রাজু জিজ্ঞেস করল, “কেন ঢুকতে দাও না?”
“এমনি।”
রাজু একটু কাছে গিয়ে বলল, “সোহেল, তুমি আমার কাছে একটু আসবে?”
সোহেল হঠাৎ করে কেন জানি মুখ শক্ত করে ফেলল, “কেন? আমি কেন তোমার কাছে যাব?”
“এমনি। একটু কাছে আস। আমার দিকে তাকাও।”
“আমি কেন তোমার দিকে তাকাব?” সোহেল হঠাৎ রেগে উঠল, অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কী তোদের আসতে বলেছি? তোরা কেন এসেছিস?”
রূপা বলল, “তুই এতদিন স্কুলে যাবি না আর আমরা তোর খোঁজ নিতে পারব না?”
“কে বলেছে খোঁজ নিতে? যা এখন। তোরা যা।”
রাজু অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা যাও।”
রূপা জিজ্ঞেস করল, “তুমি যাবে না?”
“আমি একটু পরে যাব।”
“না।” সোহেল চিৎকার করে বলল, “তুমিও যাও।” সে হাত তুলে চিৎকার করে বলল, “যা, তোরা যা। সবাই বের হয়ে যা।”
সবাই দেখল তার হাতটা কাঁপছে।
রাজু খুব শান্ত গলায় বলল, “রূপা, মিম্মি আর সঞ্জীব, তোমরা যাও। আমি সোহেলের সাথে একটু কথা বলে আসছি।”
সোহেল বলল, “আমি কারো সাথে কথা বলব না। না, বলব না।”
রাজু সোহেলের কথাকে গুরুত্ব দিল না, অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, “যাও। তোমরা যাও। বাসায় যাও।”
রূপা, মিম্মি আর সঞ্জয় ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বাইরের ঘরের দরজা খোলা, তারা বের হয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। রাস্তায় না ওঠা পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বলল না। খানিকক্ষণ চুপ করে হাঁটার পর সঞ্জয় বলল, “আজিব ব্যাপার। সোহেলের মাথা মনে হয় আউলে গেছে।”
আজিব বলে কোনো শব্দ নাই শব্দটা আজব, তারপরেও কেউ সেটা শুদ্ধ করে দিল না।
.
পরদিন ক্লাশে ঢুকে রূপা প্রথমেই রাজুকে খুঁজে বের করল। ক্লাশের পিছন দিকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় রাজু বসে বসে একটা গল্পের বই পড়ছে। রূপা কাছে গিয়ে ডাকল, “এই রাজু।”
রাজু বইটার পৃষ্ঠা ভাঁজ করে বইটা বন্ধ করল (পদ্মা নদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), রূপাকে জিজ্ঞেস করল, “কী রূপা?”
“কালকে কী হল?”
রাজু এদিক-সেদিক তাকাল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, “ভালো না।”
“কী হয়েছে?”
“খুব সিরিয়াস। এখন কাউকে বলা ঠিক হবে না। তোমাকে বলি।”
“বল।”
“সোহেল ড্রাগস ধরেছে।”
রূপা আঁতকে উঠল, “সর্বনাশ!”
“হ্যাঁ। দেখেই আমার সন্দেহ হচ্ছিল। আমি চোখের মণির দিকে দেখতে চাইছিলাম, ড্রাগ খেলে সেগুলো ফুলে যায় আমাকে কাছে আসতে দিচ্ছিল না মনে আছে?”
“হ্যাঁ। মনে আছে।”
“তোমরা চলে যাবার পর আমি চেপে ধরলাম, তখন স্বীকার করেছে। হাউমাউ করে কান্না।”
“কেন ড্রাগস ধরেছে?”
রাজু ভুরু কুঁচকে বলল, “ফ্যামিলিতে অশান্তি। বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, ছোট ভাইটাকে নিয়ে মা চলে গেছে। মন খারাপ, স্কুলে বন্ধু-বান্ধব নাই একা একা থাকে। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায় খারাপ খারাপ কিছু বন্ধু জুটেছে, তারা শিখিয়েছে। সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাওয়ার না কী এক নম্বর ওষুধ।”
“কী সর্বনাশ! এখন কী হবে?”
“আমি জানি না।”
রূপা জিজ্ঞেস করল, “ওকে বোঝাওনি?”
“বুঝিয়েছি। কিন্তু লাভ কী? এমন ড্রাগস আছে একবার খেলেই তুই আটকে যাবি আর ছুটে আসতে পারবি না। খেতেই হবে তোকে, খেতেই হবে।”
“কী ড্রাগস খায়?”
“জানি না। বুলবুলি না ভুলভুলি কী একটা নাম বলল। ছোট ছোট লাল-নীল ট্যাবলেট।”
“কোথা থেকে কিনে?”
“ওই যে তার রাস্তার বন্ধু। তারা দেয়।”
“টাকা পায় কোথায়?”
“বাসা থেকে চুরি করে।”
“ওর বাসার কেউ জানে না?”
রাজু মাথা নাড়ল, “কে জানবে? আছেই তো শুধু বাবা। বাবার কোনো কিছু নিয়ে মাথা ব্যথা নেই।”
“এখন কী করা যায়?”
রাজু তখন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন মিম্মি এসে জিজ্ঞেস করল, “তোরা কী নিয়ে গুজগুজ ফুসফুস করছিস?”
রূপা বলল, “তোকে নিয়ে।”
“আমাকে নিয়ে?”
রাজু হাসল, বলল, “না তোমাকে নিয়ে না। সোহেলকে নিয়ে।”
“কী হয়েছে সোহেলের? আমরা চলে আসার পর কথা বলেছে তোমার সাথে?”
“নাহ্!” রাজু মাথা নাড়ল, “বলেনি। আমার সাথে ঝগড়াঝাটি করল।”
মিম্মি মুখ শক্ত করে বলল, “সোহেলটা কত বড় বেয়াদব দেখেছিস? আমরা গিয়েছি তার খোঁজ নিতে, আর আমাদেরকে বাসা থেকে বের করে দিল। তোমার সাথে ঝগড়া করল।”
“আহা বেচারা। মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে সেই জন্যে মন খারাপ।”
“তাই বলে এরকম ব্যবহার করবে?”
রূপা বলল, “ছেড়ে দে। মন খারাপ হলে মানুষ কত কিছু করে।”
মিম্মি এদিক-সেদিক তাকাল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, “এদিকে কী হয়েছে জানিস?”
“কী হয়েছে?”
মিম্মি আরো গলা নামিয়ে ফেলল, প্রায় ফিসফিস করে বলল, “লিজা কী। করেছে জানিস?”
“কী করেছে?”
“তার তো ধারণা সে হচ্ছে বিশ্ব সুন্দরী। অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। সেইদিন একটা দোকানে গিয়েছে থ্রী-পিস কিনতে–”
মিম্মি তখন সবিস্তারে লিজাকে নিয়ে বিচিত্র একটা ঘটনার কথা বলতে শুরু করল, রূপা শোনার ভান করল, হুঁ হুঁ করল, মাথা নাড়ল, মাঝে মাঝে চোখে-মুখে অবাক হবার ভান করতে লাগল, কিন্তু তার মাথার মাঝে ঘুরপাক খেতে লাগল সোহেলের কথা। সোহেল হাতটা তুলে রেখেছে, হাতটা কাঁপছে কিছুতেই রূপা সেই দৃশ্যটা ভুলতে পারছে না। সোহেলের চোখে-মুখে এক ধরনের অস্থির অস্থির ভাব। তার দুই চোখের মাঝে বিচিত্র একটা দৃষ্টি। কী ছিল সেই দৃষ্টিতে?
রূপা হঠাৎ করে বুঝতে পারে সোহেলের দুই চোখে ছিল আতঙ্ক। ভয়ংকর আতঙ্ক।
