সুলতানা মুখটা হঠাৎ করে গম্ভীর করে ফেলল, বলল, “কী জন্যে ভালো বল দেখি? তোমার লেখাপড়া জানা দরকার। লেখাপড়া শেষ করবার পর জজ বেরিস্টার হবা। বিয়া-শাদি করবা। আমার কী জন্যে দরকার?”
রূপা একটু বিপদে পড়ে গেল, লেখাপড়া নিয়ে সে যেসব ভালো ভালো কথা জানে, স্কুলে রচনা লেখার সময় যে কথাগুলো লিখে ভালো নম্বর পায় তার কোনোটাই সে বলতে পারল না। একটু ইতস্তত করে বলল, “কত ভালো ভালো গল্পের বই আছে, উপন্যাস-নাটক আছে সেগুলো পড়তে পারবে।”
সুলতানা হি হি করে আবার হাসতে লাগল, বলল, “খালাম্মা যখন বলবেন, এই সুলতাইন্যা, গোসলের জন্যে গরম পানি দে, তখন আমি বলমু, খাড়ান খালাম্মা, এই উপিন্যাসটা শেষ কইরা লই!”
রূপা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সুলতানা তখন তাকে থামাল, বলল, “খালাম্মা তোমারেই গল্পের বই পড়তে দেন না! যদি আমারে গল্পের বই পড়তে দেখেন তাইলে এক্কেবারে হার্টফেল মারব!”
রূপা কিছু বলল না, কথাটা সত্যি। তার আম্মু যদি কখনো আবিষ্কার করেন সুলতানা বসে বসে গল্পের বই পড়ছে তা হলে সত্যি সত্যি ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। রূপা খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, “বুঝলে সুলতানা, বইয়ের মাঝে অনেক কিছু থাকে যেটা অন্য কোথাও থাকে না। আম্মু যখন আমাকেও বকাবকি করে তখন মনটা খুব খারাপ হয়। তারপর আমি যখন একটা ভালো বই পড়ি তখন মনটা আবার ভালো হয়।”
সুলতানা মন দিয়ে কথাটা শুনল তারপর বলল, “কী থাকে তোমার বইয়ের মাঝে?”
“কত কিছু!”
“বল দেখি একটা।”
রূপা তখন তার প্রিয় একটা বইয়ের একটা গল্প শোনাল। যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া একটা বাচ্চা মেয়ের গল্প। সুলতানা চুপ করে পুরোটি শুনল। গল্প শেষ হবার পর সে তার ওড়না দিয়ে চোখ মুছে একটা নিশ্বাস ফেলল। ঠিক তখন ড্রয়িংরুমে হিন্দি সিরিয়াল শেষ হয়ে বিজ্ঞাপন শুরু হয়ে যায়। সুলতানা সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠে রান্নাঘরে ছুটে গেল। তাকে রূপার ঘরে দেখলে বিপদ হতে পারে।
.
খাবার টেবিলে বসেও সিরিয়াল নিয়ে আলোচনা হতে থাকে। আম্মা বললেন, “দমন্তী কী নিষ্ঠুর দেখেছ? আনিলার সাথে কী খারাপ ব্যবহার করল!”
আব্বু বললেন, “হ্যাঁ। মানুষ বলেই গণ্য করে না।”
আপু বলল, “জাসিন্দর কিছু বলে না কেন?”
আম্মু বললেন, “একেবারে ভীতুর ডিম। মেরুদণ্ড বলে কিছু নাই।”
আব্বু পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন, “সামাজিক একটা স্ট্যাটাস আছে তো-সেখান থেকে বের হতে পারছে না। জাসিন্দরের মনটা কিন্তু ভালো কিন্তু নিজের ফ্যামিলিকে আপসেট করতে চায় না।”
আম্মু প্লেটে খাবার নিতে নিতে বললেন, “এই সিচুয়েশানে যদি অভিক থাকত–তা হলে দেখতে কত সুন্দর করে পুরো বিষয়টা সামলে নিত–”
রূপা অবাক হয়ে একবার তার আব্বু আরেকবার তার আম্মুর মুখের দিকে তাকাতে লাগল–এরকম বড় বড় মানুষ হিন্দি সিরিয়ালের চরিত্রগুলো নিয়ে এইভাবে কথা বলতে পারে তার নিজেরও বিশ্বাস হতে চায় না।
খাবার মুখে দিয়ে হঠাৎ করে আম্মুর ভালো মেজাজ গরম হয়ে উঠল, হুংকার দিয়ে বললেন, “সুলতানা”
সুলতানা ভয়ে ভয়ে কাছে এসে দাঁড়াল, “জে খালাম্মা–”
আম্মু সবজিটা দেখিয়ে বললেন, “এটা কী?”
সুলতানা ঢোক গিলে বলল, “কেন খালাম্মা? কী হইছে?”
আম্মু চিৎকার করে বললেন, “দেশে লবণ পাওয়া যায় না? তরকারিতে লবণ দিসনি কেন?”
রূপা সবজিটা মুখে দিয়ে দেখল, লবণ একটু কম হতে পারে কিন্তু লবণ দেয়নি কথাটা সত্যি না।
রূপার মনে পড়ল আম্মুর ব্লাড প্রেশার ধরা পড়েছে তাই ডাক্তার বলেছে খাবারে লবণ কম থাকতে হবে সেই জন্যে মাত্র গতকাল আম্মু সুলতানাকে সেই বিষয়ে লেকচার দিয়েছেন। মনে হয় সুলতানা সেই জন্যেই সবজিতে লবণ একটু কম দিয়েছে। আম্মু আবার চিৎকার করলেন, “কেন লবণ দিসনি?”
সুলতান বলল, “দিছি তো। একটু কম দিছি–আপনি কালকে বললেন, একটু কম দিতে–”
“আমি কম দিতে বলেছি, না দিতে তো বলিনি। বলেছি?” আম্মুর মেজাজ আরো গরম হয়ে গেল, “বদমাইশ কোথাকার! কত বড় সাহস আবার আমার সাথে মুখে মুখে কথা বলিস? ছোটলোকের ঝাড়, এই বাসায় তোরে ঢুকতে দেওয়াই ভুল হয়েছে। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতি না খেয়ে না দেয়ে মা-ভাই বোন নিয়ে ঘরে ঘরে ভিক্ষা করে বেড়াতি, মানুষের লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বড় হতি তা হলে একটা উচিত শিক্ষা হত।”
সুলতানা একটা কথাও না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এতে মনে হয় আম্মুর রাগ আরো বেড়ে গেল, হাত বাড়িয়ে খপ করে সুলতানার চুল ধরে নিজের কাছে টেনে এনে একটা ঝাঁকুনি দিলেন তারপর ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। সুলতানা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়তে পড়তে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। ফ্যাকাসে মুখে সে সবার দিকে তাকাল, রূপা দেখল ঠোঁট কামড়ে সে অনেক কষ্টে চোখের পানি সামলানোর চেষ্টা করছে।
আন্ধু বললেন, “হয়েছে হয়েছে, এখন ছেড়ে দাও। এমনিতেই তোমার ব্লাড প্রেশার, তোমার এত উত্তেজিত হওয়া ঠিক না।”
“আমার কী এমনি এমনি ব্লাড প্রেশার হয়েছে? এই ছোটলোকের বাচ্চাদের সাথে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ক্যাট ক্যাট ক্যাট ক্যাট করতে করতে আমার ব্লাড প্রেশার হয়েছে। এরা দায়ী। এরা–”
রূপা প্লেটে তার খাবারগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগল, তার ইচ্ছে করছিল খাওয়া বন্ধ করে উঠে যায় কিন্তু তা হলে অবস্থা মনে হয় আরো খারাপ হয়ে যাবে। সুলতানার সাথে সাথে তাকেও মনে হয় এক হাত নিয়ে নিবে।
