চিঠিটা পড়ে রাশার যেটুকু না মন খারাপ হলো তার থেকে অনেক বেশি লজ্জা হলো। কার জন্যে লজ্জা সেটা সে বুঝতে পারল না।
.
নৌকার ব্যবস্থা হওয়ার পর সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। নৌকাতে কেউ বসে থাকে না, হয় বৈঠা বাইছে না হয় লগি দিয়ে ঠেলাঠেলি করছে। কাজেই ছোট নৌকাটা রীতিমতো বাইচের নৌকার মতো ছুটে যায়। শুধু তাই নয় নদীতে ওঠার পর নদীর একটা বাঁক মাঝে মাঝে শর্টকাট মেরে দেয়া হয়। নদীতীরে নৌকা চালানোর মতো যথেষ্ট পানি নেই, সেখানে হাঁটুপানি এবং কাদা, সেই অংশটাতে নৌকা থেকে নেমে ধাক্কা দিয়ে সেটাকে শুকনোর ওপর দিয়ে ঠেলে আবার নদীতে নামিয়ে দেয়া হয়। স্কুলে পৌঁছানোর পর তাদের গা, হাত, পা কাদা এবং পানিতে মাখামাখি থাকে, বই-খাতা ভিজে জবজবে হয়ে থাকে কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ-ই খুব বেশি মাথা ঘামায় বলে মনে হয় না! বেশ চলে যাচ্ছে দিন। স্কুলে কম্পিউটার ল্যাবটা তৈরি হয়েছে, টেবিল-চেয়ার বসানো হয়েছে, এখন যে কোনোদিন কম্পিউটারগুলো চলে আসবে। রাশা খোঁজ নিয়ে জেনেছে চিঠি চালাচালি হচ্ছে।
দেখতে দেখতে বর্ষাকাল চলে এসেছে। প্রথম প্রথম বৃষ্টি হতো ছাড়াছাড়াভাবে। আজকাল একেবারে নিয়মিত বৃষ্টি হয়। আর সে কী বৃষ্টি, রাশা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। টিনের ছাদে যখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে তার চাইতে সুন্দর কোনো শব্দ পৃথিবীতে হতে পারে কিনা রাশার জানা নেই। চারপাশের গাছপালাগুলো ঘন সবুজ। পাতাগুলো সতেজ আর পুরুষ্ট। যেদিকেই তাকায় মনে হয় মাটি ফেটে সবুজ লকলকে গাছ বের হয়ে আসবে। গাছগুলো যেন গাছ নয়, যেন এরা জীবন্ত প্রাণী। সামনের খাল পানিতে ভরে গেছে, সেখানে এখন রীতিমতো স্রোত, পানি খলখল শব্দ করে বয়ে যায়। সামনে তাকালে দেখা যায় আগে যেখানে মাঠ ছিল সৰ পানিতে ডুবে আছে, দেখে মনে হয় যেন একটা সমুদ্রের মাঝে নানি বাড়িটা ছোট একটা দ্বীপ।
যে জায়গা পানিতে ডোবেনি সেখানে কাদা। প্যাঁচপ্যাঁচে আঠালো কাদা, অনেক চেষ্টা করেও রাশা এই কাদাতে অভ্যস্ত হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে সে বাড়ির ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। বাইরে যখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে তখন সে জানালার কাছে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে লেখাপড়া করে। জাহানারা ম্যাডাম তাকে যে বইগুলো পাঠিয়েছিলেন সে সেগুলো মাঝে মাঝে উল্টেপাল্টে দেখেছে। এখন সে সেগুলো পড়তে শুরু করেছে। প্রথম প্রথম একটু কঠিন লেগেছে, যখন সে ঠিক করে মনোযোগ দিয়েছে হঠাৎ করে সে একটা অন্যরকম মজা পেতে শুরু করেছে। গণিতের ভেতর যে এত বিচিত্র ব্যাপার লুকিয়ে ছিল সে জানত না। তার কাছে সবচেয়ে অবাক লাগছে পদার্থবিজ্ঞান, আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটি দিয়ে সময়ের এমন সব বিচিত্র ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছেন যে সে পড়ে হতবাক হয়ে যায়। পড়েও তার বিশ্বাস হয় না, মানুষ যেভাবে ডিটেকটিভ বই পড়ে রাশা সেভাবে তার বিজ্ঞানের বইগুলো পড়ছে।
নানি তাকে দেখেন আর মাথা নেড়ে বলেন, “তোর রকমসকম বুঝি! একজন মানুষ দিন নাই রাত নাই মাথা গুঁজে পড়ে কেমন করে? এমন যদি হতো যে পরীক্ষা আছে তাহলেও বুঝতে পারতাম।”
রাশা বলে, “নানি তুমি আমার কাছে বসো। আমি তোমাকে স্পেশাল রিলেটিভিটি বোঝাই, তুমি অবাক হয়ে যাবে।”
নানি বললেন, “রক্ষা কর আমাকে অনেক কষ্ট করে মাথাটা একটু ঠিক করেছি। তুই এখন আবার পুরোটা আউলে দিবি?”
.
এর মাঝে একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটল। ঘরে বসে ঘাড় খুঁজে গুঁজে লেখাপড়া করতে করতে একদিন রাশা আবিষ্কার করে তার সব খাতা শেষ হয়ে গেছে। বাজারে যাওয়া এখন সোজা কথা নয়, সে মতিকে কিছু টাকা দিয়ে বলল, কেউ যদি বাজারে যায় তাহলে তার জন্য যেন কয়টা খাতা কিনে নিয়ে আসে।
দুইদিন পর মতি চারটা খাতা এনে দিল। খবরের কাগজ দিয় মুড়ে সুন্দর করে বেঁধে-হেঁদে দিয়েছে। রাশা বাধন খুলে খাতাগুলো বের করল, খবরের কাগজটা ফেলে দিতে গিয়ে হঠাৎ সে থেমে যায়, সেখানে খুব পরিচিত একটা ছবি। একজন থুরথুরে বুড়ো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথার উপর দিয়ে রকেট উড়ে যাচ্ছে, রকেটের মানুষটি কমবয়সী। থিওরি অব রিলেটিভিটি বর্ণনা করতে হলেই দুই ভাইয়ের এই কাহিনীটা থাকে, এক ভাই রকেটে করে ঘুরেফিরে এসে দেখে অন্য ভাই থুরথুরে বুড়ো হয়ে গেছে। রাশা আগ্রহ নিয়ে লেখাটি পড়ল, খবরের কাগজের বিজ্ঞানের পাতায় কোনো একজন থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে লিখেছে, রাশা পুরোটা পড়ল, বেশ ভালোই লিখেছে। যে লিখেছে সে কঠিন জিনিস সোজা করে লিখতে পারে!
রাশা খবরের কাগজটা উল্টায়, অন্য পৃষ্ঠায় খবরের কাগজের কোনায় বড় বড় করে লেখা, “সায়েন্স অলিম্পিয়াড” নিচে বিজ্ঞানের দশটি প্রশ্ন। এই দশটি প্রশ্নের উত্তর লিখে পাঠাতে হবে, যারা শুদ্ধ উত্তর দেবে তাদের নিয়ে ঢাকায় একটা জাতীয় অলিম্পিয়াড হবে। তবে ছাত্র বা ছাত্রীরা প্রশ্নের উত্তরগুলো নিজে দিয়েছে সেটা স্কুলের হেডমাস্টারকে সত্যায়িত করে দিতে হবে। প্রশ্নের উত্তর দিতে একসপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছিল, খবরের কাগজটি তিনদিনের পুরনো, উত্তর পাঠানোর জন্যে আর মাত্র চারদিন সময় বাকি আছে।
রাশা খবরের কাগজটা নিয়ে তার বিছানায় বসে পড়ে। প্রথম তিনটার উত্তর পানির মতো সোজা। পরের তিনটার উত্তরটা কেমন করে বের করতে হবে সে জানে তবে সে জন্যে তাকে কাগজ-কলম নিয়ে বসতে হবে। পরের চারটার উত্তর কী হবে সে সাথে সাথে বুঝতে পারল না। চিন্তা করতে হবে।
