রূপা বলল, “বাবারে বাবা! তোমাদের বাসায় কত বই!”
রাজু বলল, “বেশি না কি?”
“হ্যাঁ। অনেক বেশি, কারো বাসায় এত বই থাকে না।”
“বেশিরভাগই অখাদ্য! পড়া যায় না, কঠিন কঠিন প্রবন্ধ। আব্বু-আম্মু পড়ে যে কী মজা পায় কে জানে!”
রাজুর ঘরের মেঝেতে বসে তার ছোট ভাই-বোন খেলছিল, তাদের দেখে মুখ তুলে তাকাল, একজনের ফোকলা দাঁত, সে ফোকলা দাঁত বের করে হাসল। তার ভাই-বোনের সাথে রাজুর চেহারার মিল নেই, রাজুর এত ছোট ভাই-বোন আছে সে জানত না। তার একজন আঁতেল ধরনের বড় বোন আছে সেটাই শুধু শুনেছে।
ফোকলা দাঁতের ভাইটি একটা কাগজের প্লেন তৈরি করছিল, রাজুকে দেখিয়ে বলল, “ভাই দেখো, প্লেন।”
“ভেরি গুড।”
“এটা কী উড়বে ভাই?”
“উড়িয়ে দেখো।”
রূপা লক্ষ করল সে যে শুধু ক্লাশে তাদের সাথে তুমি তুমি করে কথা বলে তা নয়, ছোট ভাই-বোনদের সাথেও তাই করে।
ছোট ভাই প্লেনটা ছুঁড়ে দিল, নাক নিচের দিকে দিয়ে সেটা ডাইভ দিয়ে পড়ে গেল। ছোট বোনটি আনন্দে হাততালি দিল, “উড়ে না! উড়ে না!”
রাজু টেবিল থেকে দুইটা কাগজ হাতে দিয়ে বলল, “আবার বানাও-বানিয়ে বারান্দায় উড়াও। যাও।”
ভাই-বোন দুজন বাধ্য ছেলেমেয়ের মতো কাগজ হাতে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে বের হয়ে যাচ্ছিল, রাজু থামাল, বলল, “কী হল? আমাদের বাসায় একজন গেস্ট আছে তাকে কিছু বললে না?”
সাথে সাথে দুইজন কপালে হাত দিয়ে বলল, “স্লামালিকুম আপু।”
“ওয়ালাইকুম সালাম। তোমাদের কী নাম?”
ফোকলা দাঁত বলল, “আমার নাম ইদরিস আর ওর নাম জাহানারা।”
“ভেরি গুড।” রূপা মাথা নাড়ল, সে ভেবেছিল রাজুর ছোট ভাই-বোনের নাম আরো আধুনিক হবে। রূপম আর মৌমিতা কিংবা অনিক আর মৌটুশী।
বাচ্চা দুইজন চলে যাবার পর রাজু এদিক-সেদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “ভালো হয়েছে তুমি আগে এসে গেছ। মিম্মি আর সঞ্জয় আসার পর সোহেলের ব্যাপার নিয়ে কথা বলা যাবে না।”
“কী খবর সোহেলের?”
“ভালো না।”
“কেন, কী হয়েছে?”
“দেখে কেমন যেন ভয় লাগে। আমাদের ক্লাশের ছেলে কিন্তু মনে হয় চিনি না। বাসা থেকে সকালবেলা স্কুলে যাবার কথা বলে বের হয়ে যায় বই-খাতা হাতে নিয়ে। স্কুলে আসে না, কোথায় কোথায় জানি ঘুরে বেড়ায়।”
“এখন কী করব?”
“সেইটাই তো চিন্তা করে পাচ্ছি না। বড় কোনো মানুষের সাথে কথা বলব কী না বুঝতে পারছি না।”
রূপা জিজ্ঞেস করল, “বড় কোন মানুষ?”
“বড় আপু।”
“তোমার বড় আপু কত বড়?”
“মেডিকেলে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বড় আপু মহা আঁতেল। তাকে বললেই সে একটা আঁতেল আইডিয়া নিয়ে আসবে।”
“তা হলে আর কে আছে বড়?”
“আবু-আম্মু।”
রূপা অবাক হয়ে তাকাল, “তুমি বলতে পারবে?”
“কেন পারব না? আব্বু-আম্মু ঠিক ঠিক বলতে পারবে, কিন্তু—”
”কিন্তু কী?”
”আবু-আম্মু, আপু এদেরকে বলতে চাই না।”
রূপা মাথা নাড়ল, সে বুঝতে পারছে কেন রাজু বাসায় কাউকে বলতে চায়। সোহেল তাদের ক্লাশের ছেলে তার সম্পর্কে এরকম একটা কথা বলা অনেকটা নিজেদের সম্পর্কে বলার মতো। রূপা একটু চিন্তা করে বলল, “বিজ্ঞান ম্যাডামকে বললে কেমন হয়?”
রাজু মাথা নাড়ল, “আমিও চিন্তা করছিলাম। কিন্তু ম্যাডাম তো মাত্র এসেছেন এখনই বলতে কেমন লাগে।”
“তা ঠিক।”
রাজু বলল, “আমি কী ভাবছিলাম জান?”
“কী?”
“আমরা নিজেরা ব্যাপারটা একটু ভালো করে দেখি। লুকিয়ে সোহেলের পিছু পিছু ঘুরে ঘুরে দেখি সে কোথায় যায়, কার সাথে মেশে। কী করে। তারপর না হয় বড়দের সাথে কথা বলব।”
“এখন ব্যাপারটা শুধু তুমি আর আমি জানি। আমরা কী এইটা আর কাউকে বলব না? মিম্মিকে? সঞ্জয়কে?”
রাজু হি হি করে হাসল, “মিম্মিকে বলা আর পত্রিকায় হেডলাইন দিয়ে ছাপিয়ে ফেলা তো একই ব্যাপার!”
“কিন্তু আমরা পাঁচজন এক গ্রুপে, আমাদের আগে হোক পরে হোক বলতে তো হবেই। যদি এরা পরে জানে আমরা জেনেও তাদেরকে বলিনি তা হলে খুব রাগ হবে।”
রাজু মাথা নাড়ল, বলল, “তা ঠিক।”
রূপা বলল, তুমি অবশ্যি ঠিকই বলেছ, আমাদের ব্যাপারটা আরো ভালো করে বোঝা দরকার। সোহেল কী ড্রাগ খায়, সেই ড্রাগ খেলে কী হয় এইসব।”
রাজু মাথা নাড়ল, দুইজনে বসে আরো কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করল কিন্তু কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পেল না। তারা অবশ্যি খুব বেশিক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করতে পারল না, প্রথমে সঞ্জয় তারপর মিম্মি এসে হাজির হল। সঞ্জয় বাসা বোঝাই বইগুলো দেখে বলল, “এতগুলো বই! কোনটা কোথায় আছে কেউ জানে?”
রাজু হাসল, “জানবে না কেন? গল্পের বই এক জায়গায়, কবিতার বই এক জায়গায়, মুক্তিযুদ্ধের বই এক জায়গায়
“যদি একটা বই এই হাজার হাজার বইয়ের মাঝে হারিয়ে যায় তখন কী করবে?”
“হারাবে কেন?”
“মনে কর কবিতার একটা বই কেউ প্রবন্ধের বইয়ের সাথে রেখে দিল-তখন কী হবে?”
“কী আর হবে?”
সঞ্জয় চোখ বড় বড় করে বলল, “তোমাদের কখনো হয়নি যে একটা বই সকালবেলা খোঁজা শুরু করেছ, সারাদিন খুঁজেও পাওনি?”
“সবসময় হয়। আমাদের বাসার এইটা হচ্ছে খুবই সাধারণ ঘটনা। কেউ না কেউ কিছু না কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। একজন আরেকজনকে দোষ দিচ্ছে!”
মিম্মি সরু চোখে রাজুর ছোট ভাই-বোন দুইজনকেই খুব ভালো করে লক্ষ করল। তারপর রূপার কাছে এসে গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “বুঝলি, রূপা–এই দুইটা বাচ্চা আসলে-”
