রাত্রিবেলা যখন সবাই শুয়ে পড়েছে তখন রূপা পায়ে পায়ে রান্নাঘরে হাজির হল। সুলতানা রান্নাঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে একটা টিনের থালায় কিছু ভাত নিয়ে খাচ্ছে। তারা যখন খেয়েছে তখন টেবিলে অনেক কিছু ছিল, সুলতানার প্লেটে সেসব কিছু নেই, একটা বড় কাঁচা মরিচ শুধু আলাদা করে চোখে পড়ে।
সুলতানা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল, “কী হইছে রূফ-রূফালী!”
রূপা বলল, “রূফ-রূফালী না, রূপ-রূপালী।”
সুলতানা ফিক করে হাসল, “সেইটা বলতে আসছ?”
“না। সেইটা বলতে আসি নাই। আমি আমি–”
“তুমি কী?”
“আমি বলতে এসেছি যে আমি খুবই সরি। মানে খুবই দুঃখিত।”
সুলতানা হাসি হাসি মুখে বলল, “কেন?”
“আজকে আম্মু তোমার সাথে যেরকম ব্যবহার করেছে সেইটা দেখে।”
সুলতানা আবার খেতে শুরু করল। মুখে একটু ভাত দিয়ে বলল, “আজকে তো বেশি কিছু করে নাই। খালি চুল ধইরা একটা ধাক্কা–”
“মানে?”
সুলতানা প্লেটটা নিচে রেখে বাম হাতটা দিয়ে তার কামিজটা একটু উপরে তোলে, রূপা দেখে পিঠে লাল হয়ে খানিকটা জায়গায় দগদগে ঘায়ের মতো হয়ে আছে। রূপা শিউরে উঠল, “কীভাবে হয়েছে?”
“একটা গেলাস হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছিল।”
রূপা কিছু বলতে পারে না, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। সুলতানা সহজ গলায় বলল, “আসলে মারপিট আমি সহ্য করতে পারি। গরিব মানুষ হইছি একটু লাথি ঝাঁটা খামু না সেইটা তো হতে পারে না। কিন্তু যখন তোমাদের সামনে গায়ে হাত দেওয়া তখন লজ্জা লাগে।”
সুলতানা মাথা নিচু করে তার থালার ভাত নাড়াচাড়া করতে লাগল। রূপা দেখল সেখানে টপ করে তার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি পড়ল। একটু পর সুলতানা যখন মুখ তুলে তাকাল তখন অবশ্যি তার চোখে-মুখে মন খারাপের কোনো চিহ্ন নেই, হাসি হাসি মুখ।
রূপা কী বলবে বুঝতে পারল না, ইতস্তত করে বলল, “তুমি এখানে কেন পড়ে আছ? তুমি চলে যাও না কেন?”
“যদি দরকার হয় চলে যাব। তুমি চিন্তা কইরো না।”
“আম্মু যদি তোমার উপর এইভাবে অত্যাচার করে তা হলে তো তোমার এখনই চলে যাওয়া উচিত।”
সুলতানা কোনো কথা বলল না, প্লেট থেকে আরেক দলা ভাত মুখে নিয়ে কাঁচা মরিচটাতে কড়াৎ করে কামড় দিল। রূপা বলল, “তোমার বাড়িতে কে আছে?”
“বুড়া মা আছে। আর কেউ নাই।”
“তা হলে তুমি কই যাবা।”
“আমার দূর সম্পর্কের একটা বইন আছে। জোবায়দা। তার কাছে।”
“জোবায়দা কোথায় থাকে?”
সুলতানা রূপার দিকে তাকাল, তার দুই চোখে কৌতুক। ”তুমি জোবায়দার কথা ভুলে গেছ?”
রূপা অবাক হয়ে বলল, “আমি চিনি জোবায়দাকে?”
“সবাই চিনে।”
“সবাই চেনে?”
“হ্যাঁ।” সুলতানা আরেক দলা ভাত মুখে দিয়ে কাঁচা মরিচটাতে কড়াৎ করে আরেকটা কামড় দিয়ে বলল, “টেলিভিশনে আসছিল, পত্রিকায় আসছিল, মনে নাই? গলায় দড়ি দিল কয়দিন আগে?”
রূপা চমকে উঠল, তার মনে পড়ল, কয়দিন আগে একটা বাসার কাজের মেয়ে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়েছিল, সেটা নিয়ে পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনে কয়দিন খুব হইচই হয়েছিল। রূপা চোখ বড় বড় করে সুলতানার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি সুইসাইড করার কথা বলছ?”
“বলছি না। কিন্তু এই রাস্তাটা খোলা আছে চিন্তা করলে বুকে জোর পাই।”
রূপা রান্নাঘরে হাঁটু গেড়ে বসে সুলতানার হাত ধরে বলল, “প্লীজ প্লীজ সুলতানা এরকম কথা মুখে এনো না। প্লীজ!”
“ঠিক আছে মুখে আনমু না। কিন্তু মাথায় যদি চলে আসে কী করমু বল।” সুলতানা প্লেটটা নিচে রেখে তার ওড়নাটা খুলে দেখাল, “এই যে তেল-কালি লাগা ওড়না পেঁচায়া গলায় বানতে হবে, তারপর ঐ শিকের মাঝে বেঁধে একটা লাফখুবই সোজা!”
রূপা একেবারে শিউরে উঠল। বলল, “ছিঃ! এইভাবে বলে না।”
“ঠিক আছে রূফ-রূফালী বলব না।”
“রূফ-রূফালী না রূপ-রূপালী।”
সুলতানা হাসল, রূপাও হাসল। রূপা তখন দুই হাত দিয়ে সুলতানার হাত ধরে বলল, “শোনো সুলতানা। আমি যখন বড় হব তখন তুমি আর আমি একসাথে থাকব, কেউ তখন তোমারে কিছু করতে পারবে না।
সুলতানা রূপার দিকে তাকিয়ে রইল, তার চোখে হঠাৎ পানি টলটল করতে থাকে। সে বাম হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলল, “তুমি যে এইটা বলেছ সেই জন্যেই বুকটা ভইরা গেছে। এই বাসায় তুমি আছ দেখে আমি সব সহ্য করতে পারি। বুঝছ রূফ-রূফালী?
“রূফ-রূফালী না রূপ-রূপালী।”
“রূ-ফ-রূ-ফা-লী!” সুলতানা আবার হাসল, রূপা অবাক হয়ে দেখল সুলতানার হাসিটা কী সুন্দর। না কি সবার হাসিই সুন্দর?
.
০৩.
ক্লাশে এসে রূপা ডেস্কে তার ব্যাগটা রাখার আগেই মিম্মি ছুটে এলো। গলা নামিয়ে চোখ নাচিয়ে বলল, “জানিস কী হয়েছে?”
রূপা অনুমান করল, বিশেষ কিছু হয়নি। মিম্মির কথা বলার ঢঙটাই এরকম। এমনভাবে শুরু করবে যে সবারই মনে হবে ভয়ংকর কিছু একটা ঘটেছে। মিম্মি অবশ্যি রূপার উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করল না গলা আরো নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “সোহেলের বাবা-মা” তারপর দুই হাত বিচিত্র একটা ভঙ্গি করে নাড়াল। এভাবে হাত নাড়ার অর্থ যা কিছু হতে পারে, সোহেলের বাবা-মা একজন আরেকজনকে খুন করে ফেলেছেন কিংবা একজন আরেকজনের হাত ধরে নাচানাচি করছেন।
রূপা জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে সোহেলের বাবা-মায়ের!”
“কমপ্লিট ছাড়াছাড়ি।”
“তুই কেমন করে জানিস?”
“না জানার কী আছে?” মিম্মি ষড়যন্ত্রীর মতো মুখ করে বলল, “আমার কাছে সব খবর আসে। তা ছাড়া দেখিসনি সোহেল ক্লাশে আসা বন্ধ করে দিয়েছে?”
