উগল্যান কথা হামরা জানি। তোমার কেচ্ছা থামাও। আফসার তাকে থামিয়ে দিতে উঠে দাঁড়ালে কালাম মাঝি রাগ করে ভাস্তের ওপর, আঃ। কেরামতের কথাটা শোনো না বাপু। তারপর কেরামতের পিঠে হালকা চাপ দিয়ে সে তাকে অভয় দেয় এবং নিজেও ভয় কাটাবার পথ খোঁজে, কও বাপু। তোমার মাথা ঠাণ্ডা। বুঝায়া কও, মানুষের বাড়িত আগুন দেওয়া বড়ো গুনার কাম। বুঝায়া কও।
কালাম মাঝির পৃষ্ঠপোষকতায় কেরামত আলি পিঠে তো বটেই বুকেও বেশ বল পায়। তার এলোমেলো মাথায় মাঝিদের নিয়ে লেখা পদ্যটা দানা বাঁধে। কিন্তু অন্ত্যানুপ্রাসগুলো মনে না পড়ায়, কিংবা বিনয়ে বা দ্বিধাতেও হতে পারে, তাকে সেঁটে থাকতে হয় সাদামাটা গদ্যের সঙ্গেই, আপনারা জানেন তো সবই। কিন্তু শেখেন না কিছুই। না শিখলে জানার ফল কী? সেই জানার ফায়দা কী? জয়পুরে দেখিছি, বর্মণী মা পুলিসের গুলি খায়াও হিরদয়ে বল রাখে। তার হুকুমে চাষারা তীর চালায়। আর এটি, এই গিরিরডাঙা গাঁয়ে দেখি, মাঝিদের চোদ্দপুরুষের বিল দখল করে ভিন্ন জাতের মানুষ আর মাঝিরা বস্যা বস্যা খালি বাল ছেঁড়ে।
কেরামত আলি কথা বলেই চলে, আর জুম্মাঘরের মাঝিরা সব দাঁড়ায় সোজা হয়ে। তমিজের বাপ পর্যন্ত উঠে দাঁড়িয়ে দরজার বাইরে চোখ রেখে খুঁজতে থাকে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথান। জুম্মাঘরের জংধরা টিনের চাল হাতখানেক ওপরে ওঠে, সেখানে ঢংঢং ঘণ্টা বাজে। কিন্তু এই বিকট ঘণ্টাধ্বনি চাপা পড়ে তমিজের চিৎকারের নিচে, কিসক? হামরা বাল ছিঁড়মু কিসক? চলো! সোগলি চলো গো! সোগলি বাড়িত যায়া জাল পলো যা আছে লিয়া আসো। আজ কাৎলাহার মুখে চলো।
২৯. কাৎলাহার বিলের পশ্চিমপাড়ে
কাৎলাহার বিলের পশ্চিমপাড়ে গিরিরডাঙার মাঝিরা এলোমেলো সারিতে দাঁড়িয়ে বিলে ঝপঝপ করে জাল ফেললে কালাম মাঝির বাড়ির কাছে ফকিরের ঘাট থেকে দক্ষিণে বুলু মাঝির বাড়ির ঘাট পর্যন্ত তোলপাড় ওঠে। বেশিরভাগ জেলেই নিয়ে এসেছে প্যালা জাল; ভালকা বাঁশের ত্রিভুজের মাঝখানে এই জাল দিয়ে ধরা যায় বড়ো জোর ছোটো মাছ। কিন্তু এমনভাবে সবাই জাল ফেলে যে মনে হয় রুই কাতল মৃগেল ছাড়া অন্য মাছ ধরায় তাদের রুচি নাই। আর তৌড়া জালওয়ালাদের ভাব দেখে মনে হয়, বিলের মধ্যে কুমির থাকলে তাও আজ রেহাই পাবে না। এমন কি দুইজন নিয়ে এসেছে বেড় জালের। দুটো তিনটে করে টুকরা; এই জাল খাটাতে না পারলে কী হয়, এর চিকন ফাঁক দিয়ে মাছ পালাতে পারবে না এই ভরসায় তারা টুকরাগুলিকে জোড়া দেয় তাড়াতাড়ি করে। কেউ কেউ এনেছে পলো। ছোটো ছেলেদের হাতে হাতে বড়শি। মাছের চার না দিয়েই পানিতে ফাত্তা ফেলে তারা দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এতো হৈচৈয়ের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে তারা এদিক ছোটে ওদিক ছোটে। তাদের বড়শিতে মাছ পড়ার। সম্ভাবনা সম্পূর্ণ লোপ পায়।
এতো হট্টগোলে শীতের শেষ দুপুর আটকে থাকে বিলের দুই পাড়ের গাছে গাছে। তমিজের নিয়ে-আসা কৈ জাল ঘাড়ে ফেলে তমিজের বাপ আস্তে আস্তে চলতে থাকে উত্তরের দিকে। এই শীতে কৈ জাল দিয়ে হবেটা কী? তমিজটা একেবারে চাষাই হয়ে গেলো, কখন কোন জাল ফেলতে হয় তাও ভুলে গেছে। কার কাছ থেকে এটা নিয়ে এসে ফেলে দিলো বাপের ঘাড়ে!
বিলের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পানি তবু কিছু আছে। কিন্তু এক বাঙালির রোগা স্রোত ছাড়া উত্তরে পানি বেশ কম। ডাঙা উঠতে শুরু করেছে এই দিকটাতেই। কোনো কোনো জায়গায় মণ্ডলের কামলারা একটা চাষ দিয়ে কাউন ছিটিয়ে গেছে।
তা নিচের দিকে তমিজের বাপের নজর নাই, চোখের ওপর হাত রেখে সে তাকিয়ে থাকে উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের মগডালের খোজে। গাছটা এখান থেকে নজরে না পড়লেও তার একমাত্র বাসিন্দার গলায় ঝোলানো শিকলের আওয়াজ বাজে হালকা বোলে, এতে দানা বাঁধে চেরাগ আলির গলা :
মুনসির আওয়াজ যেন আতসের শ্বাস।
দিল কাঁপে যাহাদের দুনিয়াতে বাসা।।
আগুনের নিশ্বাসে গায়ে আঁচ লাগে, তমিজের বাপ তবু আরো এগোয়। তার দেখাদেখি ও তার পিছে পিছে হলেও উত্তরে এগুতে থাকে মাঝির দল। বিলের উত্তরে মানুষের আনাগোনা হয়ই না, সেদিকে মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তবে কুদুস মৌলবি দাঁড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণের কাছে, বুলুর ঘাটে। মাঝিপাড়ার জুম্মাঘরে আজান পড়তে তাই দেরি হয়। বিকালবেলা আসতে আসতে বেশি বিকাল। হয়ে যাচ্ছে। গোলাপি রঙের রোদে কুদুস মৌলবির সাদাকালো দাড়ি ছুঁচলো হয়ে উঠছিলো, কিন্তু আসরের আজান দেওয়ার ওকত যাই যাই করছে বলে সে একটু কাবু হয় এবং কাছাকাছি কেরামতকে দেখে বলে, তোমার কথা শুন্যা মাঝিরা তো ঝাঁপ দিয়া পড়লো, এখন মণ্ডল সবগুলার কোমরে দড়ি না বান্দে। রফাদানি জামাতের মানুষ, এই একটা সুযোগ পাবি।
বিলের ওপর মণ্ডলবাড়ির শিমুলগাছের বকেদের মন্থর ডানা ওড়ে, ডানা থেকে ঝরতে থাকে পাতলা ছায়া। ছায়ায় ছায়ায় তারা বিকাল নামায় বিলের পানিতে। বড়ো বড়ো চোখজোড়া খোলা পেয়ে শীতের বিকালের ছায়া এক ফাকে ঢুকে পড়ে কেরামতের মাথার ভেতরে; বকের ডানার ঝাপ্টায় ঝাপ্টায় তার মাথার অন্ধকারেও ঢেউ খেলে এবং ফলে খাড়া হয়ে ওঠে তার কুচকুচে কালো ঝাঁকড়া চুল তার কথাতেই কি মাঝিরা ঝাঁপ দিলো বিলে মাছ ধরতে? এদের কোমরে দড়ি পড়লে সে-ই কি আর বাদ পড়বে? তাকেই তো আগে ধরবে। পুলিসের খাতায় তার নাম তো আছেই, গোলমেলে। জয়পুর আর পাঁচবিবি আর আক্কেলপুর থেকে সরে এসেছে বলে পুলিস হয়তো তাকে। ঘটাচ্ছে না, আবার মাঝিদের এই হাঙ্গামার অছিলায় নতুন করে উৎপাত শুরু না করে। তা হলে?—তা হলে সে কি পায়ে পায়ে দক্ষিণদিক দিয়ে ঘুরে নিজগিরিরডাঙায় শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে নাকি? কিন্তু উত্তরদিকের মাঝিদের কোলাহল তার পা ঘুরিয়ে নেয় সেদিকেই। তাদের কলরবেই তার গতরে তাপ লাগে : তার সাদামাটা কথাতেই মাঝিরা ছুটে এসেছে বিলের পানিতে! কিন্তু এখন তা হলে মাঝিরা তার দিকে মোটে খেয়াল করছে না কেন? তার চারপাশে এখন তো কেউ নাই। এমন কি কুন্স মৌলধিও চলে গেলো আজান দিতে। তমিজের বাপই কি এদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে উত্তরের দিকে? তাকেই,কি এরা সর্দার বলে মানে? এক ফকিরের সঙ্গে কিছুদিন থেকে আর তার নাতনিকে বিয়ে করেই সে কি এলাকার নেতা হয়ে গেলো নাকি? না-কি মণ্ডলের কাঠের বোলওয়ালা খড়মের বাড়িই তমিজের বাপের মাথার মুকুট? মাছের নকশা-আঁকা লোহার লাঠির কথা সে যে বলে, তাই কি খড়মের বাড়ি হয়ে পড়েছিলো তার মাথায়? না-কি খড়মই তার মাথায় পড়ে লোহার পান্টির আদল নিলো?তমিজের বাপের মাথার আঘাতের সঙ্গে মুকুটের উপমা জুটে গেলেও কেরামত আলি এটাকে তার পদ্যের কোথাও জুত করে বসাতে পারে না। কিছুক্ষণ একটু একা থাকায় মাঝিদের নিয়ে লেখা তার পদ্যের সবটাই এখন মনে পড়ছে, কিন্তু মানুষের মাথায় খড়মের বাড়িকে মুকুটের উপমা দিয়ে কোথাও বসিয়ে দেওয়াটা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে মাঝির দঙ্গল ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, পাতলা অন্ধকার ও হালকা কুয়াশায় তাদের ঝাপসা দেখায়। কেরামতের বুক ছমছম করে, সে তাড়াতাড়ি হাঁটা দেয় উত্তরের দিকে।
