রাশা জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “জিজ্ঞেস না করলেই ভালো ম্যাডাম।”
“ঠিক আছে তাহলে জিজ্ঞেস করব না।”
“আম্মু অস্ট্রেলিয়া থেকে মাঝে মাঝে ভিউকার্ড পাঠান।”
“ও।” জাহানারা ম্যাডাম একটু থেমে বললেন, “আর তোমার নানি?”
“নানি খুব ভালো আছেন। আমার নানি খুব সুইট।”
“গুড! সবার জীবনে এক-দুইজন সুইট মানুষ থাকতে হয়।” রাশা একটু হেসে বলল, “আমার বন্ধুরাও সুইট।”
“চমৎকার! দ্যাটস ওয়ান্ডারফুল-” জাহানারা ম্যাডাম আরো কিছু বলতে চাইছিলেন কিন্তু ঠিক তখন মাইকে ঘোষণা করে সবাইকে তাদের জায়গায় বসতে বলা হলো, এক্ষুণি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে। জাহানারা ম্যাডাম তখন রাশাকে নিয়ে প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।
রাশা ভেবেছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে লম্বা, একজনের পর একজন বক্তৃতা দিতে থাকবে, সে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু সেরকম কিছুই হলো না, কয়েকজন ছেলেমেয়ে মিলে আমার সোনার বাংলা গান গাইল, তারপর কয়েকজন একটা খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ায়, একটা ব্যানারের ওপর অনেকগুলো গ্যাস বেলুন বেঁধে রাখা হয়েছে, সেটা ছেড়ে দেয়া হলো, একটা ঝাঁকড়া আমগাছের গা ঘেঁষে সেটা আকাশে উড়ে গেল, সবাই তখন জোরে জোরে হাততালি দিতে থাকে।
মাইকে তখন সবাইকে নিজেদের রুমে যেতে বলা হলো, কত রেজিস্ট্রেশন নম্বর কোথায় বসবে সেটা মাইকে বলে দিতে লাগল, কিন্তু কেউ সেটা শুনল না, সবাই নিজের মতো করে নিজেদের রুম খুঁজে বের করতে শুরু করে দিল।
রাশাও নিজের রুমটা খুঁজে বের করল, তার সিট পড়েছে দোতলায় বেঞ্চের এক কোনায়, ঠিক জানালার পাশে। দেখেই তার মনটা ভালো হয়ে যায়। জানালা দিয়ে নিচে একটা গলির মতো জায়গা দেখা যাচ্ছে, দুইপাশে ছোট ছোট টিনের ঘর। গলিতে একটা কমবয়সী মা ছোট একটা বাচ্চাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাশা গভীর মনোযোগ দিয়ে কমবয়সী মার্টিকে লক্ষ করে, একজন মানুষ যখন জানে না তখন তাকে এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করা মনে হয় অনুচিত কাজ। কিন্তু রাশা সেই অনুচিত কাজটি গভীর মনোযোগ দিয়ে করতে থাকল।
একসময় কিছু মানুষ এসে তাদের কিছু সাধারণ কথাবার্তা বলল, তারপর কী করা যাবে আর কী করা যাবে না সেই বিষয়ে কিছু উপদেশ দিল। তখন টং করে কোথায় জানি একটা ঘণ্টা পড়ল সাথে সাথে তাদের প্রশ্ন আর খাতা দিয়ে দেয়া হলো।
রাশা প্রশ্নটা মন দিয়ে পড়ে অবাক হয়ে গেল, ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, কিন্তু তার কাছে মনে হতে থাকে সে সবকয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। রাশা সোজা হয়ে বসে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে শুরু করে।
যারা প্রশ্নগুলো করেছে তারা নিশ্চয়ই অসম্ভব বুদ্ধিমান, প্রশ্নগুলো এমনভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গেছে যে কেউ যদি সত্যি সত্যি বিষয়টা বুঝে না থাকে কোনোভাবেই তার উত্তর দিতে পারবে না। শেষের প্রশ্ন দুটো সবচেয়ে মজার, প্রশ্নের শুরুতে নতুন একটা জিনিস তাদের শেখানো হয়েছে তারপর যেটা শেখানো হয়েছে সেটা থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে। সুপারনোভার বিস্ফোরণ কিভাবে হয় সে জানত না, এই প্রশ্ন পড়ে সেটা শিখেছে। শুধু যে শিখেছে তা নয়–সেটার একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। আরেকটা প্রশ্ন প্রোটিন নিয়ে, প্রথমে কেমন করে প্রোটিন তৈরি হয় সেটা বোঝানো হয়েছে, তারপর অ্যামিনো এসিড সম্পর্কে বলা আছে, সবশেষে কয়েকটা জিনের কোড, কোনটা প্রোটিন খুঁজে বের করতে হবে এমন মজার প্রশ্ন যে রাশা মুগ্ধ হয়ে গেল।
একসময় পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা পড়ল, পরিদর্শকরা খাতা নিতে আসছে। রাশা লক্ষ করল সে খাতার উপরে তার নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখতে ভুলে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি করে তার নাম লিখল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখল, নিচে স্কুলের নাম লিখতে হবে। আহাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় লিখতে গিয়ে রাশা থেমে যায়, এই খাতাটাতে সে কেমন করে একটা রাজাকারের নাম লিখবে, যেই রাজাকার তার নানাকে মেরেছে! রাশা কিছুক্ষণ চিন্তা করে স্কুলের নামটা না লিখেই তার কলমটা বন্ধ করল, সে তার এই হাত দিয়ে তার খাতায় একটা রাজাকারের নাম লিখতে পারবে না। তাছাড়া স্কুলের নামটা নিশ্চয়ই এত গুরুত্বপূর্ণ না, রেজিস্ট্রেশন নম্বরটা থেকেই সব কিছু বের করে ফেলতে পারবে।
রাশা ক্লাসঘর থেকে বের হয়ে আসতে থাকে, তার ঠিক সামনে দিয়ে দুজন হেঁটে যাচ্ছে, তাদের কথা শুনতে পেল। একজন বলল, “প্রশ্নের কোনো মাথামুণ্ডু নাই!”
অন্যজন বলল, “মানুষগুলোর আক্কেল বলে কিছু নাই! প্রশ্নের মাঝে আমাদের জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করেছে। দেখেছিস?”
“আরে বাবা, কার এত সময় আছে বসে বসে পড়ার? কী জিজ্ঞেস করার আছে ঝটপট জিজ্ঞেস কর, উত্তর দিই।”
“এই রকম পাগলামির মাঝে আমি আর নাই। খালি খালি সময় নষ্ট।”
“তুই কয়টা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিস?”
“পাঁচটা। তিনটা হলেও হতে পারে–অন্যগুলো বুঝিই নাই। তুই?”
“আমি ছয়টা। আমারও এক অবস্থা–প্রথম তিনটা মনে হয় হবে। অন্যগুলো জানি না।”
রাশা শুনতে পেল, দুইজন তারপর সায়েন্স অলিম্পিয়াডের আয়োজকদের মুখ খারাপ করে গালাগাল করতে থাকে।
রাশা পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে আসা ছেলেমেয়েদের ভেতর একটু হাঁটাহাঁটি করে দেখল, কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কে কী বলছে। রাশা বেশ অবাক হয়ে আবিষ্কার করল যে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের ধারণী প্রশ্নটা খুবই খারাপ হয়েছে, তাদের ভাষায় রীতিমতো “আউল ফাউল” প্রশ্ন।
