তখন তিয়াশা বলল, “আম্মু লেখাপড়ার স্টাইল বদলে যাচ্ছে। আগে স্কুল ছিল ভয়ের জায়গা-এখন হবে আনন্দের জায়গা–”
আম্মু রূপাকে দুই চোখে দেখতে পারেন না। তার ভালো কথাটিও শুনতে চান না, কিন্তু তিয়াশা হচ্ছে আম্মুর প্রিয় মানুষ। তিয়াশার কথাকে আম্মু একটু হলেও গুরুত্ব দেন, তাই আম্মু তিয়াশার কথাটা শুনলেন তারপর গজগজ করতে লাগলেন, “এইটা কী হল? স্কুলে ছেলেমেয়ে পাঠাই যেন তারা লেখাপড়া শিখে আসবে, আদব-কায়দা শিখে আসবে–এখন দেখছি স্কুল হয়ে যাচ্ছে রং-তামাশার জায়গা, ঢংয়ের জায়গা।”
রূপা আবার চেষ্টা করল, “আসলে ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহ দিলে তারা নিজেরা শেখে–”
আম্মু মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “কোনোদিন শেখে না। শেখাতে হয় পিটিয়ে। বেত দিয়ে পিটিয়ে ছাল তুলে দিতে হয়। আমরা যখন স্কুলে পড়েছি তখন আমাদের এক স্যার ছিলেন এক চড়ে আমাদের ফার্স্ট গার্লের কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। স্যারের কী তেজ ছিল, সিংহের মতোন।” সিংহের তেজওয়ালা স্যারের কথা চিন্তা করে এতোদিন পরেও আম্মুর চোখ-মুখ শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে চকচক করতে থাকে।
রূপার ইচ্ছে হল বলতে, এখন এরকম হলে সিংহের তেজওয়ালা স্যারকে পুলিশে ধরে নিয়ে হাজতে আটকে ফেলবে। কিন্তু তার বলার সাহস হল না। রূপার প্রজেক্ট নিয়ে আরো আলোচনা হল আর শেষ পর্যন্ত আম্মু মেনে নিলেন। ঠিক হল মাঝে মাঝে প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করার জন্যে তার বন্ধু-বান্ধবরা ছুটির পর কিংবা ছুটির দিনে আসতে পারবে। সে নিজেও যেতে পারবে, কিন্তু কবে কোথায় কখন কতক্ষণের জন্যে যাবে সেটা আগে থেকে বলে যেতে হবে। আর এই ধরনের কাজ-কর্মের জন্যে যদি লেখাপড়ায় ক্ষতি হয় কিংবা অন্য কোনোরকম সমস্যা হয় তা হলে তার ফল হবে ভয়ানক।
“অন্য কোনোরকম সমস্যা” বিষয়টা কী সেটা আম্মু পরিষ্কার করলেন না কিন্তু তার চোখ-মুখ দেখেই রূপা আন্দাজ করে নিল সেটা কী হতে পারে। রূপা অবশ্যি এই হুমকিতে মোটেও ভয় পেল না, প্রথমবার বাসা থেকে স্বাধীনভাবে বন্ধু-বান্ধবের বাসায় যেতে পারবে সেটা চিন্তা করেই আনন্দে তার নাচানাচি করার ইচ্ছা করছিল।
কিন্তু সে তার আনন্দটা মোটেও কাউকে বুঝতে দিল না, গম্ভীর মুখে খেতে লাগল।
০৫-৮. রাজুর মুখে হাসি
দরজা খুলে রূপাকে দেখে রাজুর মুখে বিশাল একটা হাসি ফুটে উঠল। প্রায় চিৎকার করে বলল, “রূপা! তুমি চলে এসেছ!”
রূপা বলল, “তুমি এত অবাক হচ্ছ কেন? আমাদের সবারই তো আজকে আসার কথা!”
রাজু মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি। আমি অবাক হইনি। আমি খুশি হয়েছি। আসো, আসো।–”
রাজু দরজা বন্ধ করতে করতে চিৎকার করে বলল, “আম্মু, দেখে যাও আমাদের রূপা চলে এসেছে।”
রূপা তার বাসার সাথে পার্থক্যটা ধরতে পারল, সে কোনোদিন তার আম্মুর সাথে এই ভাষায় কথা বলতে পারবে না।
রাজুর আম্মু উঁকি দিলেন, চশমা চোখে হাসিখুশি একজন মহিলা, চুলের মাঝখানে খানিকটা অংশ সাদা! তার আম্মুরও চুলে পাক ধরেছে, আম্মু অনেকখানি খাটাখাটুনি করে রং দিয়ে সেটা কালো রাখার চেষ্টা করেন। রাজুর আম্মুর পাকা চুল নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই বলে মনে হল।
রাজুর আম্মু হাসিমুখে বললেন, “এসো মা এসো! রাজুর মুখে তোমাদের কথা শুনি, তোমাদের এখনো সামনা-সামনি দেখা হয়নি।”
রূপা হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল, ঠিক কী বলবে বুঝতে পারল না। রাজু তাদের সম্পর্কে কী বলে কে জানে।
রাজু বলল, “বুঝলে আম্মু আমাদের রূপা হচ্ছে স্যার-ম্যাডামদের ত্রাস।”
“ত্রাস?” রাজুর আম্মু চোখ কপালে তুলে বললেন, “এই সুইট মেয়েটা ত্রাস হতে যাবে কোন দুঃখে?”
“আমাদের স্যার-ম্যাডামরা যদি ভুল-ভাল পড়ায় রূপা তখন কাঁক করে ধরে ফেলে! কাউকে ছাড়ে না।”
রাজুর আম্মু বললেন, “ওমা! স্যার-ম্যাডামরা ভুল পড়াবে কেন?
“পড়ায় আম্মু পড়ায়। তুমি জানো না।”
রাজুর আম্মু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “বুঝি না বাপু তোদের কথা। স্যার ম্যাডামেরা ভুল পড়ায় জন্মেও শুনিনি।” রাজুর আম্মু সুর পাল্টে বললেন, “পড়ালে পড়াক। তারা তাদের মতো পড়াবে, তোরা তোদের মতো শিখবি। তা হলেই তো ঝামেলা মিটে যায়। তাই না রূপা?”
রূপা মাথা নাড়ল। বলল, “জি। আমরা তাই করি। তা ছাড়া–”
“তা ছাড়া কী?”
“আমাদের স্যার-ম্যাডামেরা এত বোরিং, একটুও ক্লাশ করতে ইচ্ছে করে না। তাই যখন ভুল-ভাল পড়ান তখন ক্লাশটা ইন্টারেস্টিং হয়।”
রূপার কথা শুনে রাজুর আম্মু হি হি করে হাসতে লাগলেন যেন সে খুব একটা মজার কথা বলেছে। রূপা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল, সে তার নিজের আম্মুকে এরকম একটা কথা বলার কথা চিন্তাও করতে পারে না। আর যদি সে বলেও ফেলে তার আম্মু শুনে কোনোদিন এভাবে হি হি করে হেসে উঠবেন না। উল্টো তাকে বকে বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবেন।
রাজু বলল, “আম্মু আমরা আমার রুমে বসছি। তুমি একটা কিছু খেতে দেবে আমাদের?”
রূপা তাড়াতাড়ি বলল, “আমি বাসা থেকে খেয়ে এসেছি, আমার কিছু লাগবে না।”
“বাসা থেকে তো খেয়েই আসবে, তাই বলে এখানে কিছু খাবে না?” রাজুর আম্মু বললেন, “তোমাদের বাড়ন্ত শরীর, এখন অনেক খেতে হবে।”
রাজুর পিছু পিছু রূপা তার ঘরে গেল, বাসাটা একটু এলোমেলো, বড়লোকদের এক ধরনের সাজানো-গোছানো বাসা থাকে যেখানে মনে হয় কিছু ধরা যাবে না, ধরলেই কিছু একটা পড়ে ভেঙে যাবে, এখানে সেরকম কিছু নেই। বাসাটার মাঝে কেমন যেন শান্তি শান্তি ভাব। প্রত্যেকটা ঘরে বড় বড় বইয়ের তাক, সেই তাক ভর্তি শুধু বই আর বই। দেখে মনে হয় এটা বুঝি কারো বাসা না, এটা বুঝি একটা লাইব্রেরি।
