মাঝিদের সঙ্গে পুরনো কুটুম্বিতার সুত্রে তো বটেই, কেরামতের গানের টানে, এমন কি তমিজের বাপের কান দিয়ে মুনসির শোলোকের আঁচেও হতে পারে, ছোটো রুই, মেজো শোল, সেজো মাগুর পানিতে লাফায় এবং পানি থেকে জাল থেকে ডাঙায় লাফিয়ে লাফিয়ে একই সঙ্গে লুকোচুরি ও গোল্লাছুট খেলায় মেতে ওঠে। মাছের বাচ্চারা ডাঙায় পড়তেই মাঝিদের বাচ্চারা ছুটতে থাকে তাদের পেছনে। এইসব দেখতে দেখতে তমিজের বাপ শোনে মুনসির শোলোক,
মাদারি নামিল জঙ্গে হস্তে তলোয়ার।
কোম্পানি সিপাহি মরে কাতারে কাতার।।
গোরা টেলর হস্তে ধরে কামান বন্দুক।
মাদারিরে দেখি তার সিন্য ধুকধুক।।
মুনসির গানের প্রতিধ্বনি বাজে কেরামতের গলায়। তমিজের বাপ শোনে আর ভাবে, হায়রে, কোনকালের সব পাওনা-গান, গড়াতে গড়াতে এই ফাতরা মানুষটার পাল্লায় পড়ে সেটার কী চেহারা হয়েছে :
বিলে না পরশ যদি পায় মাঝি অঙ্গ।
জল শুকাইয়া যায়, না থাকে তরঙ্গ।।
কেরামতে বলে শুন শুন দিয়া মন।
কাৎলাহারে জল কান্দে আয় মাঝিগণ।।
হঠাৎ করে তমিজের বাপ মাঝির বাচ্চাদের দিকে চিল্কার করে ওঠে, ওটি যাস না, ওটি যাস না! তার নিচু স্বরের কথা শোনে কে? ব্যাপারটা কী?-কারো একটা জাল থেকে ছিটকে পড়েছে একটি কিশোর কালা, সের খানেকের কম হবে না। বিলের এই বাকে বিলের ভেতরেই গলা বাড়ানো নতুন-জাগা ডাঙার ওপর দুষ্টু মাছ মুখ গুঁজে দিয়েছে বালির ভেতর। বালকেরা ছুটছে সেদিকে, কুদ্স মৌলবি তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বলে, আরে এই ছোঁড়া, ওটি যাস না। দলদলার মধ্যে পড়বু। তা কে শোনে কার কথা? মৌলবিকে অগ্রাহ্য করে আবিতনের বাপের নাতি, মানে বুলুর বেটা, এদের মধ্যে সে-ই একটু ডাঙর, সবাইকে গায়ের ধাক্কায় সরিয়ে লাফিয়ে পড়ে ধরে ফেললো কালার লেজটা। কিন্তু মাছের বাচ্চা নিজের লেজ তো লেজ, বুলুর বেটার হাতটাও টেনে নেয় বালির ভেতর। আসলে কিন্তু হাত ডোবার আগেই হাঁটু ভেঙে বসা পা দুটো তার কোমর পর্যন্ত ড়ুবে গেলেও হাতটা সে বালি থেকে বার করে নি! কুদুস মৌলবি চাঁচায়, আরে চ্যাঙড়াটা মরে, তোমরা কেউ দেখো না? বলতে বলতে ছুটতে থাকে কাদার ভেতর দিয়ে। আবার এই দেখতে দেখতেই তমিজের বাপ শোনে পাকুড়গাছের শোলোক :
মজনু হাঁকিয়া কয় ভবানী সন্ন্যাসী।
গোরাগণে ধরো আর দাও সবে ফাঁসি।।
গিরিবৃন্দ অসি ধরে ভবানী হুংকারে।
গোরাগণে পাঠাঁইয়া দেয় যমদ্বারে।।
বুলুর বেটাকে সামলাবার জন্যে উঁচু পাড় থেকে নামতে গিয়েও মুনসির শোলাকের খেই হারাবার ভয়ে তমিজের বাপ থমকে দাঁড়িয়েছিলো। তাকে ফের থামতে হয়। কেরামতের মুখে মুনসির নষ্ট প্রতিধ্বনি শুনতে :
কেরামতে ডাকে মাঝি জলে ফেলো জাল।
মাছ ধরো মণ্ডলেরে করো হে নাকাল।।
এবার কেরামতের দিকে কারো খেয়াল নাই, সবাই ছুটছে বিলের ভেতর জেগে ওঠা চোরাবালির ডাঙায়। বালির ভেতর ড়ুবন্ত বুলুর বেটার মাথা সই করে কে একজন ছুঁড়ে দেয় কৈ জাল। তমিজের বাপের ঘাড় থেকেই সেটা নেওয়া হয়েছে। তার মাথাটা আটকে যায় জালের ভেতর। সবাই তাকে ডাকে আফাজ, ভয় করিস না বাপ। বালুর মদ্যে সাঁতার কাট, সাঁতার কাট। নাক উপরের দিকে তুল্যা রাখ। কিন্তু টান দিলে জালটা আর ফেরত আসে না, বালির টানে কিংবা বালির ভেতরে ওঁৎ পেতে থাকা গজারের দাঁতে জালের সুতা ছিড়ে যায় পটপট করে। থামো, জাল আর টানো না বলতে বলতে তৌড়া জালের হাতে রাখার দড়ির মাথায় বড়ো একটা গোল মালা তৈরি করে জালের দিকটা ধরে ছুঁড়ে দেয় তমিজ। এতে আটকে পড়ে আফাজের মাথা। হয়তো আফাজ আগেই মারা গেছে বালির ভেতরে, কিংবা এই দড়ির গোবরাতেও তার মরণ হতে পারে, প্রাণপণ টানে তাকে তুলে আনা হয় ডাঙার ওপর।
আবিতনের বাপের বিলাপে কাৎলাহার বিলের আর আর আওয়াজ সব স্থগিত থাকে, দুই পাড় নিয়ে সমস্ত বিল জবুথবু হয়ে জড়ো হয় আফাজের লাশ ঘিরে।
গফুর কলুর সঙ্গে নিকা বসার পর আবিতন তো বাপের বাড়ির ছায়া মাড়াতে পারে, আবার মাঝিরাও ঐ বাড়ি থেকে একটু সরে সরেই থাকে। প্রথম স্বামীর বেটার সঙ্গে আবিতনও দেখা করার সুযোগ পায় না। অনুমতি দেয় না মাঝিপাড়া, আর গফুর কলু ছেলেটিকে সহ্যই করতে পারে না আফাজের কাজ জুটলো মণ্ডলের বাড়ি, দিনরাত তাই তাকে থাকতে হয়েছে সেখানেই। আবিতনের মা কখনো কখনো ভালো মাছটা তরকারিটা পিঠাটা হলে মাঠ থেকে কী বিলের ধার থেকে আফাজকে ডেকে খাওয়ায়, আবিতনের সঙ্গে চুপচাপ কোথাও তাকে দেখা করিয়ে দেওয়ার সুযোগও খোজে। তা আজ তার এমনি কপাল, আফাজ নিজেই গিয়েছিলো নানীর কাছে। মনে হয় ভাত খেতেই গিয়েছিল। তা মাঝিপাড়ার এইসব হৈ চৈয়ের মধ্যে নানীর দেওয়া ভাত আর খেতে পারে নি। এমন কি মণ্ডলবাড়িতে কামে না গিয়ে নানার পিছে পিছে সে চলে আসে কাৎলাহার বিলে। নানার তৌড়া জালটাও নিয়ে এসেছে ঘাড়ে করে।খুব এলোমেলোভাবে এই বৃত্তান্ত বলতে বলতে আবিতনের বাপ গপ্পের খেই হারিয়ে ফেলে আর কাঁদে।
বিলের ধারে চোরাবালি থেকে কয়েক হাত দক্ষিণে নিজের নিজের খলুইতে মাছ গুছিয়ে নিতে নিতে সবাই বসে লাশ ঘিরে। কুদুস মৌলবি মসজিদে একজনকে খাটিয়া আনতে পাঠিয়ে আয়াৎ পড়তে আরম্ভ করলে আফাজের মৃত্যু প্রকট হয়ে ওঠে, কেউ কেউ ফোঁপাতে শুরু করে, আবিতনের বাপ হামলে কেঁদে ওঠে। কোরানের আয়াত, ফেঁাপানো ও হামলানো কান্নার এলোমেলো বিন্যাস ভেঙে পড়ে একটি মোটা ও খসখসে স্বরের হুঙ্কারে, মাছ চুরি করিস? শালা ডাইঙার বাচ্চারা আসিছিস মাছ মারবার?
