তার বিড়বিড় ধ্বনি শুনে কুলসুম তাকায় ঘরের মাচার দিকে। কুলসুম ফিসফিস করে বলে, বই দেন। দাদা আসিচ্ছে, দাদা বই উটকাবি। কিন্তু বইয়ের জন্যে সে আর হাত বাড়ায় না, বরং হাঁ করে তাকিয়ে থাকে কেরামতের দিকে। কেরামত বিড়বিড় করে, আগুনে জ্বলিল মুখ দেখিয়াছি কোথা। খোয়বের সেই মুখ রহে এই হেথা। কিন্তু হয় না। শোলোক তার গানে খটখট করে, তেলের মতো গড়িয়ে পড়ে না। কুলসুম বলে, এই শোলোক তো দাদা কোনোদিন কয় নাই। কুটি পালেন আপনে?
বারবার বিড়বিড় করেও কেরামত মনমতো শোলোক আর পায় না। কুলসুম তার অসন্তুষ্ট আবৃত্তি শোনে আর কেঁপে কেঁপে ওঠে, কাঁপতে কাপতেই বলে, দাদা এই শোলোক তো কোনোদিন কয় নাই গো। মনে হয় মরার পরে এটা পাছে। দাদার লতুন পাওনা-গান, মরণের পরে দাদা তোমাক শোলোক দিলো? কুলসুম বড়ো ধান্দায় পড়ে, তমিজের বাপের সঙ্গে সঙ্গে কেরামত আলিও কি চেরাগ আলির সাগরেদ হয়ে গেলো? এই বইয়ে কি তবে কেরামতের অধিকার রয়েছে। এখন সে কী করবে? কেরামতকে বই দিয়ে দেওয়ার জন্যে চেরাগ আলি কি ইশারা পাঠিয়ে দিলো? এখন সে করে কী?
তবে কুলসুমের এই সমস্যার সমাধান করে দেয় কেরামত নিজেই, মনমতো শোলোক আসছে না দেখে এমনিতেই সে বলতে গেলে কাতর, এর ওপর আবার তার। শোলোক-সন্ধানে অন্য কাউকে কৃতিত্ব দেওয়া, একটু রাগ করেই কেরামত বলে, আরে তোমার দাদা এটা পাবি কুটি গো? শোলোক বান্দিলাম হামি। তোমাক দেখ্যা খুশি হলাম, শোলোক বান্দিলাম।
ও, এটা তা হলে কেরামতের পাওনা-গান নয়, এমন কি চেরাগ আলির মারফতেও সে এটা পায় নি। এ আবার কেমন ধারার মানুষ গো, যে কি-না নিজের মুখে ফাস করে দেয়, সে নিজেই শোলোক বাঁধে। তার দাদা চেরাগ আলি, যখন তখন তার মুখে এ শোলোক এসেছে গায়েবি জায়গা থেকে, সেই জায়গার খোঁজ জানতো একমাত্র চেরাগ আলি নিজে। আর তারই খোজে উত্তর সিথানে পাকুড়তলায় রাতবিরেতে ঘোরাঘুরি করে বেড়াচ্ছে তমিজের বাপ। আর কোথাকার কোন কেরামত আলি, তার দাদার বইয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারা পেয়ে যা বলে তাই আবার চালায় নিজের বাধা শোলোক বলে।। কুলসুম খুব ঝুঁকে প্রায় ছোঁ মেরে বইটি তুলে নেয় কেরামতের কোল থেকে।
কুলসুমের রাগের তাপ লাগে কেরামতের মুখে, তার ঝাঝ লাগে তার চোখে। তার কাতর মাথা ব্যথায় নুয়ে আসে। বই নিয়ে মাচায় উঠে কুলসুম তার দিকে স্থির তাকিয়ে থাকলে তপ্ত চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। ঐ আগুনের শিখা লাগে কেরামতের শরীরে এবং দেখতে দেখতে সব তাপ জমা হয় তার মাথায়। ঘরের চালের ফুটো দিয়ে রোদের রোগা একটা রেখা এসে কুলসুমের মুখে সত্যি সত্যি আগুনের আভা জ্বালিয়ে দিলে কেরামত বোঝে, সে আসলে স্বপ্ন দেখছে। কোন স্বপ্ন-না, কয়েকদিন থেকে দেখা স্বপ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটছে আজ তমিজের বাপের ঘরে। কিন্তু আজকের স্বপ্নের নতুন উপসর্গ প্রচণ্ড মাথাব্যথা। ভেতরে মগজ তার অাগুনের তাপে গলে গলে পড়ছে। ভয়ে, ব্যথায়, কষ্টে, উদ্বেগে ও উৎকণ্ঠায় তার গোটা থাই কাপে প্রবল বেগে।।
কেরামত আলি তার উথাল পাতাল মাথাটা নিচু করতেই মগজ সব তোলপাড় করে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে এই দুটি লাইন :
এ জেবনে রূপ যদি দেখিয়াছি কোথা।
খোয়াবে আগুন মুখ নাহিক অন্যথায়।।
৩২. বাঙালি নদীর কোলে
বাঙালি নদীর কোলে মা ভবানীর দ, দয়ের মাছ তো মায়ের সেবার জন্যেই, না কী। বলিস? প্রশ্নের জবাবের জন্যে নায়েববাবু পরোয় করে না, ঐ মাছ চুরি করে বেটা মাঝি, ম্লেচ্ছ মাঝি, এ্যাঁ? মায়ের সন্তান হয়ে আমরা তা সহ্যও করি! আবার তার সঙ্গে তোদের মহা খাতির! ছি!
ধিক্কারটি নায়েবমশাই থুক করে ছেড়ে সরাসরি বৈকুণ্ঠের দিকে। বৈকুণ্ঠের জড়সড় ভাবটি এতে কাটে, সে বলল, না বাবু। এটা হলো ভবানী সন্ন্যাসীর দ। ভবানী পাঠক। যুদ্ধ করিছিলো গোরা কোম্পানির সেপাইদের সাথে। বছর বছর হামরা তেনারই পূজা করি পোড়াদহ মেলার দিন। একটু থেমে সে জানায়, ওই দয়ের কাছে তিনি দেহ রাখিছিলেন।
দেবী আর সন্ন্যাসী কি এক হলো রে পাগলা? বিরক্ত হলেও পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী গলা চড়ায় না, বরং স্বর আরো নরম করে বলে, ভবানীপুর চিনিস তো? সেরপুরের কাছে। ভবানীপুর–
চিনি বাবু। হামাগোরে জ্ঞাতিগুষ্টি–।
তা হলে তো ভালোই চিনিস। ভবানীপুরে মায়ের মন্দির। জমিদারি নাটোরের। কিন্তু মন্দির তো আর রানী ভবানীর নামে হয় নি। দক্ষযজ্ঞের সময় মা দুর্গা ক্রোধান্বিত হয়ে নিজের দেহ রাখলে মহাদেব ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। আপন পরিবারের দেহ নিয়ে মাথার ওপর ঘোরাতে লাগলেন। তো নারায়ণ দেখলেন, মায়ের দেহে পচন ধরলে ধরিত্রীর বায়ু বিষাক্ত হয়ে যাবে। তিনি তাঁর চক্র দিয়ে মায়ের পবিত্র দেহ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিলেন বিশ্বময়। নানা স্থানে পড়লো দেহের নানা অংশ। আর মায়ের বাম কর্ণ পড়লেন কোথায়?-না, ঐ করতোয়া তীরে, ভবানীপুরে।
টাউনের সতীশ মুক্তার চোখ বুজে ঘাড় নাড়লে নায়েব পূর্ণচন্দ্র উৎসাহিত হয়ে বলে, সেই থেকে ঐ স্থানের মাহাত্ম্য, স্থানের নাম হলো ভবানীপুর। মায়ের কর্ণ এখনো সেখানই স্থাপিত, নিত্য পূজা হয়, ভক্তবৃন্দ প্রসাদ পান। কর্ণ ওখানে থাকলো আর মায়ের ভোগের নিমিত্ত মাছ রাখা হলো মানাস নদীর দয়ে। আহা, মানাস এখন মৃত, কিন্তু সেই দয়ের জল শুকায় না, বাঙালি ঐ দ কোলে করে মা ভবানীর মাছ পাহারা দেয়। আহা, ঐ জল বড়ো পবিত্র!
