তমিজের বাপ তাকায় বিলের উত্তর সিথানে। মুনসিই না শোলোক দিয়ে, শোলোকের ভোলা প্রতিধ্বনি দিয়ে সবাইকে লাগিয়ে দিলো বিলের দখল নিতে, আবার সে-ই কিনা এখন এসেছে তাদের শাস্তি দিতে।-মুনসির এ কী ব্যবহার?—এই সময় কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ তার গতর থেকে ঘোলা আলো চেঁছে ফেলে মোটা সাদা রেখায় ফোকাস ফেলে মাঝিদের ওপর। সেই আলোয় ভর করে দক্ষিণ থেকে আসে উত্তরের প্রতিধ্বনি, জাউরারা সব তোরা মাছ ধরবার আসিস কার হুকুমে রে? তমিজের বাপ তার মাথাটা দোলায় একবার বিলের দিকে, একবার ডাঙার দিকে। মাথায় তার কামকাতর কুমারীর শিহরণ : মুনসির মাছের নকশা আঁকা লোহার পান্টির ঘা খাওয়ার লোভে ও ঘা খাওয়ার ভয়ে তার গোটা শরীর থরথর করে কাঁপে।
তিন ব্যাটারির টর্চের আলো প্রথমেই সরাসরি পড়ে তমিজের মুখে এবং আবদুল কাদের যতোটা পারে অবাক হয়ে বলে, তমিজ? তমিজ, তুই?
শালা নিমকহারাম, জাউরা শালা নিমকহারামের একশেষ। ওর নিমকহারাম বাপটাকও তো দেখিচ্ছি। ঐ বুড়া না ফকিন্তি ধরিছিলো? কিসের ফকিরান্তি! শালা জাউরাটা মাছ চুরি করিচ্ছে অনেক দিন থ্যাকা। বুধে বুধে সাত, বিদ আর শুক্কুরবার, নয়দিনও হয় নাই, শুওরের বাচ্চা একটা বাঘাড় চুরি করবার যায় ধরা পড়লো। আবার আজ আসিছে ব্যামাক মাঝিগোরে লিয়া। শরাফত মণ্ডল তমিজের বাপকে ছেড়ে এবার ধরে তমিজকে, কুত্তার বাচ্চা, এই জন্যে তোক জমি বর্গা দিছিলাম? জমির ধান তো চুরি করলুই, প্যাট তোর তাও ভরে না, না? এখন হামার জমির ধানের ভাত খাবার সখ হছে হামার বিলের মাছ দিয়া?
আবদুল আজিজ এসে পড়ে এবং আফাজের মৃত্যুই তার প্রধান মনোযোগ পায়। যারা মসজিদে গিয়েছিলো খাটিয়া আনতে, পথে আজিজকে তারা সব জানিয়েছে। আজিজ এসে নতুন করে সব জেনে নেয় এবং গম্ভীর হয়ে রায় দেয়, মার্ডার কেস।
স্ত্রীর প্রথম স্বামীর ছেলের ওপর গফুর কলু কখনোই সন্তুষ্ট নয়, এখন শ্বশুরকে সামনে দেখে সেই ছেলের জন্যে তার ভালোবাসা উথলে ওঠে, এই ছোলটাকে তোমরা কতো কষ্ট দিলা, মায়ের সাথে বেটাক দেখাও করবার দাও নাই। এখন বেটির ওপরে কোদ্দ করা তার বেটাক তোমরা চুবায়া মারো দলদার বালুর মধ্যে। তোমরা কী মানুষের পয়দা গো? এখন ফাঁসিত উঠ্যা বোঝো, বিশ্বাস বন্ধ হয়া মরা কতো সুখের!
বিল চুরির ব্যাপারটা গৌণ হয়ে যাচ্ছে দেখে শরাফত বিরক্ত হয়। এবার সে হুকুম করে তার সঙ্গের লোকদের, হুরমতুল্লা, কালুর বাপ, গফুর, তোমরা ইগলানেক বান্দো। কাল বেনবেলাত থানাত চালান দেওয়া হবি।
থানার কথায় মাঝিরা কিন্তু তেমন ভয় পায় না, কালাম মাঝির ছেলেই তো পুলিসের লোক। থানা তাদের কী বাল ছিড়বে? সবাই এদিক ওদিক তাকায়, কিন্তু কালাম মাঝি কোথাও নাই। কে যেন বুধাকে জিগ্যেস করে, ক্যা রে তোর মামুক দেখিচ্ছি না।
মামু তো আসে নাই। আফসারের সাথে কুটি ব্যান গেলো। বুধার জবাবে কেউ কেউ আশ্বস্ত হয়, কালাম ওর ছেলেকে টেলিগ্রাম করতে গেছে, ভোরবেলার আগেই তহসেন চলে আসবে পুলিস ফোর্স নিয়ে। কিন্তু কুস মৌলবি জানায়, কালাম মিয়া তার ভাইসতাক লিয়া গেছে সাবগ্রাম। আজ সাবগ্রামের হাট লয়? তখন সবার মনে পড়ে, জুম্মাঘর থেকে বেরিয়ে কালাম মাঝি কি তার ভাস্তে ওদের সঙ্গে আর আসে নি।
তমিজ কোনোদিকে না তাকিয়ে বলে, অতো সাটাসাটি কিসক? কালাহারের বিল তো মাঝিগোরে বিল। মাঝিরা মাছ ধরবি না?
মণ্ডল এতোটাই রেগে যায় যে, তার হুকুম বেরোয় বাঁকাচোরা হয়ে, হুরমতুল্লা। কী কলাম? বান্দো, শালাক বন্দো।
শরাফতের আদেশ পালন করতে এগিয়ে হুরমতুল্লা কাঁপে, এতোটাই কাঁপে যে নিজের পা দুটোকে মাটির ওপর ঠেকিয়ে রাখাটাই তার মুশকিল হয়ে পড়ে। তার অবস্থা দেখে হামিদ সাকিদার কোনো দড়ি ছাড়াই ধরতে আসে তমিজকে। আবদুল কাদের বাধা দেয়, থাক, তারপর গলা নামিয়ে তমিজকে বলে, তুই এটা করলি কী? মাঝিপাড়ার কেননা নালিশ ধাকলে গোলাবাড়ি লীগ অফিসে কলেই তো একটা মিটমাট হবার পারে। তুই এখন বিল ডাকাতির আসামী, আবার খুনের মোকর্দমাও হবি তোর নামে। ভোটের আগে কি ঝামেলা শুরু করলি?
এসব যাত্রার ডায়ালগ শুনে শরাফত ধৈর্য হারায়, প্যাচাল পাড়ো না কাদের। মাঝির বাচ্চা মরিছে মাঝির দোষে। পাপ বাপোকও ছাড়ে না। এখন সোয়াগের কথা থোও তো। হামার বিলের মাছ ডাকাতি করিছে, কী করা লাগে না লাগে হামিই বুঝমু।
এখন সব কয়টা বান্দো, কাল থানাত চালান দেওয়া হবি।
কাদের তমিজের সঙ্গে নিচু স্বরে কথা বলা অব্যাহত রাখলে আজিজও বিরক্ত হয়। গতকাল গোরুর গাড়ি করে ইট নিয়ে আসার সময় মাঝিদের এসব শয়তানি সে আঁচ করেছিলো। আজ ছেলের কবর বাঁধানো নিয়ে ব্যস্ত ছিলো মিস্ত্রি খাটাতে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করালো বলে হুঁটসিমেন্ট বেঁচে গেছে মেলা। সেগুলো সিজিলমিছিল করে আসতে তার একটু দেরি হলো। সরকারি চাকরি করে, আঁটঘাট না বেঁধে, আইনকানুন হিসাব না করে সহজে মুখ খোলার বান্দা সে নয়। এখন সরেজমিন দেখে সিদ্ধান্তে আসে, শয়তানের গোড়া এই শালা তমিজ। এর নামে কয়েকটা কেস দেওয়া যায়। এক খুনের দায়েই তো ফাঁসিতে ঝুলবে। যাক, আইন হাতে নেওয়ার দরকার নাই। আপাতত তমিজ শালা যেন পালাবার না পারে।
কেরামত আলিকে দেখে আবদুল কাদের নতুন করে অবাক হয়, তুমি তো আচ্ছা নিমকহারাম গো! সেদিন অতো বড়ো মিটিঙে অভোলা নেতার সামনে তোমার গান করার সুযোগ করে দিলাম। এখন তুমি মাঝিদের উস্কানি দিয়ে বেড়াও! কাজিয়া ফ্যাসাদ বাধীননা কী তোমার পেশা নাকি?
