.
০৪.
সোহেলকে নিয়ে কী করা যায় কিংবা আসলেই কিছু করা সম্ভব কী না সেটা নিয়ে রূপা আর রাজু চিন্তা করছিল। সমস্যা হচ্ছে বিষয়টা নিয়ে নিরিবিলি যে দুইজন একটু কথা বলবে তারও কোনো সুযোগ পাচ্ছিল না। স্কুল শুরু হওয়ার পর সারাদিন ক্লাশ, ছুটির পর রূপাকে বাসায় যেতে হয়। দুইজনে পরামর্শটা করবে কীভাবে?
কিন্তু সমস্যাটা সমাধান হয়ে গেল হঠাৎ করে। ব্যাপারটা ঘটল এভাবে :
স্কুলে যে কয়জন স্যার আর ম্যাডাম আছেন তার মাঝে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছেন বিজ্ঞান স্যার। দেশে না কী আইন করা হয়েছে স্কুলে ছেলেমেয়েদের পিটানো যাবে না কিন্তু বিজ্ঞান স্যারের সেটা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই, ক্লাশে এসে যখন খুশি তখন ছেলেমেয়েদের গায়ে হাত তোলেন। এই স্যারের মার খেয়েই সোহেল ক্লাশে আসা ছেড়ে দিয়েছে।
সেদিন মাত্র ইংরেজি ক্লাশ শেষ হয়েছে, বিজ্ঞান ক্লাশ শুরু হবে। স্যার পরমাণুর গঠনের উপর একটা হোমওয়ার্ক করতে দিয়েছিলেন সবাই সেটা হাতে নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে বসে আছে। এই স্যারের ক্লাশে একটা আতঙ্কের মাঝে সময় কাটে, যখন খুশি স্যার যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারেন। ভালো করে লেখাপড়া করে এলেও কেউ এই স্যারের ক্লাশে নিরাপদ না।
সবাই যখন নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে তখন দেখা গেল বিজ্ঞান স্যারের বদলে ছোটখাট হাসিখুশি একজন মহিলা ক্লাশে উঁকি দিলেন। মাথা ঢুকিয়ে বললেন, “ক্লাস এইট, সেকশান বি?”
ক্লাশের ছেলেমেয়েরা মাথা নাড়ল, “জি ম্যাডাম!”
ম্যাডাম ক্লাশে ঢুকলেন। হাতে একটা বই ছিল সেটা টেবিলে রাখলেন তারপর ক্লাশের সবার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকালেন। সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল, কেউ এখনো বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে, বিজ্ঞান স্যার কোথায় গেলেন, তার বদলে এই ম্যাডাম কোথা থেকে এলেন?
ম্যাডাম বললেন, “আমি তোমাদের নতুন বিজ্ঞানের ম্যাডাম।”
সবাই বুকের ভেতর থেকে আটকে থাকা বাতাসটুকু কোনোভাবে বের করল, কিন্তু এখনো বুঝতে পারছিল না। এটা আসলেই বিশ্বাস করা ঠিক হবে কী না। মাসুক বলল, “পাকাঁপাকি?”
ম্যাডাম হেসে ফেললেন, জিজ্ঞেস করলেন, “পাকাঁপাকি মানে?”
“মানে আপনি এখন থেকে সবসময় বিজ্ঞান পড়াবেন?”
“হ্যাঁ।”
সাথে সাথে ক্লাশের সবাই আনন্দের মতো একটা চিৎকার করল। ম্যাডাম হাত তুলে থামানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, “আস্তে আস্তে! তোমাদের হয়েছে কী? এত চিৎকার করছ কেন?”
সঞ্জয় বলল, “ম্যাডাম আপনি জানেন না বিজ্ঞান স্যার আমাদের উপর কত অত্যাচার করতেন। পিটিয়ে আমাদের বারোটা বাজিয়ে দিতেন। আমাদের
ম্যাডাম হাত তুলে সঞ্জয়কে থামালেন, বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও! আমি প্রথম দিন এসেই অন্য স্যারের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে চাই না।”
ক্লাশের ছেলেমেয়েরা বলতে লাগল, “শুনতে হবে। শুনতে হবে।”
“না, শুনব না।” ম্যাডাম মুখটা একটু শক্ত করে বললেন, “তার চাইতে আমি কী বলি তোমরা সেটা শুনো।”
শেষ পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা শান্ত হল। ম্যাডাম তখন সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোমাদের স্কুলে নতুন এসেছি। আমি বিজ্ঞানের শিক্ষক, কোনো একটা ক্লাশে আমার বিজ্ঞান পড়ানোর কথা। আমাকে উঁচু ক্লাশে দিতে চেয়েছিল আমি রাজি হইনি।”
মিম্মি জিজ্ঞেস করল, “কেন রাজি হননি ম্যাডাম?”
“তা হলে সিরিয়াসলি পড়াতে হবে। আমার সিরিয়াসলি পড়াতে ভালো লাগে।”
সবাই আবার আনন্দের শব্দ করল। ম্যাডাম অবাক হয়ে বললেন, “তোমরা এরকম চিৎকার করছ কেন?”
মাসুক বলল, “আনন্দে।
“কীসের আনন্দে?”
“আপনি পড়াবেন না, সেই আনন্দে।”
“আমি মোটেও বলিনি তোমাদের পড়াব না।”
সঞ্জয় দাঁত বের করে হেসে বলল, “বলেছেন ম্যাডাম। বলেছেন।”
“আমি বলেছি আমার সিরিয়াসলি পড়াতে ভালো লাগে না।”
“একই কথা ম্যাডাম!”
“না। মোটেও একই কথা না। আমি তোমাদের পড়াব, তবে অন্যরকমভাবে পড়াব।”
রূপা জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে পড়াবেন?”
“একটু অন্যরকমভাবে। যখন শুরু করব তখন দেখবে। এখন একটা অন্য কাজ করা যাক।”
“কী কাজ ম্যাডাম?”
“এই যে ক্লাশ রুম, এটা খুবই বোরিং। ক্লাশ রুমটা একটু অন্যরকম করে ফেলি!”
সবাই আবার আনন্দের শব্দ করল। মিম্মি জিজ্ঞেস করল, “অন্য কী রকম?”
ম্যাডাম ক্লাশের চারদিকে তাকালেন, তারপর মনে মনে কী একটা হিসাব করলেন তারপর বললেন, “বেঞ্চগুলো ঠেলে দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দিই। তা হলে মাঝখানে ফাঁকা জায়গা হবে। সেখানে দাঁড়িয়ে সবার সাথে কথা বলা যাবে!”
সঞ্জয় দাঁত বের করে হাসল, বলল, “কী মজা হবে।”
ম্যাডাম বলল, “চল তা হলে করে ফেলা যাক!”
“চলেন ম্যাডাম।” বলে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে বেঞ্চগুলো ঠেলে ঠেলে চারপাশে দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মাঝেই ক্লাশরুমটাকে সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগতে থাকে, ফাঁকা এবং ভোলামেলা! ম্যাডাম চারদিকে তাকালেন, খুশি হয়ে মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, “ক্লাশ শেষ হবার পর আবার আগের মতো করে দিতে হবে কিন্তু!”
মাসুক বলল, “করে দেব ম্যাডাম। কোনো চিন্তা করবেন না।” মাসুক ক্লাশ ক্যাপ্টেন কাজেই তার কথাবার্তা অন্যরকম।
ক্লাশে সবাই গোল হয়ে ঘিরে বসে আছে, ম্যাডাম মাঝখানে। ঘুরে ঘুরে কথা বললেন, তাই ক্লাশটাকে মোটেও ক্লাশরুমের মতো মনে হয় না। ম্যাডাম বললেন, “সারা পৃথিবীতে খুব ভয়ংকর একটা ব্যাপার ঘটেছে। সেটা কী, কে বলতে পারবে?”
