সালাম নানা তখন ক্রাচে ভর দিয়ে চলে যেতে শুরু করলেন, রাশা বললেন, “নানা, আপনি বসবেন না?”
“নাহ্ রে। যাই।”
রাশা বলল, “আমি আপনাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।”
সালাম নানা হা হা করে হাসলেন, বললেন, “তুমি আমাকে কী এগিয়ে দিবে? আমি কি বাচ্চা ছেলে নাকি?”
“না, নানা। আসলে এত সুন্দর জোছনা উঠেছে তাই আপনার সাথে একটু হাঁটি।”
“তাহলে আসো। আসলেই দেখো কী সুন্দর জোছনা। পৃথিবীতে মনে হয় জোছনার মতো সুন্দর কিছু নাই।”
রাশা সালাম নানার সাথে খালের পাড় ধরে হাঁটতে থাকে। রাশা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “নানা।”
“বলো।”
“আমার নানা কেমন করে মারা গিয়েছিলেন আপনি জানেন?”
সালাম নানা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, “আসলে কেউ-ই জানে না। আমরা কাছাকাছি একটা অপারেশনে এসেছিলাম। অপারেশন শেষ হয়েছে বিকেলের দিকে, তোমার নানা বলল, বাড়ির এত কাছে এসেছি একটু বউ-বাচ্চাকে দেখে আসি। আমি না করলাম, বললাম, রাজাকারদের উৎপাত বেড়েছে এখন যাওয়া ঠিক হবে না।”
“তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছিল, তোমার নানা বলল, এই বৃষ্টিতে কেউ ঘর থেকে বের হবে না। আমি যাব বাচ্চাগুলোকে একনজর দেখে চলে আসব।”
“তোমার নানা তারপর তার হাতিয়ারটা আমার হাতে দিয়ে বলল, এইটা তোমার কাছে রাখো। আমি রেখে দিলাম। এখন মনে হয় হাতিয়ারটা নিয়ে গেলেই পারত, কয়টা রাজাকারকে তো অন্তত শেষ করতে পরিত, ধরাও পড়ত না। মানুষটার সাহস ছিল সিংহের মতো।”
“যাই হোক আজিজ ভাই বাড়ি আসলেন, তোমার নানির সাথে দেখা করলেন, তোমার মাকে দেখলেন, তারপর চলে আসতে চাচ্ছিলেন, তোমার নানি তখন বললেন, এত বৃষ্টি হচ্ছে, ‘বৃষ্টিটা একটু ধরুক তখন যেন যায়।”
সালাম নানা একটু থামলেন, একটা বড় নিশ্বাস নিলেন, তারপরে বললেন, “মৃত্যু নিশ্চয়ই আজিজ ভাইয়ের পিছনে পিছনে এসেছিল তা না হলে কেন একটু দেরি করলেন? এর মাঝে রাজাকাররা এসে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল।”
“তারপর ঠিক কী হয়েছে কেউ ভালো করে জানে না। রাজাকারের দল তাকে ধরে নিয়ে গেল, শুনতে পেলাম মিলিটারির কাছে দিবে। কিন্তু মিলিটারির কাছে দিল না, আর কোনোদিন মানুষটার খোঁজও পাওয়া গেল না। নিশ্চয়ই তাকে ঐ রাতেই মেরে ফেলেছে।”
রাশা জিজ্ঞেস করল, “কোথায় কবর দিয়েছে কেউ জানে না?”
“না। কেউ জানে না। আসলে-”
“আসলে কী?”।
“যারা তোমার নানাকে ধরে নিয়েছিল তারা কি কবর দিয়েছে? কবর দেয় নাই, মেরে লাশটাকে কোথাও ফেলে দিয়েছে। ঐ রাজাকাররা তো মানুষ না। ওরা পশু, পশুর থেকেও খারাপ। জাহান্নামেও ওদের জায়গা হবে না।“
“সেই রাজাকারগুলোর কী হয়েছে?”
“যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা কিছু মেরে শেষ করেছে। কিছু পালিয়েছে। কিছু ধরা পড়ে জেলে গেছে। সেভেন্টি ফাইভে যখন রাজাকারদের ক্ষমা করে দিল সেগুলো ছাড়া পেয়ে এসেছে।”
“আচ্ছা নানা, এইটা কি সত্যি, আমাদের স্কুলটা যার নামে সে নাকি”
সালাম নানা একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সত্যি। শোনা যায় তোমার নানাকে যারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল তার মাঝে সেও নাকি ছিল।”
“একটা রাজাকারের নামে স্কুল? এটা কেমন হলো না?
“খুব অন্যায় হলো। কিন্তু কী করবে বলো? মাঝখানে কয়েকটা সরকার গেল তারা তো সেই রাজাকারদেরই তোষামোদ করেছে। আহাদ আলী সেভেন্টি ফাইভে জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরে এসে কয়েক বছর চুপচাপ ছিল, তারপর চেয়ারম্যান ইলেকশান করল। টাকা কামাই করল নিজের নামে মাদ্রাসা বানাল, স্কুল-বানাল। আগে স্কুল কমিটিতে ছিল, এখন বয়স হয়েছে বাড়িতে বসে থাকে।”
“আপনি কখনো দেখেছেন নানা এই মানুষটাকে?”
“না দেখি নাই। কেন?”
“একটা রাজাকার দেখতে কেমন হয় সেটা জানার জন্যে।”
“এরা দেখতে মানুষের মতোই। নাক মুখ চোখ আছে। কিন্তু আসলে মানুষ না। আসলে এরা পশু। পশুর চাইতেও খারাপ।”
রাশা নিঃশব্দে সালাম নানার পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। নরম মাটিতে তার ক্রাচ গেঁথে গেঁথে যাচ্ছিল, তারপরেও তার অস্পষ্ট শব্দ শোনা যায়। একটা মুক্তিযোদ্ধার কষ্টের শব্দ।
১৩. সায়েন্স অলিম্পিয়াড
কলেজের মেয়েটি একটু অবাক হয়ে রাশার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুমি এখানে কী করছ?”
“আমি সায়েন্স অলিম্পিয়াডে এসেছি।”
“সায়েন্স অলিম্পিয়াডে?” কলেজের মেয়েটি অবাক হয়ে তার বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাচ্চাদেরও একটা অলিম্পিয়াড হচ্ছে নাকি?”
“জানি না তো। একটাই তো অলিম্পিয়াড।”
কলেজের মেয়েটি রাশাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কীসে পড়?”
“ক্লাস এইটে?”
“ক্লাস এইটে পড়লে তুমি অলিম্পয়াডে কেমন করে চান্স পেলে? অলিম্পিয়াডের সব প্রশ্ন তো ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের!”
ঝকঝকে চেহারার একটা মেয়ে হি হি করে হেসে বলল, “বুঝিস না? বাড়িতে একজন ইন্টারমিডিয়েট ইউনিভার্সিটির থাকলেই তো হয়! অঙ্ক করে দেবে–পাঠিয়ে দেবে!”
“কিন্তু তাহলে এখানে এসে ধরা খাবে না?”
ঝকঝকে চেহারার মেয়েটা বলল, “ধরা মনে করলেই ধরা! একটু দুই নম্বরি করে মাগনা ঢাকা থেকে বেড়িয়ে যেতে পারলে ক্ষতি কী?”
রাশার কানটা একটু লাল হয়ে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না। ঝকঝকে চেহারার মেয়েটা রাশার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপু, তুমি কাজটা কিন্তু ঠিক করলে না!”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “এখন মনে হচ্ছে হয়তো ঠিক করলাম না।”
