গাড়ি থাকে গোলাবড়ি হাটে। পায়ে হেঁটে হেঁটে ইসমাইল গোটা গিরিরডাঙা ঘোরে আর কাদেরের ওপর তার রাগ বাড়ে। তমিজের গ্রেফতারে মাঝিরা ক্ষুব্ধ, এদের ভোট নিশ্চিত পড়বে মালেক সাহেবের বাকসে। কালাম মাঝির বাড়ির সামনে এসে ইসমাইল হাঁক দেয়, কালাম মিয়া, আপনার বাড়ির বাইরে থেকেই কি আমরা ফিরে যাবো?
কালাম মাঝি বাড়ি থেকে বেরোবার তালে ছিলো, কিন্তু ইসমাইল একবারে বাড়িতে এসে পড়ায় তার আর উপায় থাকে না। বাড়ির একমাত্র হাতলওয়ালা চেয়ারটা খুব ভারি, সেটা দুই হাতে তুলে সে এনে রাখে ইসমাইলের সামনে। তার ইশারায় বুধা একটা পাখা নিয়ে ইসমাইলকে শোঁ শোঁ করে হাওয়া করতে থাকে। ইসমাইল আবদার করে, কালাম মিয়ার বাড়িতে আজ আমাদের দাওয়াৎ। আপনে তো করলেন না, আমরা নিজেরাই জেয়াফত নিলাম।
এতে কাজ হয়। জোহরের আজান দেওয়া একটু স্থগিত রেখে কুদুস মৌলবিকে জবাই করতে হয় বড়ো দুটো খাসি মোরগ। বাড়ির ভেতর থেকে রান্নাবান্নার আয়োজনের আওয়াজ ও খসরু আসে।
আবদুল কাদের এতোক্ষণ সবই মেনে নিয়েছে। মাঝিদের বাড়ি বাড়ি গেলো, তাকে দেখে সবাই ভয়ই পায়, তাতে তার রাগ চড়ে যায় বাবার ওপর। আবার আবিতনের বাপের মতো কেউ কেউ বাঁকাচোরা কথাও শোনায়, তখন সে বাপের পক্ষে নানা অজুহাত তোলে, দোষ চাপায় নায়েবের ওপর। এখানে ভোটের অবস্থা তাদের ভালো নয়। ছোটোলোকগুলি সুযোগ একটা পেয়েছে, এখন তাদের তোয়াজ না করে উপায় কী? তা ভোটের জন্যে সবই না হয় করা গেলো, কিন্তু গিরিরডাঙা গ্রামে এসে তার বাড়ি বাদ দিয়ে ইসমাইল ভাত খাবে মাঝিদের বাড়িতে,-এটা কি হতে পারে? গোলাবাড়ি থেকে রওয়ানা দেওয়ার আগেই কাদের বাড়িতে খবর দিয়েছে, সেখানে খাসি জবাই করা, বড়ো মাছ জোগাড় করা সব কমপ্লিট। এখন তো তার ইজ্জতের বারোটা বাজলো। এর ওপর তাকেও যদি আজ মাঝিবাড়িতে ভাত খেতে হয় তো নিজের বাড়িতে ঢোকার মুখ থাকবে? অসহায় চেহারা করে সে ইসমাইল হোসেনের দিকে তাকায়, ভাই, বাড়িতে যে সংবাদ পাঠালাম। খাওয়া দাওয়া সব রেডি।
রাত্রে খাববা তোমার বাড়িতে। এখানে খেয়ে কালাম মিয়ার সঙ্গে গ্রামটা ঘুরবো। তারপর তোমার বাবাকে নিয়ে যাবো বিলের ওপারে। তোমার বাড়িতে ফিরে রাত্রে খাবো, ওয়ার্কারদের সঙ্গে বুধবারের প্রোগ্রামটা ফাইনাল করবে, সোহরোওয়ার্দি সাহেবের মিটিং করতে হবে এই এরিয়ায় অন্তত তিনটে।
হাল ছেড়ে কাদের মাঝিদের কোলাহল দেখে। তাকে কেউ তেমন আমল দিচ্ছে না, তাকে ডিঙিয়ে কথা বলে ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে। গফুরটা তো আসেই নি, মাঝিপাড়ায় আসাটা তার জন্যে বিপজ্জনকও বটে। কেরামত আলি পর্যন্ত গুজরগাজুর করে, একবার ইসমাইলের সঙ্গে, কখনো তমিজের বাপের পাশে দাঁড়িয়ে। শালা কাকে যে কী শোলোক ফুঁ দিয়ে দিচ্ছে আল্লা মালুম।
এর মধ্যে এই ভর দুপুরবেলা গামলাভরা পায়েস, এলোকেশি পিঠা আর ধামাভরা তেল পিঠা চলে এলে কাদের আর না বলে পারলো না, ভাই, আমি একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। আপনারা নাশতা খেয়ে পরে ভাত খাওয়া সারেন, আমি চারটে খেয়ে আসি।
ইসমাইল বলে, তুমি নাশতা খেয়ে যাও। কেবল নাশতা এলো, খেতে দিতে এদের এখনো ঢের দেরি। তুমি ফিরে এসে আমাদের সঙ্গে খাবে।
না ভাইজান, এই অবেলায় নাশতা আর খাবো না, খিদা নষ্ট হবে। বাড়ি থেকে আমি বরং ভাত খেয়েই আসি।
স্বাস্থ্যরক্ষার শহুরে নিয়ম পালনে কাদেরের উৎকণ্ঠা দেখে বুধা মাঝি চোখ টেপে আফসারের দিকে। আফসার বলে, কাদের ভাই কি আর হামাগোরে বাড়িত খাবি?
বিপদে ফেলে কালাম মাঝি। ইসমাইলকে আপ্যায়ন করার সুযোগ পেয়ে বিগলিত হয়ে সে চেপে ধরে কাদেরের হাত, খায়া যান গো। হামরা আপনাগোরে বাড়িত কতো খাছি। হামার ঘরত খালেই কি আপনের জাত যাবি?
আর জাতঃ আবদুল কাদের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, জাত কি আর আছে গো? বেচারা সইতেও পারে না, কইতেও পারে না। মাঝিরা তো তাদের খেয়েই মানুষ। তাই বলে কি তাকেও মাঝিদের বাড়িতে খেতে হবে? তা পিঠা না হয় একটু চেখে দেখা যায়। তাই বলে ভাত খাবে? ইসমাইলের পাল্লায় পড়ে আজ কি তাকে সমাজ, জাত সব নষ্ট করতে হবে? আবার ইসমাইলের দিকে আড়চোখে তাকিয়েই তাদের ব্যাপারে তার মন্তব্যটি একটু সংশোধন করে, আরে মোসলমানের আবার জাত কী? ইসলাম হলো সাম্যের ধর্ম।
ঠিক তার প্রতি করুণায় নয়, অন্য কোনো বিবেচনায় ইসমাইল তাকে রেহাই দেয়, ঠিক আছে, তুমি বরং বাড়ি গিয়ে খেয়ে এসো, তোমার বাবাকে আমার সালাম দিয়ে বলো, বিকালে, না সন্ধ্যার পর আমাদের সঙ্গে বিলের ওপারে একটু কষ্ট করে যেতে হবে।
আবদুল কাদের যেতেই মাঝিপাড়ার মানুষে ভরে গেলো কালাম মাঝির বাইরের উঠান। ইসমাইল হোসেন বসেছিলো ঘরের ভেতরে, বাইরের বারান্দায় বসে কর্মীরা এলোকেশি পিঠা খায়, তেলপিঠা, মুড়ি দিয়ে পায়েস খায়; মাঝিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। নাশতা সেরে বারান্দায় সেই হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে ইসমাইল হোসেন মাঝিদের সঙ্গে এটা সেটা গল্প করে। মুসলমানদের মধ্যে সে সকল ভেদাভেদ দূর করার আহ্বান জানায়। নায়েববাবুর চক্রান্তেই তমিজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সে নিশ্চিত, কাৎলাহার বিল মাঝিদের হাতছাড়া হয়েছে হিন্দু জমিদারের লোভে এবং চক্রান্তে। ইসমাইল ভোটে জিতলে এই বিলের ইজারা পাবে মাঝিরা, এটা হবে তার এক নম্বর কাজ। পাকিস্তানে তো আর জঘন্য ও বর্বর বর্ণপ্রথা থাকবে না, যার যা হক তাকে। তাই দেওয়া হবে।
