সাটি মাছে পাড় দেয়, বেলে মাছ এলে দেয়; হায়রে, সাটি মাছে পাড় দেয়, বেলে মাছ এলে দেয়।—ধরা পড়ে শুধু ছোটো মাছ। সাটি মাছ আর বেলে মাছের কৌলিন্য নাই, সুতরাং এইসব মাছ যাদের জালে ধরা পড়ে তাদের শুনতে হয় বালকদের এই প্রচলিত কৌতুকটা। মেলার আগের দিন মণ্ডলকে খাজনা দিয়ে বিল ঘেঁকে মাছ ধরে। নিয়ে গেলো যমুনার মাঝিরা। এদিকে পানিও কমে গেছে, বিলের ঠিক মাখঝানেও গলা পানির বেশি নাই। সাটি আর বেলে, পুঁটি আর মৌরলা, ছোটো ছোটো চাদা আর বাশপাতা মাছই কেবল পাওয়া যাচ্ছে। মাঝিদের দাপাদাপিতে বিলের পানি কাদাকাদা হয়ে ওঠে, কাদা আরো কাদাটে হয় বকের ডানা থেকে ঝড়ে-পড়া ছায়ায়। এই ছায়ার ইশারাতেই কি-না কে জানে সন্ধ্যা নামে কুয়াশায় ভর করে। এর ওপর কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের ভূতুড়ে আলোয় গোটা বিল অচেনা ঠেকলেও কিংবা হয়তো অচেনা ঠেকে বলেই মাঝিদের মাছ ধরার তাগিদ বেড়ে যায় শতগুণ। মাছের ঝাঁক ঠাউরে মাঝিরা পলো দিয়ে চেপে চেপে ধরে বকের ডানার ছায়া। ছায়ায় এরকম চাপ পড়লে কেদের ডানায় সুড়সুড়ি লাগে এবং তারা সরে সরে যায়। রুই কালা কি পাঙাস কি বাঘাড় পালিয়ে গেলো সাব্যস্ত করে মাঝিরা বকাবকি করে, চুদির ভায়েরা, খানকির বাচ্চারা, তোরা হামাগোরে হাতে আসবু না? শালারা মণ্ডলের কোলের মদ্যে বস্যা গোয়া মারা দিবার পারিস, আর হামাগোরে সাথে আসবার চাস না, না? এরকম বকা খেয়ে কালাহারের মাছেরা গিরিরডাঙার মাঝিদের সঙ্গে তাদের পুরনো কুটুম্বিতা ফিরে পায় এবং ছোটোখাটো কিছু রুই কালা মৃগেলের বাচ্চা ঝাঁপ দিয়ে উঠে পড়ে কারো কারো জালের আঁচলে।
মগরেবের আজান দিয়ে মাত্র তিন চারজন বুড়া মুসল্লির নামাজের ইমামতি করে ফিরে এসেছে কুদুস মৌলবি। কেরামতের পাশে হাঁটতে হাঁটতে মাঝিদের দিকে তাকিয়ে সে জানায়, মণ্ডল আর তার বেটা বলে মানুষ লিয়া আসিচ্ছে। তোমরা এখন ওঠো তো। মাছ যা উঠিছে লিয়া বাড়িমুখে ঘাটা ধরো।
বিল থেকে ওঠা দূরের কথা, মৌলবির দিকে তাকিয়ে কে চিৎকার করে জবাব দেয়, আপনে দোয়া করেন হুজুর, দোয়া পড়েন। মণ্ডলের বাপ আসুক। বিল কি মণ্ডলের? না শালার বাপের! এই বীরত্বে তেজি হয়ে আরেকজন সংকল্প করে, শালারা আসুক। ব্যামাক কয়টা পলো আমান ঢুকায়া দিমু শালাগোরে গোয়ার মধ্যে।
উত্তরে সরতে সরতে তমিজের বাপের একটু কাছাকাছিই এসে পড়ছিলো সবাই। উত্তর দিক থেকে কোনো ইশারা পেয়েই কি-না কে জানে, ভাঙা গলায় তমিজের বাপ সবাইকে ডাকে, আরো এ্যানা আসো গো তোমরা।
তার কথা কারো কানে যায় না, তবে বুধা মাঝি চিৎকার করে তাকে জানায়, ও নানা, উদিনকার বাঘাড় মনে হয় এটিই আছে গো, এটি এখনো মেলা পানি ঠাহর করিচ্ছি। এতে তমিজের বাপ সাড়া না দিলেও তমিজ কিন্তু বেড় জালটা খাটাবার আয়োজন করে এবং সবাইকে আশ্বাস দেয়, মণ্ডল ঘরের মধ্যে সান্ধাছে গো, আজ আত্রে আর বার হবি না।
এইসব কলরব কিন্তু তমিজের বাপের কানে কিছুই ঢোকে না, পাকুড়গাছ থেকে তখন গুলিতে-ফুটো গলার ভেতর থেকে আসতে শুরু করেছে মুনসির নিজের স্বর :
মজনু হাঁকিয়া কয় ওহে সাগরেদ।
দরগাশরিফে ওরস করিল নিষেধ।।
নাসারা কোম্পানি বেয়াদব বেতমিজ।
মাজারে খাজনা ধরে বেদিনি ইবলিস।।
মুনসির গান নিশ্চয়ই আর কারো কানে যায় নি, তাই আবিতনের বাপ কেরামতকে বলে, ক্যা, গো, মণ্ডলের বেটা কাদেরের হুকুমে তুমি সেদিন গোলাবাড়ি হাটোত সভার মধ্যে গান করলা, আর এটি একটা শোলোকও কবার পারো না?
কেরামত তখন দেখছিলো তমিজের বাপের মুখ, ঝাপসা চাঁদের ভূতুড়ে আলোয়। তার মুখের রেখা কেমন উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। বুড়া আবার মুনসির ঐসব গায়েবি গান শুরু করে, এই ভাবনায় কেরামত তার দুদিন আগে বাঁধা গানটি গাইতে শুরু করে উঁচা গলায়,
মণ্ডলে করিল কবজা মাঝির কাৎলাহার।
কাঙাল মাঝিপাড়ায় ওঠে করুণ হাহাকার।।
চিৎকার করে ওঠে মাঝিরা, হামরা কবিয়াল পায়া গেছি গো! করো গো, গান করো। তবে তার শোলোকের সব কথা অনুমোদন করে না তমিজ, কাঙাল কারা গো? মণ্ডলেক হামরা কাঙাল করা ছাড়মু।
খাতা না দেখেও শোলোকের সব চরণের মিল তখন কেরামতের মনে পড়ে গেছে, মাঝিদের জালের আওয়াজ আর হর্ষধ্বনি আর তমিজের প্রতিবাদে তেজ বাড়ে তার ঠোঁটজোড়ায় :
মণ্ডলে খড়ম মারে বিধ মাঝির মাথে।
দুস্কে শশধর অস্ত যান সাথে সাথে।।
গিরিরডাঙা গ্রামে সূর্য না হন উদয়।
বিলে পদ্ম না ফুটিয়া কুড়িমাঝে রয়।।
মুনসির গানের এই অন্যরকম প্রতিধ্বনি শুনে তমিজের বাপ একটু অবাক হয় : কেরামতের মতো এক ফাতরা কিসিমের কবিয়ালের গলায় মুনসির প্রতিধ্বনি ওঠে কীভাবে? কেরামতের শোলোক শেষ হতে না হতে পাকুড়গাছ থেকে ফের জানানো হয়,
মহাস্থানে শায়িত শাহ সুলতান হুজুর।
মাহি সওয়ার নামে তিনি দুনিয়ায় মশহুর।
তানারে বেইজ্জত করে নাসারা কোম্পানি।
লাজে দুঙ্কে শুকাইল করতোয়ার পানি।।
কেরামতের ঠোঁটে আসতে আসতে মুনসির গলা একটু খাদে নামে বলে তমিজের বাপ মুনসির সন্তোষ কিংবা রাগ সম্বন্ধে কিছু বুঝতে পারে না, কোনো যন্ত্র ছাড়াই কেরামত গায় :
মাঝি বিনা বিল আর জল বিনা মাছ।
পুত্রহীন মাতৃকোল পুষ্প বিনা গাছ।।
আওরতে না পায় যদি মরদের চুম।
যতো জেওর দাও তারে রাতে নাহি ঘুম।।
মাঝিরা উল্লাসে চিৎকার করে, কী শোলোক কল্যা গো, আহা! কেউ কেউ তার শেষ দুটি চরণ ভুলভাল আওড়ায়। তমিজ চেঁচিয়ে বলে, ও বাজান, এটি আসো গো, বেড় জালটা খাটাই। তোমার বাঘাড় হামরা তোমার হাতোত তুল্যা দিমু। বাঘাড় তো ফিরিয়ে নিয়েছে মুনসি নিজে, সেই মাছ নিয়ে তমিজের এরকম লালচ তমিজের বাপের পছন্দ হয় না। বরং ছেলের সংকল্পকে স্পর্ধা বিবেচনা করে সে একটু ভয়ই পায়।
