শুনতে শুনতে কেরামত অভিভূত, অভিভূত এমন কি মাঝিপাড়ার ছেলেরাও। কিন্তু শিমুলতলার তালুকদারদের খাদেম মিয়া বারবার কপাল কোঁচকায়, লোকটা ছেলেটাকে থামাতে চেষ্টা করে, চ্যাংড়াপ্যাংড়া কারো কোনো কথা শোনে না। খালি নিজেরাই প্যাচাল পাড়ে।
লীগের অনুপ্রাণিত কর্মী চোখ ছোটো করে হাসে, আপনি মুরুব্বি মানুষ, আপনার লেবাস ইসলামী। কিন্তু আপনি করেন হিন্দুর পায়রাবি। আপনার কথা আর কী শুনবো? হক সাহেব মুসলমানদের সঙ্গে, ইসলামের সঙ্গে মীরজাফরি করে—
বুড়ো তালুকদার তার রামপুরি টুপি খুলে ফের মাথায় চড়িয়ে বলে, তোমরা ইসলামের সোল এজেনসি নিয়েছো? ইসলামের তোমরা বোঝো কী? তোমাদের জিন্না নামাজের নিয়ত বাঁধতে জানে? জিন্না কও আর লিয়াকত আলি কও আর সোহরোওয়ার্দি কও, এরা পশ্চিমদিকে, আল্লার ঘরের দিকে কখনো আছাড় খেয়েও পড়েছে কোনোদিন? আর এরাই আজ ইসলামের জিম্মাদার।
তালুকদারের প্রৌঢ় সঙ্গী সায় দেয়, আরে, চাচা, এরা থাকে বোতল আর গেলাস লিয়া, নামাজ বন্দেগির টাইম কোথায় এদের?
লীগের কর্মীদের চোখমুখ লাল হতে থাকে, কেবল ঐ ছেলেটি একই স্বরে বলে, শোনেন, মোল্লাদের ইসলাম আর কায়েদে আজমের ইসলাম এক নয়। মোল্লারা। ইসলামের নামে মুসলমানদের ব্যাকওয়ার্ড করে রাখতে চায়, তাদের গোঁড়ামির জন্যেই মুসলমানদের আজ এই অবস্থা–।
তা হলে বাপু খালি হিন্দুদের দোষ দাও কেন?
অনেক মওলানাও তো হিন্দুদের পায়রাবিই করে যাচ্ছে। মওলানা আজাদ, শো বয় অফ কংগ্রেস, এইসব মোল্লা মওলানাদের হাত থেকে ইসলামকে, মুসলমানকে বাঁচাতেই আমরা পাকিস্তান চাই।
তার বক্তব্য শেষ করার আগেই পাকিস্তান জিন্দাবাদ কায়েদে আজম জিন্দাবাদ ইসমাইল হোসেনকে ভোট দিন স্লোগানের সঙ্গে বেজে ওঠে মোটরগাড়ির আওয়াজ, ছেলেরা দৌড় দেয় ঐ গাড়ির দিকে। ক্যানভাসের ছাদওয়ালা গাড়ি করেই ভোটের ক্যানভাস চলছে। ঐ জিপগাড়ি থেকে নেমে ইসমাইল হোসেন হাসি হাসি মুখে সবাইকে হাত তুলে সালাম করতে করতে এগিয়ে যায় কাদেরের দোকানের দিকে। দোকানের বাইরে থেকেই সে ডাকে, কাদের, চলো তো একবার মাঝিপাড়ায় চলো।
আবদুল কাদের তাকে দেখে অবাক। ইসমাইলের তো আরো তিনটে দিন থাকার কথা পুবে, যমুনার চরে চরে। এখানে আসার প্রোগ্রাম ভোটের একদিন আগে, সোহরোওয়ার্দি সাহেবও সেদিন আসবে মিটিং করতে। তা হলে যমুনার ওদিকে কি ক্যানভাস তার শেষ হয়ে গেলো?
কাদেরের দোকানে ঢুকে ইসমাইল বলে, তোমরা কি সবসময় এই হাটের মধ্যেই পড়ে থাকো? তোমার গ্রাম গিরিরডাঙার খবর রাখো? শুনি তো, মাঝিপাড়ার পজিশনটা কী? কালাম মাঝিকে ডাকো, তার মুখেই শুনবো।
কাদের আমতা আমতা করে, কালাম মাঝির দোকানে তো দেখতেই পাচ্ছেন মালেক তালুকদারের ভোটের ক্যাম্প। তাকে ডাকলে কি আর আসবে?
আঃ। যা বুলি শোনো। ডাকো, আমার কথা শুনলেই আসবে।
কিন্তু গফুর কলু ফিরে এসে বলে, এক মিনিট আগে সে চলে গেছে। কাদের বোঝে, লোকটা কেটে পড়েছে ইসমাইল হোসেনকে এড়াতেই। ইসমাইল তখন কাদেরের কানের কাছে মুখ নেয়, কাদের, তোমরা এটা করেছো কী? মাঝিদের নামে মামলা করার আর সময় পেলে না? কাদের কিছু বলবে বলবে করলেও ইসমাইল হোসেন তাকে সুযোগ দেয় না, আরে ঐ যে কী নাম?–হা হা, তমিজ। তমিজ কি তমিজের বাপের ভোট না থাকলেও ছয় আনা ট্যাকস দেওয়ার লোক মাঝিপাড়ায় কম নেই। এটা বড়ো কথা নয়। মাঝিপাড়ার ভোট মালেক সাহেবের বাকসে পড়লে তার এফেক্ট পড়বে এই এন্টায়ার এরিয়ার। ওদিকে যমুনার মাঝির তো মহা খাপ্পা, তাদের নাকি ডাকাত বলে থানায় চালান দিয়েছি আমরা মুসলিম লীগের লোকেরা। চর এলাকায় কৃষক প্রজার ওয়ার্কার তো ছিলোই না। এখন তমিজকে ধরে পুলিসে দেওয়ার কথা শুনে মালেক সাহেবের লোকজন ধুমসে প্রোপাগান্ডা করে বেড়াচ্ছে। ঐ নিরীহ লোকগুলোকে তোমরা ডাকাত বানিয়ে ছাড়লে?
মামলাটা ঠিক এভাবে দেওয়ার ইচ্ছা ছিলো না। বাপজানকে নায়েব কী করে কী বোঝালো–।
আরে বাবা, আমি তো সব শুনলাম। চলো, গিরিরডাঙা চলো। মাঝিদের সঙ্গে বসি গিয়ে।
কিন্তু মাঝিপাড়ায় তো মালেক সাহেবের ওয়ার্কাররা এখন ক্যানভাস চালাচ্ছে। এখন গেলে কী –।
কাদেরের কথা শেষ হতে না হতে তাকে সমর্থন করে গফুর কলু, মাঝিগোরে কথা বাদ দেন। বড়ো লটখট্যা জাত। আর সোগলি একদিকে গেলে অরা হেলবি উল্টামুখে। জামাতও তো ভিন্ন।
আলাদা জামাত মানে? ইসমাইল হোসেন গম্ভীর হয়ে জানতে চাইলে জবাব দেয় কাদের, এই কয়েক গাঁয়ের মধ্যে মোহাম্মদি হলো চোদ্দ আনা। আর মাঝিরা সব হানাফি জামাতের মধ্যে। ইউনিয়নের মধ্যে এক গিরিরডাঙার মাঝিপাড়াতেই হানাফি মসজিদ।
ব্যাখ্যা শুনে ইসমাইল হোসেনের রাগ চড়ে যায় কয়েক গুণ, ইস। এই করেই তো মুসলমান গেলো। এখনো তোমরা হানাফি আর মোহাম্মদি নিয়ে বাহাস করো। এসব ভুলে যাও কাদের, ভুলে যাও। ভোটের সময়টা অন্তত এসব কথা মুখেও এনো না। আজ আমি ঐ হানাফি মাঝিদের মসজিদে নামাজ পড়বো। মুসলমানের আবার এসব কী? কায়েদে আজম তো সুন্নি মুসলমানও নন, শিয়াদের মধ্যে তারা আলাদা খোঁজা কমিউনিটির লোক। জেলা স্কুলের হেড মাস্টার বরাক আলি সাহেব আমাদের কী সার্ভিসটাই না দিচ্ছেন। তিনি তো কাদিয়ানি, তাকে কি আমরা বাদ দেবো?
শুনে কাদেরের ভয় আরো বাড়ে। কায়েদে আজম সম্বন্ধে এসব কথা গাঁয়ের মানুষ জানলে তো মুশকিল। ইসমাইল হোসেনের কাণ্ডজ্ঞান মাঝে মাঝে লোপ পায়, কোথায় যে কী বলে বসে ঠিক নাই। নিজে তো নামাজ পড়েই না, মৌলবি মুনসি নিয়ে সুযোগ পেলেই ঠাট্টা ইয়ার্কি করে। বাড়িতে তার সবার মেলামেশা হিন্দু ভদ্রলোকদের সঙ্গে। পাকিস্তান হলে কাদেরও হয়তো বামুনকায়েতের সঙ্গে সমানে সমানে মেশার সুযোগ পাবে। তা হিন্দুদের সঙ্গে ওঠাবসা করা আর খাতির রাখা এক কথা আর মাঝিদের জামাতে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ইসমাইল হোসেন নামাজই পড়ে না, আর আজ মাঝিদের মসজিদে নামাজ পড়তে পাগলা হয়ে উঠেছে।
