লিজা বলল, “এইডস ম্যাডাম।”
“হ্যাঁ। সেটা যথেষ্ট ভয়ংকর–আমি অবশ্য এইডসের কথা বলছিলাম না। আমি আরো সাধারণ বিষয়ের কথা বলছিলাম-লেখাপড়া সংক্রান্ত”
সবাই মাথা চুলকাতে থাকে তখন ম্যাডাম নিজেই বললেন, “সারা পৃথিবীতে বিজ্ঞান পড়ায় ছাত্র-ছাত্রীরদের আগ্রহ কমে গেছে। আমাদের দেশেও কমেছে। বড় বড় দেশে অনেক রকম সুযোগ-সুবিধা। তারা গরিব দেশের মেধাবী বিজ্ঞানের ছাত্রদের টাকা-পয়সার লোভ দেখিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে আসবে। অবস্থার সামাল দিয়ে দেবে। আমরা কী করব?”
সঞ্জয় বলল, “আমাদের দেশের কাউকে বিদেশ যেতে দেব না। দড়ি দিয়ে পা বেঁধে রাখব।” কথা শেষ করে সে আনন্দে দাঁত বের করে হি হি করে হাসল।
ম্যাডাম হাসলেন, বললেন, “সেটা একটা সমাধান হতে পারে। সেটা করার জন্যে তোমাকে দড়ি নিয়ে স্কুলে স্কুলে, কলেজে কলেজে আর ইউনিভার্সিটিতে ইউনিভার্সিটিতে ঘুরে বেড়াতে হবে।”
সবাই হি হি করে হেসে উঠল। ম্যাডাম বললেন, “তার চেয়ে সহজ সমাধান হবে অনেক বেশি ছেলেমেয়েদেরকে বিজ্ঞান পড়ানোতে আগ্রহী করা। সেটা কীভাবে করা যাবে?”
লিজা বলল, “বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে।”
“উঁহু। জোর করে লেখাপড়া করানো যায় না।”
মিম্মি বলল, “যারা বিজ্ঞান পড়বে তাদের সবাইকে একটা করে মোবাইল ফোন দিলেই সবাই চলে আসবে!”
ম্যাডাম হাসলেন, বললেন, “না। লোভ দেখিয়েও লেখাপড়া করানো যায় না।”
রূপা বলল, “সবাইকে সায়েন্স ফিকশন পড়ালে-”
ম্যাডাম একটু ইতস্তত করে বললেন, “সায়েন্স ফিকশন তো আসলে ফিকশান-মানে গল্প! সেটা পড়লে কতটুকু লাভ হবে বুঝতে পারছি না। তবে সায়েন্স বা বিজ্ঞানের আগ্রহ যদি ছোট থাকতে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তা হলে বড় হলে তারা মনে হয় সায়েন্স নিয়ে পড়বে। আমি সেই মিশন নিয়ে এসেছি।”
সঞ্জয় বলল, “গুড মিশন!”
ম্যাডাম বললেন, “থ্যাংকু!”
রূপা জিজ্ঞেস করল, “বিজ্ঞানের আগ্রহ তৈরি করার জন্যে কী করবেন ম্যাডাম?”
“ক্লাশের সবাইকে নিয়ে অনেকগুলো বিজ্ঞানের প্রজেক্ট করব। মজার মজার প্রজেক্ট। আমার ধারণা নিজের হাত দিয়ে যখন সবাই মজার মজার বিজ্ঞানের প্রজেক্ট তৈরি করবে তখন অনেকেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে।”
“আমাদের কী কী প্রজেক্ট হবে ম্যাডাম?
“অনেক প্রজেক্ট। মনে করো আমরা টেলিস্কোপ তৈরি করতে পারি, মাইক্রোস্কোপ তৈরি করতে পারি, সোলার কার তৈরি করতে পারি, রোবট তৈরি করতে পারি, রকেট তৈরি করতে পারি, আরো কত কী!–”
মাসুক লাফ দিয়ে উঠে বলল, “আমি রোবট বানাতে চাই ম্যাডাম!”
ম্যাডাম হাসলেন, বললেন, “ভেরি গুড! তবে একজন তো পারবে না, তাই কয়েকজন মিলে একটা গ্রুপ তৈরি করতে হবে। ক্লাশটাকে অনেকগুলো গ্রুপে ভাগ করে দিই।”
রূপা জানতে চাইল, “এক গ্রুপে কতজন থাকবে?”
“চার থেকে পাঁচজন।”
“কারা কারা থাকবে গ্রুপে?”
“নিজেরা ঠিক করে নাও।”
সবার আগে লিজা দাঁড়িয়ে বলল, “আমার গ্রুপে থাকব আমি, তাহিরা, মৌমিতা, টুশকি আর বীথি।”
ম্যাডাম মাথা নাড়লেন, “উঁহু। শুধু মেয়েরা মেয়েরা গ্রুপ তৈরি করা যাবে না। মিলেমিশে করতে হবে। গ্রুপে ছেলেমেয়ে থাকবে। হিন্দু-মুসলমান থাকবে। চিকন-মোটা থাকবে। লম্বা-খাটো থাকবে। শান্ত-রাগী থাকবে। দুষ্টু-মিষ্টি থাকবে!”
ম্যাডামের কথার ভঙ্গি দেখে সবাই হেসে ফেলল। তারপর সবাই নিজেরা নিজেরা কথা বলে গ্রুপ তৈরি করল। রূপা রাজুর সাথে কথা বলে একটা গ্রুপ তৈরি করল, সেই গ্রুপের মাঝে থাকল রূপা, রাজু, সঞ্জয়, মিম্মি আর সোহেল। আজকে ক্লাশে সোহেল নাই কিন্তু তাতে ম্যাডাম আপত্তি করলেন না। প্রত্যেকটা গ্রুপের একটা নাম দিতে হবে–ম্যাডাম সবাইকে পরের দিন নিজের গ্রুপের জন্যে একটা সুন্দর নাম ঠিক করে আনতে বললেন।
দেখা গেল গ্রুপের নাম ঠিক করা এত সহজ না। নাম ঠিক করতে গিয়ে লিজাদের গ্রুপ নিজেদের মাঝে ঝগড়া করে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, মাসুকের গ্রুপের মাঝে মারামারি হয়ে গেল। রূপাদের কম সমস্যা হল না, সঞ্জয় বলল নামটা হতে হবে মজার। মজার নাম হিসেবে সে ঠিক করল টুং টিং টাং! মিম্মি বলল যেহেতু এটা বিজ্ঞান সংক্রান্ত তাই নামের মাঝে একটা বিজ্ঞান বিজ্ঞান ভাব। থাকা দরকার, সে নাম দিল মিমিট্রন।
মিমিন্টুন নাম শুনে সঞ্জয় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। চিৎকার করে বলল,
“মিমিট্রন? নিজের নাম দিয়ে গ্রুপের নাম? তা হলে সঞ্জয়ট্রন না কেন?”
মিম্মি বলল, “আমি মোটেও নিজের নাম দিয়ে নাম দেইনি। আমার নাম মিমি না আমার নাম হচ্ছে মিম্মি! এখানে মি এসেছে মিল্কিওয়ে থেকে।”
রূপা বলল, “তা হলে নাম রেখে দিই মিল্কিওয়ে!”
মিম্মি বলল, “উঁহু। মিল্কিওয়ে শব্দের মাঝে দুধ দুধ ভাব। মনে হবে আমরা গরুর ফার্ম।”
“তা হলে বাংলায় ছায়াপথ। ছায়াপথ অনেক সুন্দর নাম।”
মিম্মি ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগল, “কেন? তোদের মিমিট্রন নামে আপত্তি কী? কী সুন্দর বৈজ্ঞানিক একটা নাম, মি-মি-ট্র-ন!”
রূপা, মিম্মি আর সঞ্জয় যখন নিজেদের মাঝে ঝগড়াঝাটি করছে তখন রাজু তার খাতায় কী কী যেন লিখছিল। রূপা একসময় ঝগড়ায় একটু বিরতি দিয়ে রাজুকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী করছ?”
“আমাদের টিমের নাম বের করার চেষ্টা করছি।”
মিম্মি জিজ্ঞেস করল, “কী বের করেছ?”
“একটা কাজ করলে কেমন হয়? আমাদের পাঁচজনের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে একটা নাম তৈরি করি।”
