হাটবার নয়, খড়ের ছোটো ছোটো চালে ঢাকা মাটির একটু-উঁচু জায়গাগুলো শূন্য পড়ে আছে। তবে মুকুন্দ সাহা আর কালাম মাঝির দোকান খোলা। আর কাদেরের দোকান তো এখন আর দোকান নয়, পুরোপুরি ভোটের অফিস। টিনের বেড়ায় পোস্টার আড়াআড়িভাবে, বড়ো কড়ড়া করে লেখা ইসমাইল হোসেনের নাম। দোকানের দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্র কর্মী, তারা চোঙা, পোস্টার, বিড়ি গুছিয়ে নিচ্ছে, কাদের কথা বলছে তাদের সঙ্গে। কেরামতকে দেখে সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এগিয়ে। আসে। তাকে একটু তফাতে নিয়ে বলে, তোমাক না কয়টা দিন বাড়ি থাকা বারাবার মানা করিছি। তার চাপা উত্তেজনায় উদ্বেগ বা সুখ সনাক্ত করা কঠিন, বিল ডাকাতির মামলায় তো নায়েব তোমার নামও ঢুকায়া দিছে। বাপজান যে কী করে না করে কিছু বুঝি না। ইসমাইল ভাইকে দিয়া পুলিসকে করা তোমার নাম কাটাবার ব্যবস্থা করা। হচ্ছে। তা তুমি এখন কয়টা দিন শ্বশুরবাড়িতই থাকো না! কেরামত চুপ করে থাকলে কাদের ফের বলে, তোমার মনে হয় জেলের ভাত খাবার সখ আছে, না?
জেলে যাবার সখ কেরামতের এখন হয় বৈ কী? জয়পুর থেকে তখন সরে না পড়লে সে হয়তো ধরা পড়তো। পুলিস ধরে নিয়ে গিয়ে ভদ্দরলোক নেতাদের পর্যন্ত যে মারটা দিয়েছে, মেয়েদের পর্যন্ত রেয়াত দেয় নি। সেই মারের খবরেই তো কেরামত নুয়ে। পড়লো। বুকে আর বল পায় না। বুকে বল না থাকলে তার মাথাও ঘোরে বনবন করে। মাথা ঘুরলে তার হাতে শোলোক আর আসে না। এ কি চেরাগ আলির গান যে টুংটাং করলো আর দোতারার তার বেয়ে কথা চলে এলো আসমান থেকে? না, না। জেলে গেলে তার পদ্য লেখা বন্ধ হয়ে যাবে চিরকালের জন্যে।
আসিছো যখন একটু বসেই যাও। কী ভেবে কাদের তাকে নিয়ে ঘরে ঢোকে, এরা সব লীগের ওয়ার্কার। কেরামতকে আস্তে করে জিগ্যেস করে, পাকিস্তানের গান লেখা হছে?
একটি ছেলে বলে, মাঝিপাড়ায় তো আমরা ঢুকতেই পাচ্ছি না। তাদের নামে আপনারা বিল ডাকাতির কেস দিয়ে রেখেছেন,–
এই তো মুশকিল। আবদুল কাদের বক্তার ভঙ্গিতে কথা বলার সময় ভাষাটা ঠিক করে নেয়, বিল তো আমাদের পত্তন নেওয়া। সেখানে আমার বাবার অনুমতি ছাড়া কেউ মাছ ধরতে গেলে বাবা তো বাধা দেবেনই। কিন্তু মাঝিদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বহুদিনের, তাদের মেলা লোক আমাদের জমিতে বর্গা খাটে। তাদের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করার কথা ভাবতেই পারি না। মামলা করালো নায়েব, বাবাকে ধরে, ভয় দেখিয়ে মামলা ঠুকে দিয়েছে। আরে, বাবা, এ তো ওদের পুরনো ফন্দি, মুসলমানে মুসলমানে ভেদ সৃষ্টি করেই তো ওরা দাপটটা টিকিয়ে রাখে। সে এবার হাজির করে কেরামতের দৃষ্টান্ত, এই যে কেরামত, কবি কেরামত আলি, মাঝি না হলেও মাঝিপাড়ার মানুষ একে খুব মানে। সেদিন বিল ডাকাতির সময়- বলতে বলতে কাদের থামে, একটু টোক গিলে বলে, এ তো আছে আমাদেরই শেলটারে। গুণী মানুষ, গান লেখে, গরিবের ঘরের মুসলমান ছেলে, ইসমাইল ভাই বলেন, একে যে করে হোক বাঁচাতেই হবে। তারপর সে তাকে তুলে দেয় তাদের হাতে, তোমরা না হয় একে নিয়ে যাও কালাম মিয়ার কাছে। আরে যাও না একবার!
কেরামত অবশ্য থাকে সবার পেছনে। কালাম মাঝি লীগের কর্মীদের সঙ্গে ভালো করে কথাও বলে না। তার দোকানে কৃষক প্রজা পার্টির ভোটের অফিস। টিনের বেড়ায় ঐ দলের পোস্টার। লোকজন তেমন না থাকলেও যারা আছে বেশিরভাগই পাকা চুলওয়ালা, প্রায় সবারই দাড়িও পাকা, মাথায় টুপি। দুজন কি তিনজন যুবকের হাতে চোঙা। আর আর ছেলেছোকরা যে কয়েকজন আছে সবই গিরিরডাঙার মাঝিপাড়ার।।
টাউন থেকে আসা লীগের এক তরুণ কর্মী বলে, আসসালামোআলায়কুম। মুসলিম লীগের খাদেম হিসাবে আমরা আপনাদের কাছে এসেছি। ইনডিয়ার মুসলমানদের দল বলেন, জামাত বলেন এখন একটাই, অল ইনডিয়া মুসলিম লীগ। এই যে ভোট আসছে, এই ভোট হলো মুসলমানদের–
মুসলমান তো হামরাও বাপু। কালাম মাঝি তাকে থামিয়ে বলে, তা হামরা হলাম মাঝি আর আপনেরা সব ভদ্দনোক। হামাগোরে ছোলপোলেক ধর্যা আপনেরা পুলিসের হাতে দেন, হামাগোরে ডাকাত ধানান।
তরুণ কর্মী মামলার ব্যাপারটি এড়িয়ে যায়, গোটা ইনডিয়ার মুসলমান আজ কায়েদে আজমের লিডারশিপে এক হয়ে গেছে। এখন আপনারা যদি মাঝি আর চাষী, ভদ্দরলোক আর গরিবের ফারাক করেন তো ফায়দা লুটবে কারা? ওদিকে তেভাগা। মুভমেন্টের চাষীরা পর্যন্ত সংঘর্ষের রাস্তা ছেড়ে আজ লীগের পতাকার নিচে জমায়েত। হয়েছে, আর–
কেরামত একটু ধন্দে পড়ে। ওদিককার খবর সে অনেকদিন পায় না। কিন্তু চাষীরা কি ইচ্ছা করলেই সংঘর্ষ এড়াতে পারে? তাদের ওপর যে জুলুমটা চলছিলো, তাতে তাদের সরে পড়ার কোনো পথই আর খোলা নাই। তা হলে?—কিন্তু ছেলেটি বেশ জোর দিয়েই বলে, নবাব নাইটদের মুসলিম লীগ আর নেই। চাষী আর জেলে আর মজুরের হক আদায় হবে পাকিস্তানে। কেরামত ভাবে, তা হলে আর খুনাখুনি করার দরকার কী?
ছেলেটি এরপর বলে চাকরির কথা। পাকিস্তানে মুসলমানের চাকরির কোনো অসুবিধাই হবে না। কেবল মুসলমান হওয়ার অপরাধে সরকারি চাকরি থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হবে না। তারপর হিন্দু শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা মুসলমানদের ধর্ম নিয়ে, তাদের তাহজির তমদুন নিয়ে ব্যঙ্গ করে, বিদ্রুপ করে, তাদের বইপুস্তকে মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তাদের সঙ্গে আমরা থাকতে পারি না। পাকিস্তানে শাসন চলবে কোরান আর সুন্না অনুসারে, শাসকদের জীবনযাপন হবে ইসলামের খলিফাদের মতো। তারা টুপি সেলাই করে আর কোরান নকল করে যা রোজগার করবে, তাতেই তাদের খাওয়াদাওয়া চালাতে হবে।
