রাশা পেন্সিলটা কামড়াতে কামড়াতে চিন্তা করতে থাকে।
খেতে খেতে নানি জিজ্ঞেস করলেন, “কী এত চিন্তা করিস রাশা?”
“একটা মানুষ রকেটে করে মহাকাশে গেছে সেখান থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার সময়—”
“তোর খেতে খেতে এটা চিন্তা করতে হবে?”
রাশা নানির দিকে তাকিয়ে বোকার মতো একটু হাসল, বলল, “মাথার মাঝে ঢুকে গেছে, বের করতে পারছি না।”
“বের করে ফেল। না হলে আমার মতো অবস্থা হবে। মাথা আউলে যাবে।”
রাশা হি হি করে হাসল, কিন্তু মাথা থেকে বের করতে পারল না, চিন্তা করতেই থাকল। খেতে খেতে সে এটা চিন্তা করল, খাওয়ার পর বাসনপত্র তুলে নানিকে সাহায্য করার সময় সেটা চিন্তা করল, দাঁত মাজার সময় চিন্তা করল, বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে চিন্তা করল, ঠিক যখন চোখে ঘুম নেমে আসছে তখন হঠাৎ সে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসল! সমস্যাটা কেমন করে করতে হবে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো হঠাৎ করে সেটা সে বুঝতে পেরেছে। তখনই বাতি জ্বালিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে বসে বসে তার অঙ্কটা করার ইচ্ছে করছিল কিন্তু সে করল না। নানি নিচে গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছেন, সে এখন বাতি জ্বালালে নানি উঠে পড়বেন। আগে নানি সারা রাত শুয়ে ছটফট করতেন, আজকাল শাস্তিতে ঘুমান, রাশা তাই তাকে একটুও ডিস্টার্ব করতে চায় না!
পরের পুরো দিনটা রাশা ভেবে ভেবে আরো দুটো অঙ্ক করে ফেলল, এখন বাকি আছে মাত্র একটা সেটা সে কিছুতেই করতে পারল না। যতবার চেষ্টা করেছে ততবার আটকে গেছে, তার কাছে মনে হছে নতুন একধরনের গণিত না জানলে সে মনে হয় এটা করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সে হাল ছেড়ে দিয়েছে, এখন পর্যন্ত যে কয়টা করতে পেরেছে সেগুলোই সে লিখে পাঠিয়ে দিবে। এটা বাজার থেকে কুরিয়ার করে পাঠাতে হবে, পাঠানোর আগে হেডমাস্টারের একটা সাইন নিতে হবে। হাতে মোটেই সময় নেই।
সকাল থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে, স্কুল বন্ধ তাই হেডমাস্টারকে তার বাসায় গিয়ে ধরতে হবে। এখন যদি রওনা দেয় তাহলে সবকিছু শেষ করে সন্ধে হওয়ার আগে ফিরে আসতে পারবে, তাই রাশা আর দেরি করল না, তখন তখনই বের হয়ে গেল।
জয়নব তার খালার বাড়ি গিয়েছে, মতির কোনো হদিস নেই, জিতুর জ্বর–কাঁথা মুড়ি দিয়ে কে কে করছে। রাশা এই গ্রামের আরো কিছু বাচ্চাকাচ্চাকে চিনে কিন্তু তাদের কাউকেই খুঁজে পেল না, যার অর্থ তার একাই যেতে হবে। সেটা এমন কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, স্কুল যখন খোলা ছিল তখন সে এক-দুইবার একা একা নৌকা চালিয়ে গিয়েছে।
রাশা তাই একটা পলিথিনের ব্যাগের ভেতর তার কাগজপত্রগুলো ভরে নৌকা করে রওনা দিল। খালটা পার হয়ে সে বিলে এসে পড়ল, বিলের মাঝামাঝি দিয়ে পাড়ি দিয়ে ছোট নদীটাতে হাজির হলো। বর্ষায় পানিতে ছোট নদীটা অবশ্য এখন আর ছোট নেই বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। নদীর তীর ঘেঁষে রাশা তার ছোট নৌকাটা বেয়ে নিয়ে যায়। ব্রিজের কাছাকাছি এসে সে নদীটা পাড়ি দিয়ে অন্য পারে আসে, বাজারের গোড়ায় নৌকাগুলো থাকে, সেখানে সেটাকে বেঁধে ওপরে উঠে আসে। এই ঘাটে তাদের পরিচিত মাঝি আছে, কাজেই কেউ তার এই ছোট নৌকা নিয়ে চলে যাবে সেরকম আশঙ্কা নেই।
রাশা ভিজে চুপসে গেছে কিন্তু আজকাল সে এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। আগে সে জানত বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হয়, এখানে এসে সে আবিষ্কার করেছে সেটা একেবারেই বাজে কথা। একজন মানুষ যতক্ষণ খুশি বৃষ্টির পানিতে ভিজতে পারে, তাতে কিছুই হয় না! এই দেশের বেশির ভাগ মানুষ বৃষ্টির পানিতে ভিজে ভিজে কাজ করে, সে জন্যে কারো জ্বর উঠে না, কারো শরীর খারাপ হয় না।
রাশা তাদের হেডমাস্টারের বাসায় এলো, বাসাটা সে চিনে কিন্তু আগে আসেনি! ভয় ছিল গিয়ে দেখবে হেডমাস্টার বাসায় নেই, তখন একটা মহাঝামেলা হয়ে যাবে, কিন্তু সে হেডমাস্টারকে পেয়ে গেল।
রাশাকে দেখে হেডমাস্টার চোখ কপালে তুলে বললেন, “সে কী? তুমি এরকম ভিজে ভিজে কোথা থেকে আসছ? কী ব্যাপার?”
রাশ হেডস্যারকে পুরো ব্যাপারটা বোঝাল, হেডস্যার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন বলে মনে হলো না। খানিকক্ষণ মুখ হাঁ করে থেকে বললেন, “তুমি এই অঙ্কগুলো করে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমার কাছে নিয়া আসছ আমাকে দিয়ে সাইন করানোর জন্যে?”
“জি স্যার।”
“তাহলে কী হবে?”
“তাহলে আমি যাদের কাছে পাঠাব তারা বুঝবে যে আসলে আমিই সেগুলো করেছি, অন্য কেউ আমাকে করে দেয় নাই।”
“তাতে লাভ?”
“যারা করতে পারবে তাদের ডেকে একটা অলিম্পিয়াড হবে। সায়েন্স অলিম্পিয়াড। বিজ্ঞানের অলিম্পিয়াড!”
“সেটা কী জিনিস?”
রাশা মাথা চুলকাল, “আমি ঠিক জানি না স্যার।”
“তুমি ঠিক জানো না?”
“না স্যার।”
“না জেনেই তুমি এইসব করছ?”
“আমার মনে হয় একটা পরীক্ষার মতো কিছু হবে।” হেডমাস্টার ভুরু কুঁচকালেন, “বৃত্তি পরীক্ষা?”
“হতে পারে স্যার। বৃত্তি পরীক্ষার মতো কিছু একটা হতে পারে।”
হেডমাস্টার তখন কাগজগুলোতে সাইন করে দিলেন। তার বাসাতেই সিল ছিল, সাইনের নিচে সিলও মেরে দিলেন। রাশ হেডমাস্টারের বাসা থেকে বের হয়ে একটা কুরিয়ারের দোকানে গেল, সেটা যেন কালকেই পৌঁছে দেয় সেটা নিয়ে খানিকক্ষণ অনুরোধ করে সে খবরের কাগজের ঠিকানায় তার অঙ্কগুলো কুরিয়ার করে দিল।
