কুদ্দুস মৌলবি ভয়ে ভয়ে তাগাদা দেয়, লাশ লিয়া চলো। লাশ ওঠাও।
স্ত্রীর পক্ষ থেকে গফুর কলু আফাজের মৃত্যুর একটা বিহিত করতে চায়, তমিজের বাপ, তমিজ, বুধা, আবিতনের বাপ, কালাম মাঝি লোগলির নামেই থানায় ডাইরি করা লাগে। মাঝিপাড়ার ব্যামাক মানুষই আসামী হবি।
থানার ব্যাপারটা আবদুল কাদের এখন স্থগিত রাখতে চায়।মাঝিপাড়ায় ভোট একেবারে কম নয়। গফুর এখন লাশ লিয়া তোর বাড়িত যা। তোর বৌ তার বেটাক একটা নজর দেখবি না?
কিন্তু কলুর ঘরে আফাজের লাশ নিয়ে গেলে মাঝিরা ফ্যাসাদ বাধাতে পারে। শরাফত মণ্ডল তাই হুকুম দেয়, না লাশ আবিতনের বাপই লিয়া যাক। এতোক্ষণে সে শোক প্রকাশ করে মৃত বালকটির জন্যে, আহা! ছোঁড়াটা সবসময় চোখের সামনে সামনে থাকতো। কাল সকালে আর তাকে গোরুর পেট তোলার জন্যে বকাঝকা করা যাবে না। চাঁদরের খুঁটে শরাফত চোখের কোণ মোছে, নোনতা গলায় সে আক্ষেপ করে, মাসুম বাচ্চাটার উপরে দিয়া তোরা আল্লার কাছে গুনাগারি দিলু। তোদের গুনার তো আর শ্যাষ নাই। আল্লার গজব পড়লো তো সাথে সাথেই, দেখলুই তো। আল্লার বিচার আল্লা করিছে, এখন হবি হাকিমের বিচার।
আবদুল কাদের কেরামতকে আড়ালে নিয়ে গেলো, তোমার নামে পুলিসের ওয়ারেন্ট আছে না? সবই তো জানি। পাকিস্তান নিয়া গান লিখতে বললাম, লেখলা না। এখন জেলের ভাত খাও। কেরামত তবু গম্ভীর হয়ে থাকলে কাদের আরেকটু নরম হয়, কাল একবার আসো। দেখি, ইসমাইল ভাই কী কয়।
জলকাদামাখা আফাজের লাশ নিয়ে মাঝিরা রওয়ানা হলে কুদ্স মৌলবির মুখে কলেমা শাহাদতের ক্রমাগত আবৃত্তি অপঘাতে মৃত্যুটি ছাড়া চারপাশের সব কিছুকে মুছে ফেলে।
বিলের পানি ওদিকে থিতু হয়, এই সুযোেগে কুয়াশা নিবিড় আলিঙ্গনে শুয়ে পড়ে বিলের ওপর। পাকুড়তলার ওপাশে ঝোপঝাড় থেকে মুনসির পোষা শেয়ালের পাল মুনসির পক্ষ থেকে, বিলের পক্ষ থেকে এবং নিজেদের পক্ষ থেকেও হুক্কা হুয়া ডাক। ছেড়ে মাঝিদের বিদায় জানালে এই আওয়াজ ধাক্কা মারে তাদের পাছায় পাছায়। এতোক্ষণে তাদের ভারী শীত করে। তাদের ঘাড়ের জাল ভিজে, পরনের ভবন ভিজে, গায়ের পিরান ভিজে এবং খাটিয়ার লাশও ভিজে জবজবে। শবযাত্রা এগোয়, শেয়ালদের বিদায় ধ্বনির আঁটো বাঁধনও ঢিলে হতে থাকে। বিলের সঙ্গে মিলনে,-ধর্ষণেই বলা যায়, নিয়োজিত কুয়াশায় ভিজে, মাঝিদের গায়ের হিমে জমে ও তাদের চোখের পানিতে গলে গিয়ে শেয়ালের ডাক গড়িয়ে পড়ে একটানা বিলাপে। এতে মেঘের মতো ঘুম নামে তমিজের বাপের চোখ জুড়ে। মাঝিপাড়ার কুপির কালচে লাল আলোগুলো ঝাপসা হয়ে একাকার হয়ে যায় কোনো কোনো রান্নাঘর কি উঠানের বিচালির ধোঁয়ার আড়ালে। শেয়ালের টানা ডাক কিন্তু হারিয়ে যায় না, বরং মিশে যায় আবির্তনের মায়ের ঘর থেকে আসা বিলাপের ভেতর। একটানা আওয়াজ ও একাকার আলোতে তমিজের বাপের ঘুম গাঢ় হয়। ঘুমের মধ্যে সে হাঁটে কখনো লাশের পেছনে, কখনো সামনে। তার টলোমলো পায়ের দিকে কারো কোনো খেয়াল নাই। কাৎলাহারের জীবদের খাদে-নামা বিদায় ধ্বনি হঠাৎ ফেটে পড়ে আবিতনের মায়ের হামলানো কান্নায়। এতেও তমিজের বাপের ঘুমে চিড় ধরে না। বরং ডাঙায় লাফিয়ে-পড়া মাছ ধরতে না গিয়েও সে ড়ুবে যেতে থাকে চোরাবালির ভেতর। তবে তার পা নিচে না ঢুকে পড়তে থাকে। সামনের দিকে। তমিজের বাপের কদমে কোনো প্রশ্ন নাই, নালিশ নাই। তার নীরব পদধ্বনিতে বাজে অস্পষ্ট অভিমান : তাদের ডেকে নিয়ে, উস্কানি দিয়ে নিজের কাছে টেনে মাঝিদের দুধের বাচ্চাটিকে মুনসি কেড়ে নিলো কোন বিবেচনায়? কোন আক্কেলে? কী পাষাণ হিয়া গো মুনসির!-অভিমানে চোখে তার পানি জমে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, চোখ ভরে যায় নোনা পানিতে। কিন্তু চোখ দুটোই বন্ধ থাকায় পানি নিচে গড়ায় না। চোখের বন্ধ পাতার তাপে সেই নোনতা পানি ঘন হতে থাকে পাতলা শ্লেষ্ময়। এই শ্লেষ্মই জমে জমে সকালবেলা ফুটে উঠবে পিঁচুটি হয়ে।
৩০. লাল পাগড়িওয়ালারা
ক্যা গো, লাল পাগড়িওয়ালারা তোমাক তো ধরলো না? মাঝিপাড়ার জুম্মাঘরত তুমি কি শোলোক না শাস্তর কছো আর ডাইঙার পয়দাগুলা জাল লিয়া দৌড় মারলো কালাহার মুখে। মাঝিপাড়ার জুম্মাঘরেত তুমি নামাজও পড়িছো, ছি! ছিক্কা! গিরিরডাঙায় মাঝিদের জামাতে জুম্মার নামাজ পড়ে কেরামত আলি তার শ্বশুরের তো বটেই, শ্বশুরের বেটিরও ইজ্জতে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। একদিকে এই বেইজ্জতি এবং একই সঙ্গে কেরামত আলির উস্কানিতেই মাঝিরা ঝাপিয়ে পড়েছে কাৎলাহার বিল দখলে,-স্বামীর এই অপরাধে ফুলজান বড়ই বিচলিত। কেরামত আলির কথায় মেতে উঠে তমিজ এখন জেলের ভাত খাচ্ছে বলে স্বামীর দিকে আড় চোখে হলেও সে তাকায় কটমট করে, আবার মাঝিদের জামাতে নামাজ পড়েছে বলেও তার দিকে যে দৃষ্টি সে বর্ষণ করে সে দুটোর মধ্যে ফারাক করা কঠিন।
ফুলজানের বেটা ঘরের ভেতর বিছানায় হঠাৎ করে কেঁদে ওঠায় ফুলজানের দমবন্ধ-করা কটমটে ভাবটা গলে এবং সেটাকে আরো তরল করতে ছেলেকে কোলে নিয়ে তার দুই গালে দুটো চড় মারে ঠাস ঠাস করে। রোগে রোগে কাবু শিশুটি চেঁচিয়ে কাঁদতে গিয়ে হাঁপায়, কান্না তার হঠাৎ খাদে নেমে গেলে হেঁচকি তুলতে শুরু করে।
মারিস কিসক? হামার বেটাক তুই মারিস কোন সাহসে রে মাগী, কয়েকদিনের নিশ্চলতার অবসান ঘটিয়ে কেরামত আলি তার বৌয়ের চুল ধরে টান দেয় এবং তার পিঠে দুটো কিল লাগিয়ে দেয় দুমদাম করে। মায়ের কোলে দোলা লাগায় ছেলেটা ফের কাঁদার শক্তি পায় এবং ওদিকে নবিতন চেঁচিয়ে ওঠে রান্নাঘর থেকে ও মা, বুবুক মারিচ্ছে গো! ও মা!
