সেখান থেকে বের হয়ে সে একটা দোকান থেকে তার নানির জন্যে একটা নারকেল তেলের ছোট বোতল কিনল। নিজের জন্যে কিনল আরো কয়েকটা খাতা আর দুইটা বলপয়েন্ট কলম। তার নানি কারণে-কারণে তাঁর মাথায় নারকেল তেল মাখেন, নানির ধারণা মাথায় নারকেল তেল মাখলে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। তাই সুযোগ পেলেই রাশা নানির জন্যে নারকেল তেল কিনে নিয়ে যায়।
খাতা, কলম আর নারকেল তেলের বোতলটা নিয়ে সে তার নৌকায় বসে বাড়িতে রওনা দেয়। ব্রিজের কাছাকাছি এসে নদীটা পার হয়ে তীর ঘেঁষে সে নৌকা বাইতে থাকে। এতক্ষণ ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল, এখন ঝমঝম করে বৃষ্টি হতে থাকে। নদীর পানিতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটা বিচিত্র শব্দ তৈরি করছে। রাশা দ্রুত বৈঠা টানতে থাকে, নদীর তীরে তীরে ছোট ছোট গ্রাম, সেখানে মানুষজন থাকে। যখন সে বিলের মাঝে ঢুকবে তখন সেখানে কোনো জনমানুষ থাকে না। পুরো বিলটা আড়াআড়িভাবে পার হতে হবে, জিতু যখন থাকে তখন সারাক্ষণই সে এই বিল নিয়ে বিচিত্র সব ভৌতিক ইতিহাস বলতে থাকে। রাশা মোটেও সেগুলো বিশ্বাস করে না কিন্তু এই মুহূর্তে তার সবগুলো গল্প মনে পড়ে গেল। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, তার মাঝে রাশা ছোট খালটা দিয়ে বিলের মাঝে এসে ঢুকল। যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। বৃষ্টির জন্যে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, এখন সে জানে কোনদিকে যেতে হবে, একটু পর যখন কোনোদিক তীর দেখা যাবে না তখন সে কেমন করে বুঝবে কোনদিকে যাবে? যদি এই বিলে সে হারিয়ে যায়? যদি অন্ধকার নেমে আসে? যদি এই বিল থেকে সে আর কোনোদিন বের হতে না পারে? রাশার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে ওঠে।
আড়াআড়ি বিলটা পার হতে হবে, রাশা যতটুকু সম্ভব সোজা নৌকা চালিয়ে নিতে থাকে। সে চেষ্টা করে যেন নৌকার মাথাটা ডানে-বাঁয়ে ঘুরে যায়। তাহলে জনমানবহীন এই নির্জন বিলটাতে সে আটকা পড়ে যাবে। যদি বৃষ্টি না থাকত তাহলে দূরে গ্রামগুলো দেখা যেত, কোনো সমস্যা হতো না।
ঠিক এরকম সময় সে ঝুনঝুন একটা শব্দ শুনল, মনে হলো কেউ যেন নূপুর পায়ে নাচছে, রাশা ভয়ানক চমকে উঠেছিল, ঠিক তখন সে দেখল কিছু একটা ভেসে ভেসে তার দিকে আসছে। চার কোনায় চারটা লাল পতাকা, ভেতরের অংশটা রঙিন কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা। রাশা কৌতূহলী হয়ে তাকাল, চোখ থেকে বৃষ্টির পানি সরিয়ে ভালো করে দেখে বুঝল এটা আসলে একটা ভেলা। ভেলায় কেউ নেই কিন্তু সেটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর মাঝে নিশ্চয়ই ঘণ্টা বেঁধে রাখা হয়েছে, বাতাসে সেগুলো ঝুনঝুন শব্দ করে নড়ছে।
রাশা তার নৌকাটা ভেলাষ্টার কাছে নিয়ে যায়, ভেলাটাকে ধরে সে উপরে তাকাল এবং সাথে সাথে ভয়ঙ্কর আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। ভেলার উপর একটা মেয়ের মৃতদেহ। রাশা এর আগে কখনো একটা মৃতদেহ দেখেনি, কিন্তু তবু তার বুঝতে একটুও দেরি হলো না যে এটা একটা মৃতদেই। মেয়েটিকে সুন্দর কাপড় পরে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল বৃষ্টির পানিতে সব ভেসে গেছে। মেয়েটার চোখ অল্প একটু খোলা, মুখের, ফাঁক দিয়ে দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে। মনে হয় এক্ষুণি উঠে বসবে। রাশা ভেলাটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নৌকাটাকে প্রাণপণে বাইতে শুরু করে কিন্তু সে অবাক হয়ে লক্ষ করল ভেলাটা তার নৌকার পিছু পিছু আসতে শুরু করেছে। রাশা ভয়াবহ আতঙ্কে কাঁপতে থাকে, তার মনে হতে থাকে এক্ষুণি বুঝি মৃতদেহটা ভেলার মাঝে উঠে দাঁড়াবে, তারপর মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে খলখল করে হাসতে শুরু করবে। কিংবা খপ করে তার নৌকাটা ধরে ফেলবে, তারপর তার নৌকায় উঠে বসবে। রাশা জানে একটা মৃতদেহ কখনোই সেটা করতে পারবে না কিন্তু তারপরেও একধরনের অবর্ণনীয় ভয়ে সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সমস্ত শক্তি দিয়ে নৌকাটা বাইতে থাকে।
তার পিছনে তাকাতে ভয় হচ্ছিল, সে শুনতে পেল ঘণ্টার ঝুনঝুন শব্দটা আস্তে আস্তে কমতে কমতে মিলিয়ে গেল। তখন সে ভয়ে ভয়ে পিছনের দিকে তাকাল, দেখল বহুদুরে ভেলাটি ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে! কী আশ্চর্য। কী ভয়ঙ্কর।
রাত্রিবেলা রাশা আজ তার নানিকে ধরে ঘুমাতে গেল। নানি তার গায়ে-মুখে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিয়ে বললেন, “তোকে নিয়ে মাঝে মাঝে চিন্তাতেই পড়ে যাই রে।”
রাশ মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিকই বলেছ নানি। আমিও মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই!”
“তোর একা একা এই বিল পাড়ি দেয়ার দরকারটা কী পড়েছিল?”
“আমি একা একা যেতে চাচ্ছিলাম না, কাউকে পেলাম না তাই একাই গেলাম।”
“আর যাবি না।”
“ঠিক আছে নানি। আর যাব না।”
“পৃথিবীতে কত রকম বিপদ হতে পারে।”
“নানি, একটা মরা মানুষ আর কী করবে?”
“আমি মরা মানুষকে ভয় পাই না। আমি ভয় পাই জ্যান্ত মানুষকে। পৃথিবীতে কত বজ্জাত মানুষ আছে তুই জানিস?”
“একটু একটু জানি।”
“কাজেই সাবধান থাকবি।”
“থাক নানি।”
রাশা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “নানি।”
“কী হলো?”
“ঐ মেয়েটাকে ভেলায় করে ভাসিয়ে দিয়েছে কেন?”
“মেয়েটাকে নিশ্চয়ই সাপে কামড়েছে। সাপে কামড়ালে এভাবে ভেলায় করে মরা মানুষটাকে ভাসিয়ে দেয়।”
“কেন নানি?”
“তারা বিশ্বাস করে মরা মানুষটা ভেলায় করে সাপের ওঝার বাড়ির ঘাটে এসে লাগে। ওঝা তখন মানুষটাকে বাঁচিয়ে তোলে।”
