্ছিলো বলে সব সময় কি তাই হতে থাকবে? জমিদার যদি আইনকানুন না দেখেন, প্রজার হিতসাধনে যদি মনোযোগী না হন তো প্রজার মঙ্গল হয় কী করে? গায়ের জোরে যে যা খুশি তাই করবে, আর জমিদার কি বসে বসে ঘাস খাবে? এ্যা, ঘাস খাবে?
তৃণভোজী জমিদার এদের কারো পছন্দ নয়। নায়েবের মুখে জমিদারের প্রতাপের। বিবরণ শুনলে এদের কালোকিষ্টি শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে। নায়েব পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী তখন ছাড়ে তার প্রকৃত ক্ষোভটি, ঐ যে তমিজের বাপ, মায়ের দেহ অপবিত্র করে, নিজের ছেলেকে উস্কানি দিয়ে বিল ডাকাতি করায় আর তোমরা ঘোয়রা তার পিছে পিছে। তাদের বাড়ি যাও, শুনেছি জল পর্যন্ত খাও। তোমাদের জাত কী? মায়ের অপমানে তোমাদের রক্তে আগুন জ্বলে না?
সেরপুরে অনিল সান্যালের পাতলা ঠোঁটে ভোরের চাঁদের পানা বেদনার হাসি, গম্ভীর দীর্ঘশ্বাসে চাঁদটিকে উড়িয়ে দিলে থাকে শুধু বেদনাটি। তাই সম্বল করে সে বলে, আরে, দেশটাই ভাগ করতে বসলো। আর এ তো সামান্য নদীর দ। এসব বলে।
মা ভবানীর অসম্মানকে আপনি সামান্য বললেন? আপনার মায়ের গায়ে হাত দিলে আপনি সহ্য করবেন? আর দুর্গা হলেন বিশ্বমাতা, এঁর অপমানে তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জ্বলে ওঠবার কথা। সতীশ মুক্তারের ক্ষোভ জ্বলে ওঠে রুদ্র তেজে, এই করেই তো আপনারা দেশটাকে তুলে দিলেন ওদের হাতে। কংগ্রেস যদি প্রথম থেকে ধর্মরক্ষায় মন দেয় তো দেশের অবস্থা কি আজ এরকম হতে পারে? মোসলমানদের কতো আস্কারা দেওয়া হয়েছে, ভেবে দেখেছেন কখনো?
কংগ্রেসের সেরপুর থানার সহকারী যুগ্ম সম্পাদক অনিলচন্দ্র সান্যাল কৈফিয়ৎ দেয়, সতীশবাবু, সবাইকে নিয়েই তো দেশ। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে কোল দিয়ে, হৃদয়ে সবাইকে ঠাঁই দিয়েই তো মহাত্মা গান্ধি মহাত্মা হয়েছেন।
এখন তার ঠেলা সামলান। দেশের শরীর কাটার জন্যে ওরা তলোয়ার নিয়ে খাড়া। নিজের ধর্মই তো মহাত্মার হাতে পড়ে নষ্ট হতে চলেছে।
না সতীশবাবু। অনিলচন্দ্র ধর্মভাবে উদ্দীপ্ত হয়, মহাত্মা নিজের ধর্মকে খাটো করবেন কেন? হিন্দুর ধর্ম, হিন্দুর স্বার্থের বিরুদ্ধে তিনি কি কিছু করতে পারেন? তিনি নিজেই তো বলেছেন, আমি সর্বপ্রথম হিন্দু, তারপর দেশপ্রেমিক। তার আদর্শ হলো শ্রীমদভগবদ গীতা।
এইসব রাজনৈতিক আলোচনায় নায়েববাবুর দরকারি কথাটাই সেরে ফেলা যাচ্ছে। শরাফত মণ্ডল এসে পড়বে, তখন তো খোলাখুলি কথা বলা মুশকিল হয়ে পড়বে। সুতরাং সতীশ মুক্তার আর অনিল সান্যালের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা বিঘ্নিত করে নায়েববাবু প্রজাদের বলে, শোনো বাবারা, যতো নষ্টের গোড়া ঐ শালা তমিজের বাপ। বোকা বোকা ভাব করে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাকা শয়তান একটা। ঐ বেটাকে আমি পুলিসে দেবো। মাঝিপাড়ার মানুষ একটু গোলমাল করতে পারে, ভোটের জন্যে কাদেরও তেমন কিছু করতে সাহস পাবে না। ওদের আঁটো করতে হবে তোমাদেরই।
দশরথ, যুধিষ্ঠির ও কেষ্ট পাল ভয়ে এবং বৈকুণ্ঠ গিরি ভয়ে ও দুঃখে চুপ করে থাকে। তমিজের বাপের সঙ্গে চেরাগ আলির মাধ্যমে পাকুড়গাছের সরাসরি যোগাযোগের কথা। গিরিরডাঙা, নিজুগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ি, পালপাড়া, রানীরপাড়া, পারানিরপাড়া, এমন কি সাবগ্রাম ছাইহাটার সব মানুষ জানে।
