“গুড।”
“তাহলে কালকে থেকে কি ক্লাস হবে?”
“কালকে থেকেই?” ম্যাডামকে দুশ্চিন্তিত দেখাল, “রুটিন করতে হবে না?”
“রুটিন পর করলে হবে না ম্যাডাম? সবাই একটু দেখুক?”
গৌরী ম্যাডাম চোখ কপালে তুলে বললেন, “সর্বনাশ! ভুল জায়গায় টেপাটেপি করে পরে নষ্ট করে ফেলবে!”
‘নষ্ট করবে না ম্যাডাম। আপনি যদি বলেন তাহলে আমি থাকব। কাউকে ওল্টাপাল্টা কিছু করতে দিব না।”
“তুই থাকবি?”
“আপনি যদি বলেন।“
“ঠিক আছে তাহলে দেখি চেষ্টা করে।”
.
কাজেই রাশাকে সবসময়েই কম্পিউটার ল্যাবরেটরিতে দেখা যেতে লাগল। গৌরী ম্যাডাম যদি ক্লাস নিতেন তাহলে কম্পিউটার বিষয়টা হতো দুর্বোধ্য কঠিন একটা বস্তু। যেহেতু রাশা ছেলেমেয়েদের দেখাল তাই সবাই আবিষ্কার করল এটা আসলে একটা খেলনা। সেই খেলনা দিয়ে খেলতে এত মজা যে কেউ আগে কল্পনা করেনি।
গৌরী ম্যাডাম অসহায়ভাবে আবিষ্কার করলেন কয়েকদিনের মাঝে বাচ্চাকাচ্চারা তার থেকে অনেক বেশি জেনে গেছে। শুধু তাই নয়, কম্পিউটারে তার জ্ঞান হচ্ছে ভাসা ভাসা, ছেলেমেয়েরা কম্পিউটারের নাড়ি নক্ষত্র জানে। তারা কম্পিউটার নিয়ে এমন এমন জিনিস করতে লাগল যে তার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল।
.
এরকম সময় একদিন হেডমাস্টার রাশাকে ডেকে পাঠালেন। রাশা একটু দুশ্চিন্তিত হয়ে হেডমাস্টারের কাছে গেল, কম্পিউটার শেখানো নিয়ে সে কিছু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে সেটা নিয়ে তাঁকে কেউ নালিশ করেছে কি না কে জানে? দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে রাশা বলল, “আসতে পারি স্যার?”
“আস।”
রাশা ভেতরে ঢুকে হেডমাস্টারের সামনে দাঁড়াল। হেডমাস্টার তার দিকে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে একটা খাম হাতে তুলে নিয়ে বললেন, “ঢাকা থেকে একটা চিঠি এসেছে। সায়েন্স অলিম্পিয়াড কমিটির চিঠি”
রাশার বুকের ভেতর ছলাৎ করে উঠল, জিজ্ঞেস করল, “কী লিখেছে চিঠিতে?”
“লিখেছে ঢাকায় একটা সায়েন্স অলিম্পিয়াড হবে সেখানে তোকে সিলেক্ট করেছে। আমি ঠিক বুঝলাম না–অলিম্পিক তো হয় দৌড়াদৌড়ি না হলে লাফঝাঁপ দিয়ে। সায়েন্স দিয়ে অলিম্পিকটা কেমন করে হবে? হাতে একটা টেস্টটিউব নিয়ে দৌড়াবে? নাকি একটা মাইক্রোস্কোপ নিয়ে লাফ দিবে?” হেডস্যার কথা শেষ করে হা হা করে হাসলেন, যেন ভারি চমৎকার একটা রসিকতা হয়েছে!
রাশা বলল, “মনে হয় বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন দিবে, সেইগুলোর উত্তর দিতে হবে।”
হেডস্যার হাতের চিঠিটাতে আরেকবার চোখ বুলালেন। তারপর বললেন, “ঢাকায় গেলে তোক একটা মেয়েদের হোস্টেলে রাখবে, হাতখরচের টাকা দেবে। যাতায়াতের ভাড়া দেবে–যাবি নাকি?”
রাশা তার উত্তেজনাটা চেপে রেখে বলল, “হ্যাঁ স্যার। যেতে চাই।”
হেডস্যার কান চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “স্কুলের জন্যে একটা প্রেস্টিজ। তোর তো যাওয়াই উচিত। কিন্তু কেমন করে যাবি? তোর সাথে কে যাবে?”
রাশা একটু উদ্বিগ্ন মুখে বলল, “কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে না?”
“দেখি কোনো স্যারকে রাজি করতে পারি কি না।”
.
রাশা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় সবাইকে বলল সে সায়েন্স অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে ঢাকা যাচ্ছে। তাকে যাতায়াতের ভাড়া দেয়া হবে এবং হাত খরচ দেয়া হবে। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আসবেন। শুনে সবাই চমৎকৃত হয়ে গেল। সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত হলো জিতু এবং স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে জিতু সারা গ্রামে সবাইকে খবরটা দিয়ে এলো। সবাইকে যে খবরটা সঠিকভাবে দিল তা নয়, খবর দেয়ার সময় যখন যেখানে প্রয়োজন অনেক বাড়তি ব্যাপার স্যাপার যোগ করে দিল।
জিতুর খবর প্রচারের কারণেই মনে হয় সন্ধেবেলা সালাম নানা রাশার সাথে দেখা করতে এলেন। উঠানের মাঝখান থেকে ডাক দিয়ে বললেন, “রাশ, বেটি, তুমি কোথায়?”
রাশা হ্যারিকেন হাতে বের হয়ে দেখে সালাম নানা। সে ব্যস্ত হয়ে বলল, “নানা, আপনি! আসেন, আসেন, ভিতরে আসেন।”
সালাম নানা বললেন, “না রে রাশা বসব না। জিতুর মুখে একটা খবর শুনে এসেছি। কোন মন্ত্রী নাকি তোমাকে পুরস্কার দিবে? ব্যাপারটা কি?”
রাশা লজ্জা পেয়ে গেল, বলল, “না, না, আমি মোটেই কোনো পুরস্কার পাব না! জিতু বজ্জাতটা উল্টাপাল্টা কথা বলে বেড়াচ্ছে।”
সালাম নানা হাসলেন, বললেন, “আমাদের জিতু হচ্ছে রয়টার। সে সবসময় সব রকম খবর ছড়ায়।”
“মোটেই খবর ছড়ায় না, গুজব ছড়ায়। এত বাজে কথা বলতে পারে!”
সালাম নানা বললেন, “ঠিক আছে? সে না হয় একটু বাড়িয়েচাড়িয়ে বলছে। তুমি তাহলে আসল কথাটা বলো। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে, সেটা কী?”
“ঢাকায় একটা সায়েন্স অলিম্পিয়াড হচ্ছে, আমি সেখানে সিলেক্ট হয়েছি।”
“সায়েন্স অলিম্পিয়াড? সেটা আবার কী?”
রাশা বলল, “আমিও ভালো করে জানি না। মনে হয় বিজ্ঞানের উপরে একটা পরীক্ষার মতো হবে।”
“তোমাকে কেমন করে সিলেক্ট করল?”
“পত্রিকায় দশটা প্রশ্ন ছাপিয়ে দিয়েছিল, সেগুলো করে পাঠিয়েছিলাম।”
“বাহ!” সালাম নানা খুশিতে মাথা নেড়ে বললেন, “কী চমৎকার! আজিজ মাস্টারের যোগ্য নাতনি তুমি। এখন দেখি তুমি সেখান থেকে কী পুরস্কার আনতে পারো।”
রাশা বলল, “কত শতশত ছেলেমেয়ে আসবে। আমি কি কোনো পুরষ্কার পাব নাকি?”
“নিশ্চয়ই পাবে। আর না পেলেই কী। ওখানে যাওয়াই তো একটা বড় ব্যাপার।”
