.
সায়েন্স অলিম্পিয়াডের অঙ্কগুলো করে পাঠিয়েছে অনেক দিন হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম কয়েক দিন সে খুব উত্তেজনার মাঝে ছিল, ভেবেছিল কোনো একটা উত্তর আসবে। শেষ পর্যন্ত কোনো উত্তর আসেনি। হয়তো কুরিয়ারের লোকেরা সময়মতো পাঠায়নি, কিংবা পাঠিয়েছে কিন্তু তাদের হাতে পৌঁছায়নি। কিংবা কে জানে হয়তো সায়েন্স অলিম্পিয়াডের লোকেরা ঠিকই পেয়েছে কিন্তু তার অঙ্কগুলি সব ভুল হয়েছে। কিংবা কে জানে হয়তো তার অঙ্কগুলি শুদ্ধই হয়েছে কিন্তু অন্যদের অঙ্ক আরো অনেক বেশি শুদ্ধ হয়েছে, সে জন্যে তাকে বাতিল করে দিয়েছে। রাশা প্রথম প্রথম দুই এক সপ্তাহ আগ্রহ নিয়ে ব্যাপারটা ভুলে গেল–তার একটা কারণ স্কুলে ঠিক তখন তাদের কম্পিউটারগুলো এসে পৌঁছাল। আগে রাজ্জাক স্যারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, সেই স্যারের চাকরি চলে গেছে। এরপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে গৌরী ম্যাডামকে। গৌরী ম্যাডাম মাঝখানে কোথায় গিয়ে যেন অনেক দিন ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন, ট্রেনিংটা ঠিকমতো হয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না, ম্যাডামকে কেমন জানি নার্ভাস মনে হচ্ছে।
যখন কম্পিউটারগুলো বসানো হচ্ছে তখন হেডমাস্টার আর অন্যান্য স্যার-ম্যাডামেরা ব্যস্ত হয়ে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। একটু পর দেখা গেল শুধু গৌরী ম্যাডাম একা নার্ভাস হয়ে কম্পিউটারের ল্যাবরেটরিতে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে কিছু কাগজ, সেগুলো দেখছেন আর উদ্বিগ্ন মুখে কম্পিউটারগুলো দেখছেন, ঠিক কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না।
রাশা যখন দেখল আশেপাশে কেউ নেই তখন ল্যাবরেটরি ঘরে উঁকি দিয়ে বলল, “ম্যাডাম, আসতে পারি?”
গৌরী ম্যাডাম বললেন, “কে? রাশা? আয়।”
রাশা ভেতরে ঢুকে সারি সারি সাজিয়ে রাখা কম্পিউটারগুলো দেখে বলল, “কী সুন্দর কম্পিউটারগুলো, তাই না ম্যাডাম?”
“হ্যাঁ। তোর জন্যেই তো হলো।”
“না ম্যাডাম, শুধু আমার জন্যে হয় নাই। সবার জন্য হয়েছে।”
গৌরী ম্যাডাম মাথা চুলকে বললেন, “এতগুলো কম্পিউটার দিল, দেখেশুনে রাখার জন্যে একটা মানুষ দেওয়া দরকার ছিল না?”
“হ্যাঁ ম্যাডাম দরকার ছিল।”
“আমি একা কেমন করে এতগুলো কম্পিউটার দেখে রাখব?”
“একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে ম্যাডাম।”
“হয়ে গেলেই ভালো।” গৌরী ম্যাডাম ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেললেন।
রাশা বলল, “কবে থেকে আমাদের কম্পিউটার ক্লাস হবে?”
“শুরু করব। কয়েক দিনের মাঝেই শুরু করব।”
“ম্যাডাম-”
“কী হলো?”
“আমি একটা কম্পিউটার একটু অন করে দেখি কী কী দিয়েছে?”
“দেখবি? দেখ। সাবধান, আবার নষ্ট করে ফেলিস না যেন।”
“না ম্যাডাম, নষ্ট করব না।”
রাশা তখন এক কোনায় বসে একটা কম্পিউটার অন করল। ঝকঝকে নতুন মেশিন, এখনো নতুন প্লাস্টিকের গন্ধ বের হচ্ছে। মাত্র অপারেটিং সিস্টেম বসানো হয়েছে, দেখতে দেখতে মনিটরে সবকিছু বের হয়ে এলো। রাশা জিব চটাশ করে একটা শব্দ করল, যেন ভারি মজার একটা কিছু সে চেটে চেটে খাচ্ছে। রাশা খানিকক্ষণ কম্পিউটারটা ঘাটাঘাটি করল, তারপর আনন্দের একটা শব্দ করল, বলল, “ম্যাডাম!”
“কী হয়েছে।”
“ইন্টারনেট কানেকশান আছে ম্যাডাম। ফাটাফাটি স্পিড!”
“তাই নাকি?”
“জি ম্যাডাম। এই দেখেন-” বলে সে ঝড়ের গতিতে কি বোর্ডে হাত চালিয়ে স্ক্রিনে আইনস্টাইনের একটা ছবি নিয়ে এলো।
গৌরী ম্যাডাম দেখে বললেন, “কোথা থেকে পেলি?”
“গুগল থেকে।”
গৌরী ম্যাডাম ঠিক বুঝতে পারলেন মনে হলো না। রাশা অনেক দিন পর তার ই-মেইলগুলো চেক করল। কত মেইল এসে জমা হয়েছে। যার বেশিরভাগেরই এখন আর কোনো অর্থ নেই। সে চোখ বুলিয়ে নিয়ে একটা নিশ্বাস ফেলে।
ম্যাডাম একটু ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “তুই কম্পিউটার চালাতে পারিস?”
“পারি ম্যাডাম। কম্পিউটার ছিল আমার এক নম্বর বন্ধু।”।
গৌরী ম্যাডাম তার কম্পিউটারের সামনে বসে খুব সাবধানে মাউসটাকে একটু নাড়ালেন, দেখেই বোঝা গেল–ম্যাডাম একেবারেই অভ্যস্ত নন। বিড়বিড় করে বললেন, “বইয়ে লিখেছে দুইবার ক্লিক করলে ওপেন হবে কিন্তু ওপেন হতে চাচ্ছে না। সমস্যাটা কী?”
রাশা ঠিক বুঝতে পারছিল না তার কিছু বলা ঠিক হবে কি না, শেষে বলেই ফেলল, “তাড়াতাড়ি দুইবার ক্লিক করতে হবে ম্যাডাম?”
“আমি তো ভাবছিলাম তাড়াতাড়িই করছি। এই কম্পিউটার মনে হয় বেশি ফাস্ট-” গৌরী ম্যাডাম নিজের রসিকতায় নিজেই একটু নার্ভাসভাবে হাসলেন।
একটু পরে আবার বিড়বিড় করে বললেন, “আমাকে বলেছিল বাংলায় লেখা যাবে! এই দ্যাখ কি বোর্ড টিপলেই শুধু ইংরেজি বের হয়। কী মুশকিল!”
রাশা আবার একটু ইতস্তত করে বলল, “ফন্টটা সিলেক্ট করা হয়নি। বাংলা একটা ফন্ট সিলেক্ট করলেই বাংলা লেখা বের হবে।”
গৌরী ম্যাডাম অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ। তাই তো।”
প্রথম প্রথম গৌরী ম্যাডাম রাশাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে একটু লজ্জা পাচ্ছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই তার লজ্জা কেটে গেল। যখনই তার কোনো একটা সমস্যা হচ্ছিল তখনই রাশাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। তার কিছু কিছু প্রশ্ন এত হাস্যকর যে রাশার হাসি পেয়ে যাচ্ছিল কিন্তু সে হাসল না, গম্ভীর হয়ে গৌরী ম্যাডামকে বুঝিয়ে দিল।
গৌরী ম্যাডামও রাশাকে পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটু সাহস পেলেন। তারা দুজনে মিলে সবগুলি কম্পিউটার অন করলেন, রাশা সবগুলিই একটু ঘাঁটাঘাটি করল, করে বলল, “ঠিক আছে ম্যাডাম!”
