চেরাগ আলির গান আর কেউ শুনতে পায় কি-না সন্দেহ কারণ তমিজের বাপের কথা কেরামত বয়ান করে অনেক চড়া গলায়, তমিজের বাপ বিলের ধারে নামলো। পাও দুইখান কেবল কাদোর মধ্যে রাখিছে আর মণ্ডলও অ্যাসা তমিজের বাপের মাথাত মারলো খড়মের এক বাড়ি। কলো, শালা, মাঝির বাচ্চা, ডাইঙা শালা, ছোটোলোকের। জাত, মাছ চুরি না করলে প্যাটের ভাত হজম হয় না।
কী কলো? ক্যা গো তমিজের বাপ, মণ্ডল তোমাক কী কলো? বলতে বলতে লাফিয়ে ওঠে আধ বয়েসি এক মাঝি। তার উত্তেজিত মাথার তাপে ঝরে পড়ে তার কালচে সাদা কিস্তি টুপি। প্রায় সঙ্গেসঙ্গে উঠে দাড়ায় আরো কয়েকজন। তাদের শরীরও কাঁপে, অনেকের টুপি না থাকায় মাথায় জড়ানো গামছাগুলোই থরথর করে কাঁপে, কেউ কেউ মাথা থেকে গামছা খুলে কোমরে পেঁচায়। আপাতত তাদের উত্তেজনার সবটাই তারা নিয়োগ করে নানা ধরনের বাক্য গঠনে, যেমন, শালা হালুয়া চাষার বেটা, আজ ট্যাকা হয়া দুনিয়াত লয়া অঙ দেখিচ্ছে।
শালার বাপ তো নেংটি পিন্ধা থাকিচ্ছিলো। মাঘ মাসের জাড়োত গায়ের ওপরে পিরান ওঠে নাই।।
আরে শালারা সারা জেবন খাছে খালি শুধা ভাত। মাঝিরা মাছ মাগনা না দিলে মাছ মুখখাত তুলিছে কোনোদিন?
শালারা ভাত খায়া হাত ধোয় নাই, খায়া হাত মুছিছে নেংটির সাথে।
শরাফত মণ্ডলের পূর্বপুরুষের দারিদ্র, নিম্নমানের জীবনযাপন ও নীচু রুচির কথা ঘোষিত হতে থাকলে সবাই স্বস্তি পায় এবং অনেকেই ফের বসে পড়ে। তখন মুখ খোলে আবিতনের বাপ, আরে চুপ করো। তোমরা উদিনকার চ্যাংড়া তোমরা কী দেখিছো? সবার অর্বাচীন মূখতা সম্বন্ধে তাদের নিঃসন্দেহ করে এবং এই ব্যাপারে নিজে দ্বিগুণ নিশ্চিত হয়ে আবিতনের বাপ জানায়, চাষাদের পেটে ভাত জুটেছে খালি পৌষ মাঘ এই দুটি মাসে। ঐ সময় তারা চিড়ামুড়ি খেয়েছে, পিঠেপুলিও খেয়েছে। আর কী করেছে?-ঐ সময় হামাগোরে বাপদাদাক বাড়িত লিয়া ত্যালপিঠা আর চিতই পিঠা খিলায়া জমি লেখ্যা লিছে লিজেগোরে নামে। না হলে কাৎলাহারের দুই পাড়ের জমিজমা গাছপালা ব্যামাক তো হামাগোরে দখলেতই আছিলো।
আবার এখন লায়েবেক ঘুষ দিয়া বিলটাও দখল করিছে, দেখলা তো? কালাম মাঝি এই কোলাহলটির উপসংহার ঘটবার উদ্যোগ নেয়, ঠিক আছে। জমিদারে পত্তন দিবি তো পত্তন লেওয়ার হক আছে কার? মাঝিগোরে বিল পত্তন লিবি মাঝি। না কী কও?
কালাম মাঝির সঙ্গে সবাই একমত, কিন্তু কালাহার বিলের পত্তন কাকে দেওয়া উচিত এ নিয়ে কারো তেমন মাথ্যব্যথা নাই। বিল মাঝিদের, মাঝিরাই মাছ ধরবে, তাদের কথা হলো পত্তন উত্তন আবার কী?
তারা সবাই কথা বলে এবং পরস্পরের কথায় কিছুমাত্র কান না দিলেও সবার কলরব থেকে যে সিদ্ধান্তটি বেরিয়ে আসে তা হলো এই চলো শালা মণ্ডলের বাড়িত চলো। পাটের গোছের মাথাত আগুন লিয়া চলো। শালার বাড়িত আজ আগুন দেওয়া হোক। মণ্ডলের বেটা শালা বাড়িত দালান তোলার হাউস করিছে গো, কাল গোরুর গাড়িত করা ইট লিয়া আসিচ্ছিলো দেখলাম। শালার দালান তোলার হাউস হামরা মিটায়া দেই চলো।
মাঝিদের উত্তেজনায় গা গরম হলেও এদের সংকল্পে কালাম মাঝির ভয় হয়, তার গা শিরশির করে। মাঝির জাত, তার নিজের জাত, একই রক্ত, কালাম এদের হাড়ে হাড়ে চেনে। বড়ো মাথাগরম জাত। জীব হত্যা করে পেট চালায়, তাও আবার পানির নিরীহ প্রাণী। এরা কখন যে কী করে বসে কেউ জানে না। কালাম মাঝির প্রথম পক্ষের ছেলে পুলিসের চাকরি পেয়েছে, বর্ধমান জেলার কালনায় পোস্টিং। চাকরি পাবার পর ছেলে একবার বাড়ি এসেছিলো। বিলের অন্যায় পত্তন সম্বন্ধে কালাম তাকে ওয়াকিবহালও করেছে। তা ছেলে বলে গেছে, সরকারি আইনে এদিক ওদিক করার জো নাই। বৃটিশের শাসনে হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। তবে আইনের ফাঁক আছে, আইনের ফাঁকফোকর জানলে আইন না মানাটা পানির মতো সোজা। এই মাঝির বাচ্চারা আইনই বা জানে কী, তার ফাঁকই বা দেখবে কোত্থেকে? মণ্ডলের বাড়িতে চড়াও হয়ে আগুন ধরালে শরাফত মণ্ডল যে কোন ধারায় ঠুকে দেয়, তখন সামলাবে কে? আবার আবদুল কাদেরের যা দাপট, টাউনের নেতাদের ধরে সে কি না করতে পারে? চড়া গলা নামিয়ে কালাম মাঝি মিনতি করে, তোমরা দুইটা দিন সবুর করো। তহসেনেক একটা টেলিগ্রাম কর্যা দেই তো তিন দিনের মাথাত হাজির হবি। পুলিসের লোক, ওর শলাপরামর্শ শুন্যা কাম করলে বিপদের কিছু থাকে না।
ভাইজান দরকার হলে ফোর্স লিয়া হাজির হবি। আফসারের এমন তেজি ভরসায় কালাম মাঝি সায় দেয় না। একজন কনস্টেবল কি আর ইচ্ছা করলেই ফোর্স নিয়ে আসতে পারে। এখন এদের ঠেকাবে কী করে সেই ভাবনায় কালাম মাঝি কাতর।
এই সময়ে উঠে দাঁড়ায় কেরামত আলি। তার ঠোট একটু একটু কাঁপে। গত আটদিন ধরে কালাম মাঝির মুখে মাঝিদের ওপর মণ্ডলের জুলুমের কথা শুনে শুনে সে একটা পদ্য লিখে ফেলেছে। কাগজটা তার পকেটেই, কিন্তু কাগজ না দেখে পড়তে পারলে ভালো হতো। পদ্যের কোনো চরণই তার মনে আসছে না। তাই তাকে বয়ান করতে হয় তার প্রেরণার গদ্যরূপ, শোনেন, একটা কথা কই। সবার কথাবার্তা একটু কমলে সে বলে, শোনেন। আধিয়াররা তো চাষ করে জোতদারের জমি। কী কন? তারা জান দিয়া খাটে, ফসল পায় আধাআধি। এখন তারা তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল চায়া জোতদারের সাথে লড়াই করে। আধিয়ার ভয় পায় না। পশ্চিমের খিয়ার এলাকায়–।
