মাঝিরা হাঁ করে তার কথা শোনে। এদের মধ্যে তমিজেরও বাপও একজন। বুধা। মাঝি তাকে ঠেলে দেয় ইসমাইলের সামনে, বলে, তমিজের বাপ।
ইসমাইল চেয়ার থেকে উঠে হাত রাখে তার পিঠে, চেনাতে হবে না। তমিজ বিল ডাকাতির মোকদ্দমায় ফেঁসে গেলো। কঠিন মামলা। আমরা উকিল দেবো, আমাদের সাদেক সাহেব এখন ফৌজদারির সবচেয়ে ভালো উকিল। তমিজকে বের করে আনবো ইনশাল্লাহ। তারপর সবাইকে লক্ষ করে জানায়, বিল আপনারা ফেরত পাবেন। আইনের কিছু ফাঁকড়া আছে, জমিদারের হাতে এখন সম্পত্তি। আমরা জমিদারিই উচ্ছেদ করবো। তখন এই বিল আপনারা ছাড়া আর ভোগ করবে কে?
ইসমাইল হোসেনের কথায় মাঝিপাড়ায় এমনি সাড়া জাগে যে, তমিজের মুক্তির সম্ভাবনার খুশিও চাপা পড়ে তার নিচে। বিকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁশের বেড়ায়। বেড়ায়, গাছে গাছে সাঁটা হয়ে যায় মুসলিম লীগের পোস্টার। ভাত খেয়েই কয়েকজন তরুণ মাঝি ছোটে গোলাবাড়ির দিকে। অফিস থেকে মুসলিম লীগের পোস্টার নিয়ে লাগাতে হবে কালাম মাঝির দোকানে।
৩১. চারদিকে আগুনের শিখা
চারদিকে আগুনের শিখার ভেতরে কী করে ঢুকে পড়ে কেরামত আলি আর বেরুতে পারে না। আগুনের আভায় একটা মুখ চেনা চেনা ঠেকে; বলতে কি সেদিকে তাকিয়েছিলো বলেই সে আগুনের মধ্যে আটকে পড়ে; নইলে পালাবার সুযোগ হয়তো ঠিকই পাওয়া যেতো। মুখটা কার গো? লম্বাটে কালো মুখে আগুনের আঁচ, তার চোখে আগুনের শিখা দাউদাউ করে। আগুন লাগলো কি ওই চোখ থেকেই? মুখটাকে ঠাহর করার আগেই কেরামতের ঘুম ভাঙে আলিম মাস্টারের ডাকে, গফুর তোমাক সকাল সকাল যাবার কয়া গেলো। আজ বলে পারানিপাড়ার ইস্কুলের ফিল্ডে সভা।
সভার কথায় কেরামত ভাবনায় পড়ে। সেখানে তার পাকিস্তানের গান গাইবার কথা। কিন্তু কোনো শোলোকই তো মাথায় আসে না। সারাটা দিন তার কাটে ইসমাইলের ভোটের লোকজনের সঙ্গে, রাত হলে শুয়ে থাকে আলিম মাস্টারের পাশে। ভোটের হৈ চৈ তার মন্দ লাগে না, অনেক রাত্রি পর্যন্ত গোলাবাড়ি হাটে হট্টগোল, তার মধ্যেও ঝুঁদ হয়ে থাকা যায়। কিন্তু আলিম মাস্টারের পাশে শুতেই তার ঘুম পায়, ঘুমালেই আজকাল খালি দেখে আগুন লাগার খোয়াব। আগুনছিটানো চোখজোড়া প্রথমে মনে হয়েছিলো ফুলজানের, ঐ ঘেগি মাগী ছাড়া তাকে ওভাবে পোড়াতে আসবে আর কে? কিন্তু তার মুখ কি অমন লম্বাটে? না-কি তার ওই মুখ থেকে চোখ ফেরানো যায় না। কিছুতেই? রাত্রে শোবার আগে আলিম মাস্টার পর্যন্ত বলে, কেরামত পাকিস্তানের গান তোমার লেখাই লাগবি। ইসমাইল সাহেবের তদবিরেই তুমি পুলিসের হাত থাকা বচিছছা। হয় তার ফরমায়েশ মতো গান বান্দো, না হলে জয়পুর পাঁচবিবির ঘাটা ধরো। তেভাগার গান তো তোমার মেলা লেখা আছে। লীগের ছেড়াগুলান যাই বলুক, আধিয়াররা ব্যামাক পিঠটান দিছে, এটা বিশ্বাস হয় না বাপু।
কিন্তু শোলোক বাঁধতে গেলেই লম্বাটে একটা মুখ থেকে আগুনের আঁচ এসে লাগে তার মাথায়, হয়তো সেই মুখটা ভালো করে দেখার আশাতেই ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসে, সে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। আলিম মাস্টারের ডাকে বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ ধরে ভাবলে মাথায় আসে পয়ারের দুটি লাইন,
ভারতবর্ষে কায়েম করো আজাদ পাকিস্তান।
মোসলমানের সকল দুঃখের হইবে অবসান।।
কিন্তু জুতের গান হয় না। এর পরের লাইনগুলোর মিল পাওয়া যায় তো কথা পুরুষ্টু হয় না, কথা যদি মনমতো হয় তো মিল খুঁজে পাওয়া দায়। তা হলে কি তাকে চেরাগ আলি ফকিরের মতো ভরসা করতে হবে পাওনা-গানের ওপর? আরে দূর! ফকিরালি গান দিয়ে কি আর মিটিং জমানো যায়? তবে তার সাগরেদি মেনে নিলে হয়তো কেরামতের গলায় গান চলে আসতো আপনাআপনি। না, তাই বা হয় কী করে? তমিজের বাপ তো তার খাস মানুষ। সে যে কী জানে আর না জানে তার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যায় না। এই যে মাঝিদের জুম্মাঘরে আবোর মানুষটা মিনমিন করে যে কী বললো, শরাফত মণ্ডল। তাকে মারধোর করেছে কি-না, কীভাবে অপমান করলো, শরাফতের খড়মের মধ্যে সে লোহার পান্টি দেখে কীভাবে, কিছু বোঝা গেলো? তমিজের বাপের সেইসব মারফতি না আজগুবি বুলি কেরামত নিজের ইচ্ছামতো বাঁকাচোরা করে পেশ করলো বলেই না। মাঝিরা এমন চেতে উঠলো! ঘুমের মধ্যে হোঁচট না খেয়েও হাঁটা ছাড়া চেরাগ আলি আর কোন বিদ্যাটা তাকে দিয়ে গেছে? মাঝিপাড়ার মানুষ কি শুধু এ জন্যেই তমিজের বাপকে এতো মান্যিগন্যি করে? চেরাগ আলি তার ছেঁড়াখোঁড়া বইটা রেখে গেছে। তমিজের বাপের হেফাজতে, তবে কি লোকটা তার সব তেজ পায় ঐ বই থেকে? জয়পুরে তো চেরাগ আলি বারবার বলেছে, লেখাপড়া করার সুযোগ তার কখনো ঘটে নি। এমনি বিনয়ে তার মাথাটা সবসময় নুয়ে থাকলে কী হয়, লেখাপড়া না জানার দাপটে বুড়া অহঙ্কারে টইটুম্বর হয়ে থাকতো, তার মূর্খতা ঘোষণা করতে সে একেবারে পটু, তোমরা বাপু নেকাপড়া জানা মানুষ, নিজেরা গান লেখো, গানের বই ছাপো। হামার তো বাপু সেই মুরাদ আল্লা দেয় নাই। হামার ইগলান পাওনা-গান, দাদা পরদাদার দোয়ায় আর ওস্তাদের দয়ায় বুকের মধ্যে কাঁপে, হামি দোতারাত হাত দিলেই গলা দিয়া বারায়া আসে। ক্যাংকা কর্যা আসে সিটা কবার পারি না বাপু। ফকির কতো কায়দাই জানতো, অনেক লোকের সামনে গান করতে করতে হঠাৎ থেমে একটু দম নিয়ে বলতো, পরের কথাগুলো বানাও তো বাপু। কেরামত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে থাকলে ফকির বলতো, পারবা না। হামিও কি পারি? কেরামত এখন নিশ্চিত তার সব রহস্য গোপন করা আছে ঐ বইয়ের মধ্যে। লেখাপড়া না জানার জন্যে এতো যে দাপট মারতো, তবে ঐ বইটা কি তার বাল হেঁড়ার জন্যে?
