“বড় মানুষদের দিয়ে অঙ্কগুলো করিয়ে”
“উঁহু। আমি সেটার কথা বলছি না।”
“তাহলে কোনটার কথা বলছ?”
“এখানে আসার কথাটা বলছি। মনে হচ্ছে এখানে এসে ঠিক করলাম, যদি কোনোভাবে আপনারা জানতে পারেন যে অঙ্কগুলো আমি নিজেই করেছি তাহলে না জেনে আমাকে এই খারাপ কথাগুলো বলছেন সেটা চিন্তা করে আপনাদের খারাপ লাগবে না?”
কলেজের মেয়েগুলো হঠাৎ করে চুপ করে গেল।
.
রাশাকে হেডমাস্টার নিজেই নিয়ে এসেছেন। মেয়েদের এই হোস্টেলে তুলে দিয়ে তিনি উধাও হয়ে গেছেন। কাল অলিম্পিয়াডে থাকতেও পারেন নাও থাকতে পারেন। পরশু দিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পর রাশাকে নিয়ে ফিরে যাবেন। রাশাকে বলেছেন ঢাকায় তার নানা কাজকর্ম আছে, সেগুলো করতে করতেই সময় চলে যাবে। রাশা আপত্তি করেনি, তার রাতে ঘুমানোর জায়গা আছে, খাওয়ার জায়গা আছে। তাকে এখান থেকে বাসে করে নিয়ে যাবে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাবে কাজেই দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
রাতে মেয়েদের হোস্টেলে ঘুমানোর আগে আগে সে আবিষ্কার করল হোস্টেলের আলোগুলো অসম্ভব তীব্র, রীতিমতো চোখে লাগে। গ্রামে রাতের বেলা কুপি বাতি না হয় হ্যারিকেনের আলোতে থাকতে থাকতে তার চোখ এখন ইলেকট্রিক বাল্বের প্রখর আলো সহ্য করতে পারছে না। কী আশ্চর্য!
রাশা খুব ভোরবেলা প্রস্তুত হয়ে নিল, ঢাকার বাইরে থেকে যারা এসেছে তাদের বেশির ভাগই আত্মীয়স্বজনের বাসায় উঠেছে। তাই হোস্টেলের মেয়ে খুব বেশি নেই। সাত সকালে সে গোসল করেছে, কাপড় পরেছে, ক্যান্টিনে নাস্তা করেছে তারপর নিচে এসে বসে আছে। তার ভেতরে একটা ভয়, যদি তাকে এখানে ফেলে রেখে বাস চলে যায় তখন কী হবে?
ঠিক নয়টার সময় বাস এলো, তাকে ফেলে রেখে যেতে পারল না, সে সবার আগে বাসে গিয়ে উঠে বসল। বাসটা তাদের সায়েন্স অলিম্পিয়াড ভেনুতে নিয়ে গেল, বিশাল একটা মাঠ, সেখানে বিশাল একটা প্যান্ডেল। প্যান্ডেলের এক পাশে বড় স্টেজ, পিছনে চকচকে ডিজিটাল ব্যানার। একপাশে রেজিস্ট্রেশনের জায়গা সেখানে ছেলেমেয়েরা লাইন ধরে রেজিস্ট্রেশন করছে। সবাই কলেজের বড় বড় ছেলেমেয়ে। তার বয়সী ছেলেমেয়ে খুব কম। রাশাও লাইনে দাঁড়িয়ে রেজিস্ট্রেশন করে নিল, সেখান থেকে গলায় ঝুলিয়ে নেয়ার জন্যে তার নাম লেখা একটা কার্ড দেয়া হলো, সাথে সায়েন্স অলিম্পিয়াডের নিয়ম-কানুন লেখা কিছু কাগজপত্র আর হাতখরচ আর ভাড়ার টাকা। একপাশে ফ্রি নুডল খাওয়াচ্ছে সেখানে ছেলেমেয়েদের খুব ভিড়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হতে এখনো প্রায় আধঘণ্টা বাকি, রাশা মোটামুটি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন হঠাৎ করে সে জাহানারা ম্যাডামকে দেখতে পেল। রাশা ছুটে ম্যাডামের কাছে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল, “ম্যাডাম! ম্যাডাম!”
জাহানারা ম্যাডাম ঘুরে তাকালেন, রাশাকে দেখে তার এক মুহূর্ত সময় লাগল চিনতে, প্রথমে তার চোখে বিস্ময়, তারপর সেখানে আনন্দের ছাপ পড়ল! রাশাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “রাশা! তুমি? এই অলিম্পিয়াডে?”
“জি ম্যাডাম!”
“তুমি না মাত্র ক্লাশ এইটে পড়। এটা তো কলেজের কম্পিটিশন!”
“মনে নাই আপনি আমাকে কতগুলো বই পাঠিয়েছেন বসে বসে সেগুলো পড়েছি তো”।
জাহানারা ম্যাডামের মুখে বিশাল একটা হাসি ফুটে উঠল, “তুমি সেগুলো পড়েছ?”
“পুরোটা শেষ হয় নাই।”
“এখনই শেষ হবে কেমন করে? তোমার বয়সে শুরু করাই তো কঠিন!”
“সবকিছু বুঝি না, মাঝে মাঝে ডি ওয়াই ভাগ ডি এক্স লেখে–”
“ক্যালকুলাস। ওটাকে ক্যালকুলাস বলে।”
“ওটা জানি না তো তাই একটু ঝামেলা হয়।”
“আর ঝামেলা হবে না, আমি তোমাকে ফ্যান্টাস্টিক একটা ক্যালকুলাস বই কিনে দেব।” জাহানারা ম্যাডাম রাশার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমি কখনো চিন্তা করিনি তুমি সত্যি সত্যি সিরিয়াসলি ওই বইগুলো পড়বে
“আসলে বর্ষাকালে যা বৃষ্টি আপনি চিন্তা করতে পারবেন না। চারিদিকে পানি, ঘর থেকে বের হওয়া যায় না! তখন ঘরে বসে বসে পড়েছি। কুপি বাতি জ্বালিয়ে-”
“ইলেকট্রিসিটি নাই?”
“কিছু নাই।”
“কিন্তু রাশা তোমাকে দেখে কিন্তু খুব ফ্রেস লাগছে, গায়ের রংটা একটু পোড়া পোড়া। কিন্তু খুব ফ্রেশ লাগছে। তেজি তেজি ভাব!”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “জি ম্যাডাম, তেজি না হলে পারতামই না। বর্ষার সময় নৌকা করে স্কুলে যাই। নিজেরাই নৌকা বেয়ে যাই!”
জাহানারা ম্যাডাম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, “তুমি নৌকা বাইতে পারো?”
“আরো অনেক কিছু পারি ম্যাডাম!”
“কী কী পারো?”
“সাঁতার দিতে পারি। গাছে উঠতে পারি। একটু একটু রান্না করতে পারি। স্যারদের মার খেতে পারি। ঝগড়া করতে পারি–”
জাহানারা মমি হাসতে হাসতে বললেন, “তোমার স্কুলটা কেমন?”
রাশা গলা নামিয়ে বলল, “খুব খারাপ। লেখাপড়া হয় না। স্যার ম্যাডামরা কিছু জানেন না, পড়াতেও পারেন না–সব নিজেরা নিজেরা পড়তে হয়।
“সেটা একদিক দিয়ে ভালো, নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস বাড়বে।”
রাশা এদিক-সেদিক তাকিয়ে বলল, “আমাদের ক্লাসের কেউ আসে নাই?”
“না। কলেজ সেকশনের কয়েকজন এসেছে।”
“তাদেরকে তো আমি চিনব না।”
“না চিনবে না।”
জাহানারা ম্যাডাম রাশাকে প্রায় ধরে রেখে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, একসময় ইতস্তত করে বললেন, “তোমাকে কি তোমার আম্মুর কথা জিজ্ঞেস করব রাশা?”
