মাঠের এক কোনায় সবাইকে লাঞ্চের প্যাকেট দিচ্ছে, রাশা লাইনে দাঁড়িয়ে লাঞ্চের প্যাকেটটা নিয়ে মাঠের এক কোনায় খেতে বসে। হঠাৎ করে তার একটু মন খারাপ হয়ে যায়। এখানে যারা এসেছে সবাই একজনের সাথে আরেকজন তা নাহলে কয়েকজন মিলে গল্প করছে। অনেকের বাবা-মা এসেছে, অনেকের স্যার-ম্যাডামরা এসেছেন, তারা মিলে গল্প করতে করতে খাচ্ছে। শুধু সে একা, মাঠের এক কোনায় বসে খাচ্ছে। একা একা খাওয়া কী মন খারাপ করা একটা ব্যাপার–এর মাঝেই মনে হয় একধরনের দুঃখী দুঃখী ভাব আছে। রাশা সেই দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে খেতে থাকে, তেল জবজবে খানিকটা বিরিয়ানি, একটা সেদ্ধ ডিম আর মোরগের শুকনো একটা রান, কী ভয়ঙ্কর খাবার!
বিকেলের দিকে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল, ভালো ভালো কয়েকজন শিল্পী গান গেয়ে শোনাল, একটা নাচের অনুষ্ঠান, সবার শেষে ছোট একটা নাটক। রাশা অনেক দিন পর এরকম একটা অনুষ্ঠান দেখছে, আগের স্কুলে তারা নিজেরাই কতবার এরকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তার বুক থেকে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। প্রায় সাথে সাথেই রাশা ভুরু কুঁচকে ভাবল, মন খারাপ হলে মানুষ দীর্ঘশ্বাস কেন ফেলে? দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে ফুসফুঁসের ভেতর আটকে থাকা সব বাতাস জোর করে বের করে দেয়া শুধু মন খারাপ হলে এটা করে, অন্যসময় কেন করে না? রাশা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
সন্ধেবেলা বাসে করে তাদের মেয়েদের হোস্টেলে নিয়ে যাওয়া হলো, সকালে যে কয়জন ছিল এখন তারাও নেই। পুরো বাসে তারা মাত্র তিনজন। ঢাকা শহরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নেই সেরকম মানুষ খুব কম। এই বাসে বসে থাকা তিনজন হচ্ছে এরকম তিনজন হতভাগী! রাশা চোখের কোনা দিয়ে এই হতভাগীদের দেখল, চেহারা দেখেই বোঝা যায় মফস্বল থেকে এসেছে, তাদের মাঝে ঢাকা শহরের মেয়েদের মতো চকচকে ভাবটা নেই।
রাতে ক্যান্টিনে খেতে বসে রাশা অন্য দুটি মেয়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু আবিষ্কার করল মেয়ে দুটো কথা বলতে খুব আগ্রহী নয়, তাদের ভেতর কী নিয়ে যেন একটা ভয় ভয় ভাব!
পরদিন সকালে ছাত্রছাত্রীদের জন্যে প্রশ্নোত্তর পর্ব। মঞ্চে কিছু বুড়ো বুড়ো মানুষ বসেছে, দেখেই রাশা বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুড়ো মানুষেরা কেন যেন একটু বেশি কথা বলে, এই মানুষগুলোও নিশ্চয়ই বকবক করে কানের পোকা নাড়িয়ে দেবে। তারপরেও রাশা একটু আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল কে কী প্রশ্ন করে আর তার উত্তরে বুড়ো বুড়ো মানুষেরা কী বলে সেটা শোনার জন্যে।
প্রথম প্রশ্নটা হলো মহাকাশে মানুষ কেন ভরশূন্য হয়। একজন প্রশ্নটার উত্তর দিলেন অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, কী বললেন কিছু বোঝা গেল না। কোনো মানুষ যখন একটা প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে জানে না তখন এভাবে উত্তর দেয়। স্টেজে যারা বসেছিলেন তার মাঝে একজনের মনে হলো উত্তরটা পছন্দ হলো না, সেই মানুষটা তখন মাইক নিয়ে প্রশ্নটার উত্তর দেয়া শুরু করলেন। এই মানুষটার উৎসাহ অনেক বেশি কাজেই এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যে কথা আর শেষ হয় না! একসময় শেষ হলো তখন একটি মেয়ে প্রশ্ন করল, পৃথিবীর কেন্দ্রে মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ শূন্য কেন? তারা যে ফর্মুলা শিখে এসেছে সেটা ব্যবহার করলে তো অসীম হওয়ার কথা।
রাশা একটু সোজা হয়ে বসল, এই প্রশ্নটার উত্তর সে নিজে অনেক কষ্ট করে বের করেছে, সে দেখতে চায় তার উত্তরটার সাথে মিলে কিনা। স্টেজে বসে থাকা মানুষগুলো বড় বড় বিজ্ঞানী, সবকিছুই জানে কিন্তু বোঝাতে পারে না! রাশা দেখল তারা কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করল কিন্তু কেউ ঠিক করে বুঝতে পারল না! এরপরের প্রশ্নটা ছিল বিবর্তন নিয়ে, স্টেজে কমবয়সী একজন মহিলা খুব সুন্দর করে উত্তরটা দিলেন। এরপরে যে প্রশ্ন করতে দাঁড়াল সে প্রশ্ন না করে বিজ্ঞান এবং ধর্মের সাথে সম্পর্ক নিয়ে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেলল। স্টেজে বসে থাকা বুড়ো মানুষটা মাথা নেড়ে বলল, “ধর্মের মূল হচ্ছে বিশ্বাস আর বিজ্ঞানের মূল হচ্ছে যুক্তিতর্ক। দুটো ভিন্ন ভিন্ন ধারার জ্ঞান। তাই ধর্ম দিয়ে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে হয় না আবার বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম ব্যাখ্যা করতে হয় না!”
যে প্রশ্নটা করেছিল সে কঠিন মুখে আবার তর্ক করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু স্টেজে বসে থাকা বুড়ো মানুষটা তাকে সুযোগ না দিয়ে আরেকজনের কাছে চলে গেল। এবারের প্রশ্নটা ছিল বিগ ব্যাং নিয়ে, প্রশ্নটা ছিল সুন্দর, উত্তরটাও দেয়া হলো সুন্দর করে। রাশারও একটা প্রশ্ন ছিল, জাহানারা ম্যাডাম তাকে বিজ্ঞানের যে বইটা দিয়েছেন সেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে বিচিত্র একটা বিজ্ঞানের কথা বলা আছে, সেখানে ওয়েভ ফাংশন বলে আরো বিচিত্র একটা কথা আছে, সেটা নিয়ে সে প্রশ্ন করতে চাইছিল। প্রথম প্রথম খুব বেশি ছেলেমেয়ে প্রশ্ন করছিল না, তখন হাত তুললে তাকে নিশ্চয়ই প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হতো। এখন সবাই হাত তুলে বসে আছে, সবাই কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়। তাই রাশা আর চেষ্টা করল না চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
প্রশ্নোত্তর পর্ব যখন শেষের দিকে সেছে তখন রাশা কমবয়সী একটা মেয়ে একটা কাগজ নিয়ে স্টেজে এস বুড়ো মানুষদের একজনের সাথে একটু কথা বলে তার কাছ থেকে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে বলল, আমরা একটা মেয়েকে খুঁজছি। সে যেন এক্ষুণি আমার অফিসে চলে আসে। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর হচ্ছে দুই হাজার তিনশ সাতাশ। আর তার নাম হচ্ছে–মেয়েটা নামটা দেখার জন্যে কাগটার দিকে তাকাল। রাশা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর দুই হাজার তিনশ সাতাশ, আর সত্যি তখন মেয়েটি মাইক্রোফোনে তার নাম ধরে ডাকল।
