“বন্ধ করে দিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
রূপা খেয়াল করেনি। ক্লাশে এত ছেলেমেয়ে কে কখন আসে, কখন যায় সে। লক্ষ করতে পারে না, মিম্মি পারে। জিজ্ঞেস করল, “কেন ক্লাশে আসা বন্ধ করে দিয়েছে?”
“বুঝতে পারছিস না? কেমন করে আমাদের মুখ দেখাবে?”
“মুখ দেখাতে সমস্যা কী?”
মিম্মি হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “তুই কিছুই বুঝিস না! বাবা-মা ছাড়াছাড়ি হলে ছেলেমেয়েদের লজ্জা হয় না? সেই লজ্জায় সে আর মুখ দেখাতে পারে না!”
রূপা দেখল ঠিক তখন সোহেল তার ব্যাগ দুলাতে দুলাতে ক্লাশ রুমে ঢুকল। তার মুখে লজ্জার কোনো চিহ্ন নেই। মুখটা একটু শুকনো তার বেশি কিছু নয়। সোহেলকে দেখে মিম্মি কেমন যেন হকচকিয়ে যায়।
রূপা মিম্মিকে বলল, “ঐ তো সোহেল। দেখি জিজ্ঞেস করে—”
মিম্মি খপ করে রূপার হাত ধরে বলল, “সর্বনাশ! কী জিজ্ঞেস করবি?”
“ওর বাবা-মায়ের কী অবস্থা–”
”মাথা খারাপ হয়েছে তোর? কেউ এভাবে জিজ্ঞেস করে? কত বড় লজ্জা–”
রূপা মিম্মির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “লজ্জার কী আছে।”
মিম্মি রূপাকে ধরে রাখার চেষ্টা করল, রূপা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সোহেলের কাছে গিয়ে বলল, “সোহেল, তোর সবকিছু ঠিক আছে?”
সোহেল বলল, “হ্যা–” তারপর রূপার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “আসলে ঠিক নাই।”
“কী হয়েছে?”
“অনেক লম্বা স্টোরি।”
“বলবি আমাকে?”
“কী আর বলব! আম্মু-আব্বুর অনেকদিন থেকে ঝগড়া। এখন মামারা এসে আম্মুকে নিয়ে গেছে। ছোট ভাইটাসহ।”
রূপা কিছু না বলে সোহেলের দিকে তাকিয়ে রইল। সোহেল বলল, “কয়দিন থেকে মনটা ভালো নাই।”
“ভালো থাকার কথা না।”
“কয়দিন খালি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি।”
“এখন?”
“আজকে ক্লাশে আসলাম। কিছু ভাল্লাগে না।”
রূপা নরম গলায় বলল, “আমাদের বলিস, যদি কিছু করতে পারি।”
সোহেল হাসার চেষ্টা করল, “তুই আর কী করবি?”
“তবুও। অনেক সময় যখন খুব মন খারাপ থাকে তখন কারো সাথে কথা বললে একটু মন ভালো হয়।”
সোহেল বলল, “উঁহু। হয় না। সবকিছু ভুলে থাকতে পারলে হত। ভুলে থাকার রাস্তা তো একটাই–”
“কী রাস্তা?”
সোহেল মাথা নাড়ল, বলল, “নাহ্। কিছু না।”
রূপা দুশ্চিন্তিত মুখে সোহেলের দিকে তাকিয়ে রইল।
.
বিজ্ঞান ক্লাশে সোহেল একটু বিপদে পড়ল। বিজ্ঞান স্যার সবাইকে অম্ল-ক্ষার নিয়ে একটা হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন, স্যারকে সবাই যমের মতো ভয় পায় তাই সবাই নিয়ে এসেছে। শুধু সোহেল আনেনি। স্যার, হুংকার দিয়ে বললেন, “হোমওয়ার্ক আনিসনি কেন?”
সোহেল দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। কী বলল সেটা পরিষ্কার বোঝা গেল না। স্যার আরো জোরে হুংকার দিলেন, “কী বলছিস পরিষ্কার করে বল।”
“স্যার, বাসায় একটু ঝামেলা ছিল।”
“কী ঝামেলা?”
“এই তো মানে স্যার ইয়ে স্যার–”
”ইয়ে মানে আবার কী?”
সোহেল বলল”মানে স্যার ঝামেলা।”
“বদমাইশ পাজি হতভাগা। লেখাপড়ার নামে কোনো নিশানা নাই শুধু। ফাঁকিবাজি? একটা হোমওয়ার্ক পর্যন্ত করতে পারিস না?”
সোহেল কাচুমাচু মুখ করে বলল, “ভুল হয়ে গেছে স্যার।”
“ভুল?” স্যার চিৎকার করে বললেন, “ভুল আর বদমাইশীর পার্থক্য জানিস ফাজিল কোথাকার? খুন করে ফেলব তোকে। খুন করে ফেলব।”
স্যার এগিয়ে গিয়ে খপ করে সোহেলের চুল ধরে ফেললেন, প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “পাজির পা ঝাড়া কোথাকার। একেবারে খুন করে ফেলব।”
রূপার কাছে পুরো ব্যাপারটা একেবারে অসহ্য মনে হল, কিন্তু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই। স্যার সোহেলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন, বললেন, “লেখাপড়া করার ইচ্ছা আছে? না কি নেই?”
সোহেল বিড়বিড় করে বলল, “জানি না স্যার।”
স্যার ঠিক শুনতে পেলেন না, জিজ্ঞেস করলেন, “কী বললি?”
সোহেল বলল, “না স্যার আর কিছু বলি নাই।”
স্যার আর কিছু বললেন না। সোহেলকে ছেড়ে দিয়ে ক্লাশের সামনে চলে গেলেন। যখন ক্লাশ চলছিল রূপা মাঝে মাঝেই সোহেলকে লক্ষ করছিল। কেমন যেন আনমনা হয়ে বসে আছে। মনে হয় চারপাশে কী হচ্ছে সে কিছুই লক্ষ করছে না।
পরদিন থেকে সোহেল ক্লাশে আসা বন্ধ করে দিল।
.
চারদিন পরের কথা। রূপা স্কুলে গিয়ে নিজের ক্লাশে যাচ্ছে, মিম্মি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আচার খাচ্ছিল, রূপাকে দেখে লুকিয়ে ফেলল। রূপা সেটা না দেখার ভান করে বলল, “সোহেলের কোনো খবর জানিস?”
“জানি।”
“কী জানিস? ক্লাশে আসে না কেন?”
“তোর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তুইও ক্লাশে আসতি না।”
“আরো বেশি আসতাম।”
মিম্মি গলা উঁচিয়ে বলল, “আসতি না।”
“অবশ্যই আসতাম। একশবার আসতাম।”
পাশ দিয়ে রাজু যাচ্ছিল, সে দাঁড়িয়ে গেল, জিজ্ঞেস করল, “কোথায় একশবার আসবে?”
মিম্মি চোখ পাকিয়ে বলল, “আমরা আমাদের কথা বলছি তুমি তার মাঝে নাক গলাতে চাও কেন?”
মিম্মি কথাটা বলল খুবই খারাপভাবে যে কেউ শুনলে অপমানে তার কান লাল হয়ে উঠত। রাজুর কিছু হল না, সে খিক খিক করে হেসে ফেলল, “ঠিকই বলেছ। আমার নাকটা মনে হয় বেশি লম্বা যেখানে-সেখানে গলিয়ে দিই।” বলে
সে নিজের নাকটা টানাটানি করে দেখল, আসলেই সেটা লম্বা কি না।
কথা শেষ করে রাজু চলে যাচ্ছিল, রূপা তাকে থামাল। বলল, “রাজু, তুমি কি জান সোহেল চারদিন ধরে ক্লাশে আসে না?”
“চারদিন থেকে?”
