“সত্যি পারেন?”
মাক্কু চোরা আবার মাথা নাড়ল।
রাশা বলল, “কিন্তু এটা তো একটা অসম্ভব ব্যাপার। কেউ নিশ্বাস না নিয়ে এক-দুই মিনিটের বেশি থাকতে পারে না। বেঁচে থাকতে হলে অক্সিজেন লাগে। ব্রেনে অক্সিজেন না গেলে ব্রেইন ড্যামেজ হয়ে যায়-”
মাক্কু চোরা কোনো কথা না বলে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বিড়ি টানতে টানতে আবার দড়ি পাকাতে থাকে। অক্সিজেনের অভাবে ব্রেন ড্যামেজ হয় কি না হয় তাতে কিছু আসে যায় না। রাশা বলল, “আপনি কেমন করে পানির নিচে থাকেন এটা বলবেন?”
মাক্কু চোরা রাশার কথা না শোনার ভান করে দড়ি পাকাতে থাকে। রাশা আবার বলল, “বলবেন আমাদের?”
মাক্কু চোরা এবারেও কোনো কথা বলল না। রাশা আবার বলল, “প্লিজ! বলবেন?”
মায়ূ চোরা বিড়িটা কামড়ে রেখে বিচিত্র একটা ভঙ্গিতে সেই অবস্থায় দাঁতের ফাঁক দিয়ে পিচিক করে থুতু ফেলল। বলল, “আমার ওস্তাদের দোয়ী আছে।”
“দোয়া?” রাশা অবাক হয়ে বলল, “ওস্তাদের দোয়া?”
ঘরের ভেতর থেকে এরকম সময় মাঞ্চু চোরার পরীর মতো সুন্দরী বউটা বের হয়ে এসে দরজাটা ধরে দাঁড়াল। রাশা বউটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি ভালো আছেন?”
বউ কোনো কথা না বলে মাথা নেড়ে জানাল, সে ভালো আছে। রাশা তখন আবার মারূ চোরার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি বলছেন ওস্তাদের দোয়া। কিন্তু ওস্তাদের দোয়া থাকুক আর না থাকুক, নিশ্বাস তো নিতে হবে। শরীরে অক্সিজেন তো দিতে হবে। তা নাহলে মানুষ বাঁচবে কেমন করে?”
মাক্কু চোরা গভীর মনোযোগ দিয়ে দড়ি পাকাতে লাগল, তাকে দেখে মনে হতে থাকে রাশা যে এখানে এসেছে, ব্যাপারটা সে জানেই না। রাশা তখন হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আপনি যদি না বলেন তাহলে নাই। কিন্তু যদি সত্যি সত্যি আপনি নিশ্বাস না নিয়ে এক-দুই ঘণ্টা পানির নিচে থাকতে পারেন তাহলে সেই খেলা দেখিয়ে আপনি কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা কামাই করতে পারবেন।”
মাক্কু চোরা লক্ষ টাকা কামাই করতে কোনো উৎসাহ দেখাল না। গভীর মনোযোগ দিয়ে দাড়ি পাকাতে লাগল।
রাশা জিতুকে বলল, “চল জিতু যাই—”
জিতু বলল, “চল—”
রাশার পরীর মতো সুন্দরী বউটাকে বলল, “আমরা আসি তাহলে?”
বউটা অস্পষ্টভাবে মাথা নাড়াল।
রাশা আর জিতু মাক্কু চোরার বাড়ি থেকে বের হয়ে খানিক দূর গিয়েছে তখন হঠাৎ পিছন থেকে একটা শব্দ শুনল, “এই মেয়ে!”
রাশা ঘুরে তাকিয়ে দেখে মক্কু চোরার পরীর মতো সুন্দরী বউটা এগিয়ে আসছে। রাশা অবাক হয়ে তার কাছে গেল, বউটা বলল, “পানির নিচে কেমন করে থাকে সেটা জানতে এসেছিলে?”
“হ্যাঁ। কেউ তো নিশ্বাস না নিয়ে এক দুই ঘন্টা পানির নিচে থাকতে পারবে না।“
“নিশ্বাস নেয়।“
“কেমন করে নেয়?”
“সাথে একটা নল রাখে। বাঁশের নল, না হলে পেঁপে পাতার উঁটি। কিছু না পেলে পাটখড়ি। সেইটা দিয়ে পানির নিচে থেকে নিশ্বাস নেয়।“
রাশার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সে চোখ বড় বড় করে বলল, “কী বুদ্ধি!”
বউটার চোখ-মুখ কঠিন হয়ে উঠে, “নিচু গলায় বলে, তার ওস্তাদের দোয়া আসলে দোয়া না। সেইটা হচ্ছে লানত।“
বউটা ফিরে যাচ্ছিল তখন রাশা ডাকল, বলল, “শুনেন।“
বউটা দাঁড়াল। রাশা বলল, “আপনার মতো সুন্দরী কোনো মানুষ আমি জীবনে দেখি নাই। আপনি জানেন আপনি কত সুন্দর?”
বউটা কিছুক্ষণ চুকরে থেকে বলল, “মেয়ে তোমাকে একটা কথা বলি?”
“বলেন।“
“গরিবের ঘরে মেয়েদের সৌন্দর্য থেকে বড় অভিশাপ আর কিছু নাই। আমি সবসময় বলি, খোদা তুমি আর যাই করো, কখনো গরিব মানুষের ঘরে সুন্দরী মেয়ে দিও না।”
বউটি তারপর আর কোনো কথা না বলে হেঁটে চলে গেল। কেন জানি তার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। কেন খারাপ হয়েছে সে বুঝতে পারছে না। রাশা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। জিতু একসময় বলল, “চলো রাশাপু।”
রাশা একটা নিশ্বাস ফেলে অন্যমনস্কভাবে বলল, “হ্যাঁ। চল যাই।”
.
একটা নল মুখে লাগিয়ে পানির নিচে বসে নিশ্বাস নেবার ধারণাটা খুবই সোজা কিন্তু রাশা আবিষ্কার করল কাজটা মোটেই সোজা না! রাশা প্রথমবার যখন চেষ্টা করল তখন তার নাক দিয়ে পানি ঢুকে একটা বিতিকিচ্ছি অবস্থা! জিতু দাবি করল পানিটা নাক দিয়ে তার ব্রেনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে ব্রেনে পানি ঢুকে গেলে কী বিপদ হতে পারে সেটা নিয়েও তার ভয়ঙ্কর কিছু গল্প ছিল কিন্তু রাশা সেটাকে মোটেও পাত্তা দিল না। অন্যেরা এক-দুইবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল, কিন্তু রাশা হাল ছাড়ল না, লেগে রইল। সে আবিষ্কার করল দুই আঙুলে নাক চেপে ধরে রাখলে পানির নিচে থেকে একটা নল দিয়ে মুখ দিয়ে নিশ্বাস নেয়া যায়। মানুষ যখন নিশ্বাস-প্রশ্বাস নেয় সে তার শব্দ শুনতে পায় না কিন্তু পানির নিচে থেকে যখন নল দিয়ে সে নিশ্বাস নেয় তার পুরো শব্দটা শুনতে পায়। মনে হয় একটা ইঞ্জিন চলছে।
সপ্তাহ দুয়েকের মাঝে রাশা পানির নিচে থেকে নিশ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার একটা এক্সপার্ট হয়ে গেল। নল হিসেবে সে ব্যবহার করে পেঁপে গাছের পাতার গোড়ার দিকের ডাঁটিটা। রাশা ঠিক করে রেখেছে এর পরেরবার বাজারের দিকে গেলে সে একটা লম্বা রবারের নল কিনে আনবে, সেটা দিয়ে সে পুকুরের তলায় বসে বসে নিশ্বাস নেবে! কী মজাই না হবে তখন।
পানির নিচে একটা বিচিত্র জগৎ রয়ে গেছে সেটা রাশা জানত না। কিন্তু সেটা দেখা যায় না, পানির নিচে সবকিছুই অস্পষ্ট! ডুবুরিরা চোখের উপরে একটা গগলস লাগায় তাহলে চোখের সামনে সরাসরি পানি থাকে না, তখন সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। এরকম গগলস তো আর গ্রামের বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না তাই রাশা চিন্তা করছে কেমন করে সেটা তৈরি করা যায়। পানির নিচে এত চমৎকার একটা জগৎ সেটা কেউ দেখবে না, সেটা তো হতে পারে না! তাকে দেখতেই হবে।
