নবিতনের ডাকে কেউ আসে না। তার ছোটোবোন গোয়ালঘরের পেছনে মাচা থেকে লাউশাক ছিড়ছে আর মা ব্যস্ত ঐ মেয়েকে নির্দেশ দেওয়ার কাজে। আর হুরমতুল্লা তো জমিতে চলে গেছে ভোর না হতেই।
বেটাকে বুকে চেপে ধরে ফুলজান কাঁদে আর বলে, ইস! বেটার জন্যে সোয়াগ উথলাচ্ছে? দুনিয়া চষ্যা বেড়াও, ব্যারামি বেটাটার কথা কুনোদিন মনে করিছো? এক দানা ওষুধ লিয়া আসিছো? এক ঢোক পানিপড়া দিছো? হামার বেটাক ডাক্তোরের কাছে লিয়া যাবার চাইছিলো মাঝি, তাক তুমি ফুসল্যা ফুসল্যা তুল্যা দিলা পুলিসের হাতে। তাই এখন জৈন্তু খাটে আর তুমি এটি ঠ্যাঙের উপরে ঠ্যাঙ তুল্যা তিন সন্ধ্যা সানকি সানকি ভাত গেলো। তোমার শরম করে না? এংকা মরদের মুখোত আগুন।
লাল পাগড়িওয়ালা এসে তমিজকে ধরে নিয়ে যাবার পর থেকে মাঝির বেটা বিলের এপার ওপার জুড়ে মানুষের কাছে একটা বাপের বেটা হয়ে যাওয়ায় কেরামতের বুকে যে কাঁটা বিঁধেছে, ফুলজানের কথায় তাই এখন খোঁচাতে থাকে তার সর্বাঙ্গে। তবে ফুলজানকে ঘায়েল করার সুযোগও একটা সে পায়, আরে ঐ মাঝিই তো তোর লাঙ রে মাগী। মাঝির গায়ের আঁশটা গন্ধ না পালে তোর ঘ্যাগখান খালি চুলকায়। মাঝির জামাতে নামাজ পড়লে হামার বলে জাত যায়, আর মাঝির চ্যাটটা ঘ্যাগর মধ্যে সান্দায়া লিয়া নিন্দ পাড়লে দোষ হয় না, না? জাউরা মাগী, হামি খবর রাখি না, না?
হঠাৎ চুপসে যেতে যেতে ফুলজানের ঘ্যাগটা ফের ফুলে ওঠে, এতোটাই ফোলে যে, সেটা ঠেকে তার বেটার বেঢপ মাথার সঙ্গে। বেটার জরের তাপে তার ঘ্যাগ একটু একটু কাঁপে; প্রশান্ত কম্পাউনডারের কাছে ছছালটাক বুঝি আর লেওয়া হলো না। নবিতন এসেবেটাকে তার কোল থেকে জোর করে নিয়ে গেলে ফুলজানের কান্নার বেগ দ্বিগুণ হয়। না বুঝেও কিংবা না বুঝেই তমিজের জন্যে কষ্ট প্রকাশের সুযোগটির সে চমক্কার সদ্ব্যবহার করে। উঠানে ফুলজানের মা ও দুই বোনের নীরবতা, ফুলজানের হাউমাউ কান্না ও তার বেটার হাঁপানো ফোঁপানিতে তাকে নিয়ে চক্রান্তের আয়োজন দেখতে না পেয়ে কেরামত হাঁসফাস করে। এই ঢঙের ব্যারাম তো তার আগে কখনো ছিলো না। তেভাগার চাষাদের মধ্যে গান করে বেড়াবার সময় কি চাঙাটই না ছিলো। সেখান থেকে খামাখা চলে এলো। তা এখানে এসেও তো সে ভালোই ছিলো। মাঝিদের নিয়ে মেতে উঠলো, তখনো তো এমন গা ম্যাজম্যাজ ছিলো না তার। মুশকিল হলো এই শ্বশুরবাড়িতে আসার পর থেকে। হুরমতুল্লার কারুবারু আর কাদেরের দয়ায় শরাফত তাকে পুলিসের হাত থেকে না বাঁচালেই পারতো। মাঝিদের বীরত্ব নিয়ে একটা পদ্য তার মাথায় আসি আসি করছিলো, অনেকটা এসেও গিয়েছিলো। কিন্তু ফুলজানের মুখে মাঝির বেটার বেয়াড়াপনা আর বেয়াদবির কথা শুনতে শুনতে পদ্যটার কুঁড়ি বার হতে হতে ছিড়ে গেলো। এই বাড়িতে তার থাকার দরকারটা কী?
ও ফকির। পেছন থেকে বৈকুণ্ঠ কেরামতকে ডেকেই আবার নিজের ভুল সংশোধন করে, আরে দূর! আবার ফকির কলাম! তা তোমার খবরবার্তা নাই। আলিম মাস্টার উদিনকা কলো, তুমি বলে তমিজেক লিয়া গান বান্দিচ্ছো? বান্দা হছে?
গান বাঁধার তো বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এরাই, এদের মুখে তমিজ ছাড়া আর কথা নাই। আরো কিছুক্ষণ হাঁটলে সঙ্গে জোটে যুধিষ্ঠির। সে শালাও কম নয়, সে-ও এক খবর ছাড়ে। কী?-না, কামারপাড়ার মানুষ শরাফত মণ্ডলের ওপর মহা খেপে আছে। তমিজের মতো মানুষকে জেল খাটায়, তার ভালো হতে পারে না। শরাফতের। জমি বর্গা করে তমিজ তো ঠকলোই, মণ্ডল যুধিষ্ঠিরকেও ফসল দিলো কতো কম। পশ্চিমে চাষারা ফসল চায় তিন ভাগের দুই ভাগ, এখানে মণ্ডল অর্ধেক ফসলও দিলো না। এ-বাহানা সে-সাহানা করে কতো ধানই যে বুড়া রেখে দিলো। খিয়ারের মতো এদিকে সবাই একত্তর হলে সে কি এসব করতে পারে?
কেরামত কপাল কোঁচকায়, ওদিককার কথা আলাদা। ওদিকে চাষারা একজোট হয়া কোমর বান্দে। তাদের সাথে শিক্ষিত মানুষ আছে। আর তোমাগোরে এটি মাঝিরা যায় মাছ চুরি করবার। চুরি করলে পুলিস ধরবি না তো কি সোয়াগ করবি?
কেরামতের এই কথায় তো এদের থ মেরে যাবার কথা। কিন্তু সে যে এমন। ভাবতেও পারে তাই এদের মাথায় ঢোকে না বলেই হোক কিংবা বৈকুণ্ঠের কথার তোড়ে হোক, ঐ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হয় না। বৈকুণ্ঠ বলে, তমিজের বাপ ফকির মানুষ। তার। হিরদয়ে আঘাত দিলো। চেরাগ আলি ফকির থাকলে তার একোটা শোলোকে মণ্ডলের গুষ্টির হাগা আরম্ভ হলোনি। ফকিরের গানের ক্ষমতা আছিলো গো। এখনো নাই তা কবার পারি না। তার গানের তেজ এখনো সমান।
গানের ফল আবার হাতে হাতে পাওয়া মানে কী? কেরামত বলে, তোমরা চেরাগ আলির কথা কও। ভালো, মানুষটা ভালো মানুষ আছিলো, কও। কিন্তু তার শোলোকের মধ্যে তোমরা মাঝির কথা সান্দায়া দিবার পারো? খিয়ারের চাষার কথা ফকির পাবি কুটি? তার গান তো লিজৈর বান্দা লয়, না-কি?
কেরামত হনহন করে হেঁটে চলে যায় ওদের পিছে রেখে। চেরাগ আলির পাওনা-গানের কথা শুনতে শুনতে সে অতিষ্ঠ। আরে, জোতদারের পক্ষে পুলিসের হামলা হলে চাষারা কি আর চেরাগ আলির ঐসব আসমানি শোলোকে কান দিয়েছে কখনন? পুলিসের গুলি খেয়েও বর্মণী মা তো পাগল হয়ে উঠিছিলো কেরামতের গান শুনতেই। চাষাভুষা থেকে শুরু করে নাসির মণ্ডল বলো আর চিত্তবাবু বলো আর পূর্ণ বোস আর সুনীলদা—সবাই শুনতে কেরামতের গান। এমন কি এতো বড়ো মানুষ হাজি দানেশ তিনি পর্যন্ত চিত্তবাবুকে নাকি বলেছেন, ঐ কেরামত ছোঁড়াটাকে হাতছাড়া করো না, ওকে আমাদের চাই। পুলিসের ধরপাকড় শুরু হলে চিত্তবাবু খবর পাঠালো, কেরামত যেন এখন সরে সরে থাকে। পুবের দিকে গিয়ে এসব গান করুক; সেখানে কাজে লাগবে। তা এই এলাকার মানুষ তো সব মজনু না মুনসি না কি কোনো জিনই হবে আর ভবানী সন্ন্যাসী–কি তার ভূত—তাদের গান নিয়েই মত্ত। চেরাগ আলি ফকির কী সব গায়েবি শোলোক পেয়েছে কোথেকে,—সেসব ছাড়া আর কিছু এদের মাথায় ঢোকে না।-কেরামত আলি এদের কী গান শোনাবে?
