“এটা কেমন করে হবে? মরা মানুষ কী বাঁচতে পারে?”
নানি একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “পারার কথা না। তবু আপন মানুষেরা এটা বিশ্বাস করতে চায়। মৃত্যুকে কেউ মেনে নিতে পারে না। কেউ না।”
নানি হঠাৎ চুপ করে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
.
গভীর রাতে রাশা চমকে ঘুম থেকে জেগে উঠল। তার মনে হলো, ভেলার মাঝে ভেসে থাকা মেয়েটি উঠে তার হাত ধরে টানছে, বলছে, “আমায় ফেলে চলে এসেছিস কেন? আয় আমার সাথে। আয়।”
রাশা নানিকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে শুয়ে রইল।
১২. মাক্কু চোরার বউ
দুপুরবেলা সূৰাই পুকুরে গোসল করতে নেমেছে, তখন রাশা জয়নবকে বলল, “আয় দেখি, কে বেশি সময় পানিতে ডুবে থাকতে পারে।”
জয়নব বলল, “ঠিক আছে।”
জিতু বলল, “আমিও ডুবে থাকব।”
রাশা বলল, “তোর সাথে কম্পিটিশনে যেয়ে লাভ নাই। তুই তো আর মানুষ না, তুই হচ্ছিস বাইন মাছ।”
জিতু হি হি করে হেসে বলল, “আজিব! তুমি আজিব!”
তারপর তিনজন একসাথে পানিতে ডুব দিল। রাশার একসময় যেরকম পানি নিয়ে একধরনের ভয় ছিল এখন সেটি নেই। জিতুর মতো না হলেও সে মোটামুটি পানিতে সাঁতার দিতে পারে। পানিতে ডুবে পুকুরের একমাথা থেকে প্রায় অন্যমাথায় চলে যেতে পারে। ইদানীং শুরু হয়েছে নতুন খেলা, কে কতক্ষণ পানিতে ডুবে থাকতে পারে তার কম্পিটিশন। প্রথম প্রথম কয়েক সেকেন্ড পরেই রাশা ছটফট করে পানি থেকে বের হয়ে আসত। আজকাল দীর্ঘ সময় সে নিশ্বাস না নিয়ে পানিতে ডুবে থাকতে পারে। আজকেও সে কম্পিটিশনে জয়নবকে হারিয়ে দিল। জিতুকে অবশ্যি হারানোর কোনো প্রশ্নই আসে না, কেমন করে এতক্ষণ পানির নিচে ডুবে থাকে কে জানে! দীর্ঘ সময় পর সে ভুস করে পানির নিচ থেকে বের হয়ে এলো।
রাশা বলল, “জিতু, তুই পানির নিচে এতক্ষণ কেমন করে থাকিস?”
জয়নব বলল, “বড় হয়ে মাক্কু চোরা হবি নাকি?”
রাশা বলল, “মাক্কু চোরা? আমরা যে দেখতে গিয়েছিলাম? যার পরীর মতো সুন্দর একটা বউ আছে?”
“হ্যাঁ। সে পানির নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকতে পারে।”
“ধুর!” রাশা বলল, “কেউ পানির নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকতে পারে না। মানুষ নিশ্বাস না নিয়ে এক-দুই মিনিটের বেশি থাকতে পারে না। অক্সিজেন লাগে।”
জিতু বলল, “মাক্কু চোরার অক্সিজেন লাগে না। মাছের মতন পানি দিয়ে নিশ্বাস নেয়।”
“খোদার কসম। মাক্কু চোরার কানকো আছে।”
“বাজে কথা বলবি না।” রাশা ধমক দিল, “মানুষের কানকো থাকে না।”
“আমি নিজের চোখে দেখেছি।” রাশা চোখ বড় বড় করে বলল, “তুই মাক্কু চোরার কানকো দেখেছিস? কোথায় আছে কানকোগুলি?”
“কানকো দেখি নাই, কিন্তু পানির নিচে ডুবে থাকতে দেখেছি। দুই ঘণ্টা পানির নিচে ছিল।”
রাশা বলল, “মিথ্যা কথা বলবি না! একজন মানুষ যদি নিশ্বাস না নিয়ে পানির নিচে দুই ঘণ্টা ডুবে থাকতে পারে তাহলে এই খেলাটা দেখিয়ে সে লাখ টাকা কামাই করতে পারবে। তার চুরি করে দিন কাটাতে হবে না।”
জিতু বলল, “মাক্কু চোরার তো চুরির নেশা। চুরি না করলে তার ভালোই লাগে না।”
“সেই কথা বল। কিন্তু পানির নিচে দুই ঘণ্টা থাকে সেই কথা বলবি না।”
“থাকে।” জিতু মুখ শক্ত করে বলল, “দুই ঘণ্টা থাকে।”
রাশা বলল, “বাজে কথা বলবি না। দেব একটা থাবড়া।“
জয়নব বলল, “বাজে কথা না, রাশা। মাক্কু চোরা আসলেই পারে।”
“হতেই পারে না।”
“সবাই দেখেছে। চুরি করে পালাচ্ছিল তখন লাফ দিয়ে পানিতে পড়ল। সেই পানি থেকে আর উঠে না। শেষে জাল ফেলে তুলেছে। পানির নিচে চুপচাপ বসে ছিল।”
“হতেই পারে না।”
“হয়েছে।” জয়নব বলল, “আমার কথা বিশ্বাস না করলে তুই অন্যদের জিজ্ঞেস করে দেখ।”
.
রাশা অন্যদের জিজ্ঞেস করে দেখল, আশ্চর্যের ব্যাপার সবাই বলল কথাটা সত্যি। এরকম ব্যাপার সবসময় শোনা কথা হয় কিন্তু এবারে রাশা কয়েকজনকে পেয়ে গেল যারা ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছে। সত্যি সত্যি মাক্কু চোরা দুই ঘণ্টা পানির নিচে ডুবে ছিল, রীতিমতো জাল ফেলে তুলতে হয়েছে।
রাশা তখন ঠিক করল সে মা চোরাকে গিয়ে নিজে জিজ্ঞেস করবে। একদিন দুপুরবেলা তাই জিতুকে নিয়ে রওনা দিল। সেই প্রথম যখন এসেছিল তখন একবার মাক্কু চোরার বাড়ি গিয়েছিল, মাক্কু চোরা থেকে তার পরীর মতো বউটার কথা বেশি মনে আছে।
আগেরবার যখন এসেছিল তখন মাঞ্চু চোরা বারান্দায় বসে বাঁশের চাচি দিয়ে একটা খলুই না কী যেন বানাচ্ছিল, আজকে সে পায়ের সাথে বাধিয়ে দড়ি পাকাচ্ছে, মুখের কোনায় একটা জ্বলন্ত বিড়ি। রাশা আর জিতুকে দেখে সে একটু সন্দেহের চোখে তাকাল। জিতু বলল, “মাক্কু চাচা, ভালো আছেন?”
মাক্কু চোরা বিড়ি টানতে টানতে নাক দিয়ে একধরনের অস্পষ্ট শব্দ করল।
জিতু বলল, “রাশা আপু তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে।”
মাক্কু চোরা কোনো কথা না বলে সরু চোখে রাশার দিকে তাকাল।
জিতু বলল, “তোমার কাছে একটা জিনিস জানতে চাই।”
মাক্কু চোরা এই প্রথম একটা কথা বলল, জিজ্ঞেস করল, “কী জিনিস?”
রাশা একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি নাকি নিশ্বাস না নিয়ে পানির নিচে থাকতে পারেন?”
মাক্কু চোরা কোনো কথা না বলে সরু চোখে রাশার দিকে তাকিয়ে রইল। রাশা আবার জানতে চাইল, “পারেন?”
মাক্কু চোরা এবারে অস্পষ্টভাবে মাথা নাড়ল।
