ভর দুপুরবেলা তমিজের বাড়ির সামনে গিয়ে কেরামত আস্তে করে ডাকে, তমিজের বাপ, ও তমিজের বাপ, বাড়িত আছে নাকি গো?
ভেতর থেকে সাড়া দেয় কুলসুম, বাড়িত নাই।
হামাক না আসবার কলো। কেরামতের গলাটা কাঁপে, এক্ষুনি তো তাকে সে দেখে এলো গোলাবাড়ি হাটে। ভোটের আর একদিন বাকি, মাঝিপাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে কালাম মাঝি ক্যানভাস করে বেড়াচ্ছে, তাদের খাওয়াদাওয়া পানবিড়ির খরচ সব কালাম মাঝির। এসব খবর কুলসুমের সব জানা, কালাম মাঝি ভাত খিলাচ্ছে। ভোট হলে বলে তার বেটা খালাস পাবি, সেই খুশিত বুড়া বাড়িত আসে আত হলে।
হুঁ, তাক তো হাটোত দেখলাম। মিথ্যা কথা বলে ধরা পড়ার ভয়ে কেরামত কৈফিয়ৎ দেয়, তা মনে হলো, এতোক্ষণ কি আর বাড়িত আসে নাই।
এখন আর আসবি না। বাড়িত কেউ নাই তো।
তুমি তো আছো। বলেই ভয় পেয়ে কেরামত বলে, তমিজের বাপ কলো, হামার বাড়িত আজ চারটা ভাত খায়া যায়য়া।
ভাত খাবেন? বলে কুলসুম দরজা খুলে দিয়ে নিজে চলে যায় উঠানে। উঠান থেকে দেখা যায়, লোকটার মুখ খিদায় শুকনা। মাথায় বড়ো করে ঘোমটা দিয়ে কুলসুম। নিজের ভাতটা সবই একটা সানকিতে ঢেলে দেয়, বলে, খেসারির ডাল আছিলো কালকার। ঐ দিয়াই খাওয়া লাগবি।
কেরামত ভাত খায় আর আড়চোখে বসে থাকা কুলসুমকে দেখে। তার মুখে রোদ লেগে তার কালো মুখে তাপ বেড়ে উঠছে তা আন্দাজ করতে পারে সে এখান থেকেই। এই তাপ বাড়তে বাড়তেই তো আগুন জ্বলে উঠবে। তাই না? আজকাল রোজ দেখা স্বপ্নের মুখটা তো ভালো করে ঠাহর করা যায় না, এর সঙ্গে কি তার কোনো মিল আছে। নাকি? তার খাওয়া হতে থাকে আস্তে আস্তে, সে কেবল দরজার ওপারে ভেতরের বারান্দায় বসে থাকা কুলসুমের একদিকের গাল দেখে। একটা শোলোক যেন মাথায় তার একটু একটু খোঁচা দিচ্ছে। কেরামত তার নজর সরায় না, তার ভয়, নিজের চোখটাকে একটু এদিক ওদিক করতে দিলেই কালো মুখটা হারিয়ে যেতে পারে। খোয়াবে। আগুন জ্বলে দুনিয়া আসমানে।—এই তো শোলোক তো তার আসছে। কিন্তু না, এতে তার কথা বেরিয়ে আসছে না। না গো। শোলোক বুঝি তার জীবনে আর লেখা হবে না। ভাত খেয়ে খিদে তার মেটে, কিন্তু হঠাৎ করে মাথাটা ব্যাথায় টনটন করে। বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে দেখে, দুপুরের রোদের আঁচে চৈত্রের শিমুল জ্বলছে দাউদাউ করে। দুপুরের তাপে শিমুল ফুল থেকে রক্ত ফোটে আর ফেটে পড়ে সাদা তুলা হয়ে।
ফের ভাতের সানকিতে মন দিলে নতুন একটা চরণ আসে তার মাথায়, আগুনের। এতো রূপ নাই কোনোখানে। না, ঠিক হচ্ছে না। খাওয়া হয়ে গেলে সানকিতেই হাত ধুতে ধুতে কেরামত মরিয়া হয়ে বলে, তোমার দাদার বইখান একবার দেখবার চাইছিলাম।
দরজাত বসেন। হামি বই বার করি।
ঘরের বাইরে দরজার চৌকাঠে বসে কেরামত ফের চৈত্রের দুপুর দেখে। খোয়াবে আগুন জ্বলে দুনিয়া আসমানে, এর পরের লাইনটি জুত করে মনে করার জন্যে মুখে মুখে। সে নানান কথা বিড়বিড় করে, ভেতরে মাচায় খসখস আওয়াজ শুনে তার বুক ছমছম করে, ফকির কি এসে হাজির হলো নাকি? ঐ মাচা থেকেই তো সে একদিন বেশ লম্বা গান করলো একটা। আবার তার খুশিও লাগে ফকিরের ছায়া একবার যদি তাকে ছোয়, তা হলে হয়তো গান তার গলায় আসবে আপনাআপনি। কিন্তু ভয়ে ভয়ে ও একটু আশায় আশায় আবছা অন্ধকার ঘরে ভাবে, না, ফকির আসবে কোত্থেকে? মাচার ওপর কুলসুম। নাকের কাছে তার দাদার বই নিয়ে প্রাণপণে সে ওটার গন্ধ শুকছে। কেরামতের গলা শুকিয়ে যায়, গন্ধে গন্ধে কুলসুম কি বইয়ের সব কথা শুষে নিচ্ছে? গন্ধে গন্ধে সব টেনে আত্মসাত করে তার হাতে তুলে দেবে বইয়ের একটা ছিবড়ে? বইয়ের সব অক্ষর শুকে সাদা পাতা দেখিয়ে কুলসুম কি চেরাগ আলির নিরক্ষতা প্রমাণ করে ছাড়বে?
বইটা নিয়ে মাচা থেকে কুলসুম নামলে কেরামত তার দিকে হাত বাড়ায়। বই তার হাতে দিতে দিতে কুলসুম বলে, বই দেখ্যা দিয়া যান।
কেরামত হঠাৎ বুকে বল পেয়ে বলে, যদি না দেই?
না, এই বই এটি থাকবি। ঐ বই দিয়া আপনে কী করবেন?
বইয়ের পাতা ওলটায় আর কেরামত আলি দেখে, কোনোখানে কোনো শোলোকই নাই। খাকি রঙের কাগজে বইয়ের মলাট সেলাই করা, সেখানে কার কাঁচা হাতের লেখা, খাবনামা ফালনামা ও তাবির। এসব খাবনামা তো কিনতেই পাওয়া যায়। তবে এটার ভেতরে ছাপা কোনো পাতা নাই। অর্ধেকের বেশি পাতা জুড়ে চৌকোণা চৌকোণা দাগ, সেইসব বর্গক্ষেত্র আবার ভাগ করা হয়েছে ছোটো ছোটো ঘরে। একেকটি ঘরে একেকটি আরবি অক্ষর। নাপাক শরীরে আরবি লেখা ছুঁয়ে ফেলায় কেরামতের একটু একটু ভয় করে, কিন্তু এখন অজু করতে গেলে বইটা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। সে আস্তে আস্তে পাতা ওল্টায়, জীর্ণ পাতা, ধরতে হয় সাবধানে, একটু এদিক ওদিক হলেই পাতা ছিড়ে যাবে। এরপর গোটা গোটা বাঙলা অক্ষরে নানারকমের খোয়াবের বিবরণ। কোন খোয়াব দেখলে কী হতে পারে, এর ফলাফল কী, খোয়াবের তাবির সব বুঝিয়ে বলা। মুনসি কি এখান থেকেই মানুষকে সব খোয়াবের বৃত্তান্ত বলে দিতো? কিন্তু বইয়ের। কোথাও কোনো শোলোক লেখা নাই। তা কেরামত তো খাবনামা অনেক দেখেছে, শান্তাহারে এক লোক কেরামতের কবিতার বই বেচতো, সে আবার খাবনামা, মকসুদুল মোমেনিন, বেহেশতের জেওর—এসব বইও বেচতো। ওসব অবশ্য ছাপানো বই, সবই কলকাতায় ছাপা। তা এই বইটা কি কেবল হাতের লেখা বলেই এতো দামি? না-কি। মুনসির শোলোকের ইশারা সব দেওয়া রয়েছে ঐ আরবি অক্ষরগুলোর ভেতরে? ঐ চৌকোণা রেখাগুলো দেখে আর কেরামত মুনসির পাওনা-গানের ইশারা খোজে হন্যে হয়ে। কিন্তু সমস্ত মনোযোগের ওপর তার মাথায় দপদপ করে জ্বলে কুলসুমের মুখ। বইয়ের দিকে তাকিয়েই সে বোঝে কয়েকদিন ধরে তার খোয়বে আগুনলাগা ঘরে যে মুখটি দেখা যাচ্ছে সেটা হলো কুলসুমের মুখ। কুলসুমের চোখ থেকে আগুনের শিখা বেরিয়ে তার ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে দাউদাউ করে। চারকোণা রেখার বর্গক্ষেত্র দেখতে দেখতে কেরামতের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, খোয়াবে আগুন জ্বলে দুনিয়া আসমানে। আল্লা সেই রূপ রাখিয়াছে এইখানে কিন্তু শোলোক কেরামতের মনমতো হয় না, সে অস্থির হয়ে বইয়ের পাতা ওলটাতেই জীর্ণ পাতার একটু ছিড়ে গেলে কুলসুম চট করে তার মাথার ওপর ঝুঁকে পড়ে, বই ছিড়িচ্ছেন কিসক? দাও হামার হাতে দাও। কিন্তু কেরামতের মাথা এখন জ্বলছে দপদপ করে, জুতমতো শোলোক না পেলে এখন সে বাঁচবে না। খোয়াবের আগুন এসে ধরে যাচ্ছে তার মাথার ঝাঁকড়া চুলে, তাপে সে। ছটফট করে। মনমতো না হলেও ঐ দুটো লাইনই সে বিড়বিড় করে আওড়ায়।কিন্তু হলো না। হচ্ছে না।
